কর্মজীবনের লেখাপড়ায় push এবং pull দুটি factor ই কাজ করেছে। কর্মজীবনে প্রবেশের পর দ্বিতীয় posting হিসাবে গোপালগঞ্জ এসেছিলাম। টুংগীপাড়া উপজেলা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে posting হলেও সেখানে কোনো অবকাঠামো ছিল না। গোপালগঞ্জে কোর্ট করতে হতো। গোপালগঞ্জের জেলা প্রশাসক এহিয়া চৌধুরী pull ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি আমাদেরকে পালাক্রমে নির্বাচিত বই পড়ে সপ্তাহে একদিন উপস্থাপন করতে বলতেন।
টুঙ্গিপাড়ার উপজেলায় ম্যাজিস্ট্রেট হওয়া সত্বেও তিনি আমাকে রেকর্ড রুমের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। যদিও সেটি সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য ছিল। এই সুবাদে পুরানো আমলের তথ্য এবং রিপোর্টে সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল। এছাড়াও english সেকশনের দায়িত্বে ছিলাম। collectorate লাইব্রেরি english section এর অন্তর্গত। লাইব্রেরীতে ব্রিটিশ আমলের কিছু লেখা এবং বই ছিল। তার কয়েকটি আমি পড়েছি। এখান থেকেই আমার ইতিহাস এবং প্রত্নতত্ত্বের ওপর আগ্রহ জন্মে। সারাজীবন আমি সেটা জারি রেখেছি। তাই যেখানেই যাই না কেন যাদুঘর ভিজিট করি। সে সম্পর্কে পরে বলব।
আমাদের দেশে কে কোন ব্যাচের অফিসার তা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নেওয়া হয়। এহিয়া চৌধুরী পূর্ব পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসের অফিসার কিন্তু তার মত systematic অফিসার সিএসপিদের ভিতরও পাওয়া ভার। কর্ম জীবনের শুরুতে লেখাপড়ার আগ্রহ সৃষ্টিতে আমার উপর তার প্রভাব সবচেয়ে ব্যাপক।
জেলা প্রশাসক চৌধুরীর কাছে নোট বই আর কলম ছাড়া গেলে বকা খেতে হত। শেখা-শেখানোয় কখনো কখনো তিরস্কারও যে কাজে লাগে তা এখান থেকে শিখলাম। ভয়ে হলেও কখনও নোটবই কলম ছাড়া তার কাছে যাইনি। ডায়েরির সাথে রাখা এবং সবকিছু টুকে রাখা মনের অজান্তে অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল। তাই কোর্টের বিচারক হিসেবে যখন কাজ করেছি তখন সবকিছু লিখে রাখতাম। কোন অ্যাডভোকেট কোন আইনের কথা বললে, চমকপ্রদ কোন ঘটনা ঘটলে সাথে সাথে লিখে রাখতাম। বিসিএস প্রশাসন একাডেমিতে পরবর্তীকালে posting হওয়ায় ডায়রির ওই বাস্তব বিষয়গুলো উল্লেখ করে ক্লাস নিতাম। আমার চেয়ে অন্তত দশ বছরের চাকরিতে জ্যেষ্ঠ প্রশিক্ষণার্থীরাও আমার ক্লাসে মজা পেতেন। এর সুবাদে প্রশিক্ষক হিসাবে আমি সবসময় উচ্চমর্যাদার ভোগ করেছি। তখন আমি খুব junior officers ছিলাম।
যখন শুনি সরকার শিক্ষকদেরকে মর্যাদা দিচ্ছে না তখন আমার ঐ বিষয়গুলো মনে পড়ে। মর্যাদা সরকার দিতে পারে না। মর্যাদা ব্যক্তি অর্জন করবে এবং কমিউনিটি দিবে। সরকার circular ইস্যু করে শিক্ষকদের মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে না। অবশ্য মর্যাদা দেয়া-নেয়ার পরিবেশ সৃষ্টির জন্য সুশাসন দরকার। এখানেই সরকারের হাত। এই কথাটি আমি আজ পর্যন্ত কাউকে বোঝাতে সক্ষম হয়নি। এমনকি টেলিভিশনের টকশোতেও না।
