১৯৯৪ সালের কথা। শিবালয় উপজেলা ক্যাম্পাসে দু’টি পুকুর ছিল’ একটি বেশ বড় ও গভীর অন্যটি ছোট। উপজেলা করার সময় পুকুর কেটে উপজেলা ক্যাম্পাসটি ভরাট করা হয়েছিল। পুকুর পাড়ে তেমন একটা গাছ ছিল না। বড়টিতে মাছ চাষ হতো না। মাঝে মাঝে খুব জোরে শব্দ হতো। তখন কোন উপজেলা চেয়ারম্যান ছিলনা। উপজেলা নির্বাহী অফিসারের বাসাটি পুরনো, সার্কেল অফিসারের আমলের। উপজেলা চেয়ারম্যানের বাসাটি নতুন এবং পুকুরের সামনেই। আমরা সেই বাসায় থাকতাম। পুকুরের উত্তর পার্শ্বে সারিসারি অন্যান্য অফিসারদের বাসা। ঐ পাশে একটি শানবাঁধানো ঘাট। প্রতিদিন বাইরের লোক এসে গোসল করে, আর গোসলের সময় অশালীন সব গান করে। অফিসাররা আমাকে গোসল বন্ধ করাতে বলতো। কি করে গোসল করা বন্ধ করাব? চাহিদা আছে। ঘাটটি সুন্দর, পানি পরিষ্কার। লোক পাঠিয়ে গান বন্ধ করাতে বলেছে। কিন্তু কতক্ষণ চৌকিদেয়া যায়? চোকিদারদের সাথে বাকবিতণ্ডা হয়ে মারামারির সৃষ্টি হবে। সবাইতো অশালীন গান গায় না
দোতলার বারান্দা থেকে বিশ ত্রিশ মিটার দূরে পুকুরটি দৃশ্যমান। দোতালায় আমাদের বেডরুম, নিচতলায় রান্না ঘর ও গেস্টরুম। উপরের তলা থেকে পুকুরটার দেখলে মনে হতো চাষের অপেক্ষায় আমার দিকে তাকিয়ে আছে। তখন দেশে প্রচুর আফ্রিকান মাগুরের চাষ হচ্ছে। আমরা যখন ৮৯-৯০ সালে সপরিবারে যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার ছিলাম তখন দোকান থেকে বড় বড় মাগুর কিনে খেয়েছি। সেটা যে আফ্রিকান মাগুর তা’র কোনো ধারণা ছিল না। তাই বেশ মজা করে খেয়েছি। বাবার হোটেল ছাড়ার পর নিজের মুরোদে মাগুর কেনা সম্ভব হয়নি। দেশে আফ্রিকান মাগুরের চাষ হচ্ছে। মাগুরের পোনা জোগাড় করে ফেললাম। কিন্তু মাথায় ঢুকলো পুকুরে কি আছে দেখতে হবে, কেন মাঝে মধ্যে হুড়ুম করে শব্দ হয়? পানি সেচে ফেললাম। পানি কমে গেলে একটি মাছ হোভারক্রাফটের মত কয়েকবার উড়ান দিল। ৯ কেজি ও ১৩ কেজির দুটি বোয়াল পাওয়া গেল। বড় পুকুরে আফ্রিকান মাগুরের পোনা ছাড়া হল। একটু বড় হলেই অনেকে মাছ ধরা শুরু করলো। সরকারি পুকুর, লীজ না দিয়ে মাছ চাষ করা হয়েছে তাদের হক আছে, তারা মনে করে তারা মাছ ধরতে পারে। এলাকাটা চরের জন্য সমৃদ্ধ। চরে ধান লাগানো বোকামি বিনিয়োগ বেশি, ঝুঁকি বেশি। ধান কাটা বুদ্ধিমানের কাজ বিনিয়োগ কম, ঝুঁকি কম। তখন পর্যন্ত তারা ধরে নিয়েছে মাছ চাষ করে টাকা আমি পকেটের ঢুকাবো। তাই যে যার মত মাছ ধরতে শুরু করলো। তাদের যুক্তি সঠিক প্রমাণের জন্য বিভিন্ন কথা বলাবলি করতে শুরু করলো। আমি ভাবলাম পড়ে ছিল ভালো ছিল, আমি তো দেখছি মাঠের শাল বাড়ী ডেকে এনেছি। কিন্তু ছাড়বার না, বুদ্ধি তো একটা বের করতেই হবে। মাথায় বুদ্ধি এলো। প্রতিদিন