৪ঠা নভেম্বর ২০১৭ সকাল সাড়ে ছয়টা জয়পুরহাট সার্কিট হাউস :
কাল বিকেলে ঢাকা থেকে সৈয়দপুর হয়ে জয়পুরহাট এসেছি। সৈয়দপুর বিমানবন্দর থেকে পার্বতীপুরের ভেতর দিয়ে আসার সময় দু’পাশে কার্পেটের মত ধানের ক্ষেত দেখলাম। সকালে সার্কিট হাউজ থেকে বেরিয়ে শীতের আমেজ পেলাম। কিন্তু ক্ষেতের ধান এখনো সবুজ, পাক ধরলেও পাকেনি।
সন্ধ্যায় বেরিয়ে পড়লাম সদরের সহকারী কমিশনার ভূমি কে সাথে নিয়ে। প্রথমেই গেলাম ক্ষেতলালের বটতলী হাটে। ড্রাইভার আমাকে প্রথমে দালানগুলোর দেখানোর জন্য সচেষ্ট ছিলেন। সে গাজীপুরের মানুষ। আমার উদ্দেশ্য ভিন্ন, মানুষ দেখা।
কিন্তু পথে পড়লো প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পরিচালিত টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার। দু’বছর আগে চালু হয়েছে।সুন্দর ভবন তৈরি করা হয়েছে। ভেতরে গিয়ে কয়েকজন instructor এর সাথে আলাপচারিতা করলাম। তারা এখানে ডেপুটেশনে এসেছে। এখনো এখানে নিয়মিত নিয়োগ হয়নি। কি জানি মামলার ঝামেলা আছে। কম্পিউটার কোর্সএ ১৬০ জনের সিট। খালি নাই। বেসিক কম্পিউটার কোর্স করা হচ্ছে। আমি প্রশ্ন করলাম কেন বেসিক কোর্স করছেন? এখানকার ছোট ছোট ব্যক্তিগত ট্রেনিং institute এবং অন্যান্য প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে এই ধরনের কোর্স চলে। সরকারি প্রতিষ্ঠানে আরো হাই লেভেলের কোর্স করা উচিত। কারণ অনেকেই নিজের বাড়িতে বেসিক বিষয়গুলো শেখেন। স্কুলের বা ছোটখাটো প্রতিষ্ঠানে আরো একটু উচ্চ বিষয়গুলো শেখেন। আমার তো মনে হয় এখানে নিদেনপক্ষে গ্রাফিক্স, ওয়েব ডিজাইন, ওয়েব প্রোগ্রামিং এবং animation course হওয়া উচিত। তবে আমার মতে ওয়েব প্রোগ্রামিং এবং অ্যানিমেশন টাই সবচেয়ে ভালো। কারন ঐগুলো করলে টাকা আয়ের সম্ভাবনা কম। কিন্তু এইগুলো কোর্সটি করলে টাকা আয়ের সম্ভাবনা তো আছেই, এই টাকার পরিমাণও বেশি। আমার প্রশ্ন যদি course করতে হয় তাহলে যদি তাদের self employment না হয় তবে এই কোর্স করার অর্থ কি।
ভবনটি অত্যন্ত সুন্দর। গণপূর্ত বিভাগ করেছে। ভালো কন্টাক্টরের হাতে পড়েছে। বাইরে দুরান্ত দিয়ে সুন্দর বেড়া করা হয়েছে।
আমাদের প্রতি বছর অনেক নতুন প্রতিষ্ঠানও হয়, ভবন হয়। সেই ১৯৬৮ সালে গুনার মিরডাল তার asian drama তে বলেছিলেন গরিব দেশগুলোর প্রতিষ্ঠানের করার প্রবণতা বেশি। পড়ানোর প্রতিষ্ঠানগুলো রক্ষণাবেক্ষণ সংস্কার এবং সুচারুভাবে চালানোর প্রতি নজর কম। সে বিষয়টি মনে পড়ল। এত সুন্দর ভবন প্রতিষ্ঠান এটা দিয়ে সমস্ত জয়পুরহাটের মানুষকে সার্ভ করা সম্ভব। সারাদিন সারারাত টোয়েন্টিফোর সেভেন সেবা পারে। আমাদের দেশের একটা প্রবণতা building করা। মানুষ থাকলে বিল্ডিং না থাকলেও প্রশিক্ষণ দেয়া সম্ভব। তাঁবুর মধ্যে ও প্রশিক্ষণ দেয়ার সম্ভব। ভবন ভাড়া করেও প্রশিক্ষণ দেয়া সম্ভব। হয়তো উপযুক্ত নাও হতে পারে।