জেনারেল এরশাদের পরিবার আমাকে push factor হিসেবে সাহায্য করেছেন। আমি তখন Mymensingh এর উপজেলা ম্যাজিস্ট্রেট। অত্যন্ত junior officer অর্ডারি কাজ করতে রাজি ছিলাম না। তাই আমাকে বিসিএস প্রশাসন একাডেমিতে বদলি করা হয়েছিল। সে সময়ের ওএসডি বিষয়টা সরকারের জানা ছিল ন। তাই আমাকে বিসিএস প্রশাসন একাডেমিতে পদায়ন করেছিল। কিন্তু বিসিএস প্রশাসন একাডেমি নামের কোন প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব ছিল না। আমাকে যোগদান করে সৃষ্টি করতে হয়েছিল। এরপর এ জেড এম শামসুল আলম নামের একজন অসাধারণ সিএসপি অফিসার মহাপরিচালক হিসেবে হিসেবে পদায়িত হয়েছিলেন। তিনি সবকিছু লিখে রাখতেন। সকলের দায়িত্ব, এমনকি ড্রাইভারকে কোন অবস্থায় কি করতে হবে তার লিখিত instruction থাকতো। এভাবেই সকল কর্মচারীর জন্য manual তৈরি করেছিলেন। তার শিক্ষায় আমি বেশ মজা পেয়েছিলাম। তাঁরই অনুপ্রেরণায় documentation কি জিনিস তা শিখেছি। কিন্তু খুব বেশি সহকর্মীকে প্রভাবিত করতে পারেনি। documentation আমাদের দেশে একটি ব্যাপক problem। ধারাবাহিকভাবে কোন ঘটনা documentation থাকলে বর্তমানের সমস্যার সমাধান বের করা সোজা। এই documentation থেকেই pattern, আর pattern থেকে artificial intelligence আবিষ্কার। যার বিপ্লব আমরা কম্পিউটার জগতে দেখছি।
তার অনুপ্রেরণায় আমাকে পড়তে হয়েছিল, শিখতে হয়েছিল, প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করতে হয়েছিল। এটাই আমার শাপে বর।
কর্মজীবনে অত্যন্ত ব্যস্ততার সাথে কাটিয়েছি। চেয়ার-টেবিলে বসে পড়ার সুযোগ ছিল না। ভ্রমণের আমার ব্যাপক আগ্রহ ছিল। লক্ষ্য করেছি ইংরেজ আমল থেকে অফিসারদের ভ্রমণ উৎসাহিত করা হয়। বলা যায় বাধ্য করার জন্য মাসে কতদিন ভ্রমণ করতে হবে তা পদের বিপরীতে নির্দিষ্ট করা আছে।
এছাড়া লক্ষ্য করেছি ইংরেজ আমলে কর্মস্থলে পদায়ন হবার পর সেই কর্মস্থল সম্পর্কে একটি পরিচিতিমূলক লেখা ফোর্ট উইলিয়ামে জমা দিতে হতো।প্রথমথেকেই ভ্রমন আমাকে পেয়ে বসেছিল। তবে আমি লেখার চেয়ে কাজকে বেশি প্রাধান্য দিতাম। আর গরিব মানুষের কাজ গুলো আগে করে দেয়ার চেষ্টা করতাম। সম্ভবত আমার গ্রাম্য ব্যাকগ্রাউন্ডের কারণেই মনের মধ্যেই নিজের অজান্তে প্রোথিত হয়ে গিয়েছিল। আমার কোন আত্মীয় স্বজন বড় কোন সরকারী আমলা ছিল না। তাই সব কাজে বেগ পেতে হয়েছে। বিষয়টি আমার মাথায় ছিল এবং ইতিবাচকভাবে প্রয়োগ করার চেষ্টা করেছি। এমন না যে শাশুড়ি বউ কে মেরেছে, তাই বউ যখন শাশুড়ি হয়েছে তখন তার বউকে মারতে হবে।
যাহোক ভ্রমণের অভ্যাসের কারণে ভ্রমণকালীন পড়ার অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল। পরবর্তীকালে যখন গাড়িতে চড়েছি তখন সাথে অথবা ব্যাগে সবসময় বই রাখি। আর উড়োজাহাজে চড়লে তো কথাই নেই। ইউরোপে পড়তে এসে যখন দেখলাম ব্রিটিশরা কর্মস্থলে যাওয়ার সময় হাতে একটি বই বা খবরের কাগজ নিয়ে ট্রেনে ওঠে। নামার সময় খবরের কাগজ ফেলে রেখে যায়। আরেকজনকে পড়ার সুযোগ সৃষ্টির জন্য। এটি দেখার পর আমার অভ্যাসটি আর কখনো পরিত্যাগ করতে পারিনি।