শিবালয় রাস্তায় সড়ক দুর্ঘটনায় কুকুর মারা যায়। সেগুলো রাস্তায় দুর্গন্ধ ছড়ায় । অন্যদিকে কুকুরের মাংসে প্রচুর প্রোটিন আছে। এসব মরা কুকুর দড়ি দিয়ে বেঁধে টেনে এনে পুকুরে দেয়ার লোক জোগাড় করলাম। কাজ শুরু হয়ে গেল। মাছ বাড়বাড়ন্ত। কেউ আর খায় না। ধরে না, ছোঁয় না। পুকুরের আর কেউ গোসল করতে আসে না। গান করবে কে? মাছ বড় হয়ে গেল বিক্রি করার পালা। প্রচুর মাছ হয়েছে। মাছগুলো মাঝারী দেশি মাগুরের মত। মাছ নেয়ার জন্য সবাইকে সাধলাম। কাউকে মাছ নিতে রাজি করাতে পারলাম না। ওই যে কুকুর দিয়েছি তাই। বললাম মুরগিতো কত কি খায়। মুরগি খান কেন? কোন জবাব নেই। যুক্তি দিয়ে সবকিছু হয় না। ডিম গোল তাই পরীক্ষায় শূন্য পাওয়ার ভয়ে ডিম খেয়ে পরীক্ষা দিতে যায় না। খাবারের রং দেখে, খাবার চিবাননোর শব্দ শুনে, খাবারের রুচি হয়।
একটি সাইনবোর্ড দিতে পারতাম। এই পুকুরে গোসল করা নিষেধ, “আদেশক্রমে উপজেলা নির্বাহী অফিসার”। তারপরও না মানলে লোক রাখতে পারতাম। থানায় সোপর্দ করতে পারতাম। এ নিয়ে আন্দোলন হতে পারতো। খবর কাগজে হয়তো সাংবাদিক নিউজ করতো। তবে যা করেছি এতে কোন অসুবিধা হয়নি তা কিন্তু না। সাপ মরেছে লাঠিও ভাঙেনি।
মনে হতে পারে রবীন্দ্রনাথ সবকিছু লিখে গেছেন। সব কিছু উদ্ভাবন করা হয়ে গেছে। আমার আর কি করার আছে? এ বিষয়ে আরো সময়ের প্রয়োজন! গবেষণার প্রয়োজন! অনেক টাকা দরকার, টাকা কোথায়? উদ্ভাবন তো আমাদের কাজ নয়? আমরাতো বিজ্ঞানী না। প্রফেসর না। গবেষক না। আমাদের এত কাজ, উদ্ভাবনের সময় কোথায়? উদ্ভাবনে ঝুঁকি আছে। সরকারি বিধির বাইরে যাওয়া যাবে না। চাকরি যাবে। মান সম্মান যাবে। সাংবাদিকরা তার জন্য বসে আছে।
কিন্তু রবীন্দ্রনাথ সব শব্দকে তালা বেঁধে জাননি যে এদিক-ওদিক করা যাবেনা? উদ্ভাবন করা যাবে না।
উদ্ভাবন অনন্ত, অফুরন্ত, শেষ হয়নি আর হবেও না। উদ্ভাবন মানুষ সুনির্দিষ্ট নয়, স্থান-কাল-পাত্র সুনির্দিষ্ট হতে পারে। অতীতের কোন সমস্যার জন্য কোন একটি বিষয়ে অপ্রচলিত হয়ে গেছে, অব্যবহৃত থেকে গেছে, সবাই ভুলে গেছে। উদ্ভাবনের মাধ্যমে তার প্রচলন হতে পারে। বর্তমান কোন সমস্যার সমাধান নিয়ে উদ্ভাবন হতে পারে। ভবিষ্যতের কোন কল্পিত সমস্যা নিয়ে উদ্ভাবন হতে পারে। সেই সমস্যা হয়তো ভবিষ্যতে হতে পারে। প্রচার চাহিদা সৃষ্টি করতে পারে। কোন চাহিদা নেই কিন্তু কল্পিত চাহিদা উদ্ভাবন হতে পারে। কার চাহিদা ছিল ফোন, স্টিল ও ভিডিও ক্যামেরা ক্যামেরা, টেপ রেকর্ডার, নোটপ্যাড, কলম, ক্যালকুলেটর, কম্পিউটার, আবহাওয়া সংবাদ, তাপ, আর্দ্রতা, বাতাসের চাপ, ultraviolet, television, পথপ্রদর্শক, শ্রুতিলেখন, লেখা কথায় পরিবর্তিত ইত্যাদি একীভূত হবে?