আবার এই চেয়ার টেবিলে বসেই অফিসের নথিপত্র থেকে অনেক কিছু শেখার সুযোগ আছে। একটা উদাহরণ দেওয়া যাক-প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে যখন পরিচালক হিসেবে কাজ করেছি। তখন red বইয়ের সুবাদে সিআইএ’র একটি ডকুমেন্ট পড়ার সুযোগ হয়েছে। সেখান থেকে জেনেছি “মানুষ সবচেয়ে বেশি খুন হয় তার বাড়ির কাছে এবং বাড়িতে ফেরার সময় অথবা বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময়। কারন সে সময় সে নিরাপদ বোধ করে। হত্যাকারীরাও অভিজ্ঞতা থেকে শিখেছে এখানে হত্যা করা সবচেয়ে সহজ।”
কর্মজীবনে এসে আবিস্কার করলাম কি পড়তে হবে এবং কোথায় পাওয়া যাবে শেখার জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই অংশের ওপর বাকিটুকু অনেকটা নির্ভরশীল। অনেকটা নেশাই হয়ে গিয়েছিল আমার পছন্দের বিষয়ের সর্বশেষ বেস্ট সেলার বই কোনটি? আমাকে তা সংগ্রহ করতে হবে। পড়তে হবে। তাই নামকরা airlines যেমন emirates এর বিজনেস কিংবা ফার্স্ট ক্লাসে চড়ার জন্য আগ্রহী থাকতাম সেখানে ব্রাউজ করে সর্বশেষ প্রকাশিত বইয়ের সংক্ষিপ্তসার পেতাম। কিন্তু এ অনেক পরের কথা কারণ বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার সান্নিধ্যে আসার আগে এই সুযোগ ছিল না। অতিরিক্ত সচিব এর নিন্ম পদস্থ কেউ বিজনেস ক্লাসে চড়ার untitled না। উনি বিরোধীদলীয় নেত্রী থাকাকালীন আমি একান্ত সচিব ছিলাম। আমি তখন উপসচিব তাই বিজনেস ক্লাসে চড়ার জন্য entitled না। কিন্তু airlines কর্তৃপক্ষ খালি থাকলে economy ক্লাস থেকে বিজনেস ক্লাসে upgrade করে দিতো। বড় হতে হলে অন্যের সাহায্য লাগে আমার জন্য কোন ব্যতিক্রম ছিল না।
এরপর থেকে যখনই বিদেশে গেছি এয়ারপোর্টে বুকস্টলে সর্বশেষ বেস্ট সেলার বইয়ের সন্ধান করেছি। dubai, singapore, ব্যাংকক, দিল্লি, কলকাতা, bangalore, istanbul ইত্যাদি বিমানবন্দর থেকে সর্বশেষ প্রকাশিত বই কিনেছি। Waterstone, Foyles, Barnes and Noble’s এর মত বিখ্যাত book shop এ বই পছন্দ করার জন্য ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়েছি। পুরনো ঢাকার ‘মাওলা ব্রাদার্স’ গেলে হক সাহেব আমাকে আমার ইচ্ছা মাফিক সংখ্যক বই নিয়ে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করেছেন। হাক্কানীতে বই কিনিনি আবার কোনদিন খালি হাতে ফিরে আসিনি।
পড়াশোনায় আনন্দ না পেলে ধারণ করা যায় না। পড়াশোনার বিষয় বস্তু সর্বত্র বিরাজমান। ঘাটে ঘাটে স্টেশনে নদীতে সাগরে রাস্তায় সভায় বাড়িতে যেখানেই যান না কেন সেখানেই শেখার আছে। তবে চিন্তা করতে হবে। চিন্তা ছাড়া সবকিছুই মূল্যহীন। চিন্তা ছাড়া প্রকৃত শিক্ষা হয়না। 5 মিনিট পড়লে 50 মিনিট চিন্তা করতে হয়। আমার বিবেচনায় ব্রিটেনে রাস্তাঘাটে সর্বত্র শেখা এবং জানার বিষয় সচেতনভাবে বিন্যাস্ত করা হয়েছে। সেদেশে ছোট্ট শহরেও মিউজিয়াম আছে। মিউজিয়াম শেখা এবংশেখানোর, জানা এবং জানানোর, সোনা এবং শোনানোর, কিছু করা এবং করানোর জন্য শ্রেষ্ঠ জায়গা। মিউজিয়ামে শিশুদেরকে সাথে করে, পরিবারের সাথে, পিতা-মাতার সাথে, শিক্ষকের সাথে খেতে হবে, যেতে উৎসাহিত করতে হবে। তাহলে knowledge society গড়ে উঠবে।


অসাধারন স্যার, নতুন একটা জিনিস শিখলাম, -মানুষের নিরাপদ বোধের জায়গাটা।আসলেই ৫মিনিট পড়ে ৫০মিনিট চিন্তা করাটা খুবই জরুরি…