এর ল্যাবগুলোতে model মেশিন রাখা আছে। ইলেকট্রিক্যাল ল্যাবে আধুনিক যন্ত্রপাতি আছে। কম্পিউটার ল্যাবে core i5 brand dell computer রাখা হয়েছে। Outdated সিলেবাস। কম্পিউটার কোর্সের সিলেবাসে office 2003 রাখা হয়েছে। এটা কি কাজে লাগতে পারে বোধগম্য হলো না।
গার্মেন্টসের৬০ জনের মধ্যে মাত্র ১৫ টি সিটি পূর্ণ হয়েছে। একই অবস্থা ইলেকট্রিক্যালের।
আজ শুক্রবার প্রিন্সিপাল কে পাওয়া গেল না। তার জন্য সুন্দর একটা বাসভবন আছে।
শুরু হলো মানুষ দেখার যাত্রা ক্ষেতলাল উপজেলার বটতলী হাটে গেলাম। রাত ৯ টা হাট ভাঙ ভাঙ অবস্থা। স্থানীয় যেসব পণ্য তা অনেক সস্তা। পাকা কলা কেজিতে বিক্রি হয়। ১ কেজি চাপা সবরি ১৬ টি কলা ২০ টাকায় কিনলাম। ঢাকা এর দাম ৮০ টাকা। বাজারের ভিতরে ঢুকে গেলাম। সিদ্ধ ডিম বিক্রি হচ্ছে। মুরগির ডিম ১০ টাকা হাঁসের ডিম ১২ টাকা। বৃদ্ধ লোকে ও খাচ্ছে। একজনকে জিজ্ঞাসা করলাম আপনি তো বেশ বয়স্ক খাচ্ছেন আপনার কোন অসুবিধা হবে না। সে বলল আমি দিন না খেয়ে বাঁচি না।
এখান থেকে সোজা জয়পুরহাট রেলস্টেশনের কাছে চলে আসলাম। এখানে ডিম ভেজে বিক্রি হচ্ছে। মানুষ সেখানে শুধু ডিম ভাজি খায়। রেলস্টেশনের কাছে একটা কড়াইয়ে বড় করে অনেকগুলো ডিম ভেজে কেটে কেটে বিক্রি করে। ডিম খাওয়া জয়পুরহাটের একটা কালচার। ফুটপাতে ভাযা দিবস শুধু খায় এমন কালচার বাংলাদেশে কোথাও নাই। তবে ডিম সিদ্ধ হাওয়ার সংস্কৃতি সারা দেশেই আছে। বেশ প্রাচীন আমল থেকেই রেল স্টেশন, ফেরিঘাট, বাস স্টেশন, সিনেমা হলের সামনে, বাজারে, কিংবা হাটের দিনে সিদ্ধ ডিম বিক্রি হয়ে আসছে। কিন্তু শুধু খাওয়ার রেওয়াজ জয়পুরহাটে। একজনকে জিজ্ঞাসা করলাম কত সিদ্ধ ডিম বিক্রি হয়। সে জানালো ২০০ থেকে ৩০০। কত লাভ হয়, বলল টাকা। দেদারছে ডিম বিক্রি হওয়ার জন্য এখানে ডিমের ফরোয়ার্ড এবং ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ রয়েছে। এখানে ছয়তলা পোল্ট্রি ফার্ম গড়ে উঠেছে, ফিড মিল গড়ে উঠেছে। বটতলী বাজার এই ফুটপাতে মুরগির ভিটামিন ওষুধ বিক্রি হতে দেখেছি। এখানে দেশি মুরগির মত পালন করা মুরগির বড় বড় অসংখ্য খামার গড়ে উঠেছে। আমার সেই “চাকরি নেব না, চাকরির দেব” মডেল কাজ করছে।
জয়পুরহাটে আরেকটা বৈশিষ্ট্য রাস্তার দু’ধারে সারি সারি সজিনা গাছ। এ গাছ বারোমাসি না, মৌসুমী। এগুলো ভারতের রাস্তার মত বারোমাসি হলে উৎপাদন আরো বাড়তো, বছরব্যাপী ফসল পাওয়া যেত। মুনাফা বেশি হতো। সজিনা গাছের ডাল লাগিয়ে জন্মানো যায়। সরকারিভাবে রাস্তার দু’ধার দিয়ে লাগানো যেতে পারে। গরু ছাগলে খায় না। সহজে মরে না। দামী ওষধী সব্জি। বারমাসী জাত উদ্ভাবন করতে পারলে আরো ভালো। পানি জমে না এমন জায়গায় উত্তর বঙ্গের সব জেলায় কম বেশি লাগানো যায়। সজিনার পাতা শাক হিসেবে, সজিনার ফল ডাল দিয়ে রান্না করে খাওয়া যায়। সজিনা জয়পুরভাটের ব্রান্ডিং হতে পারে। রপ্তানি করে মিলিয়ন ডলার আয় করা যায়।
এখানকার কচুর লতি বিখ্যাত, দেশের বাইরে ইউরোপ-আমেরিকায় রপ্তানি হয়। অবশ্য এগুলো বাঙালিরাই খায়। বাংলাদেশ কোন রাষ্ট্রীয় অতিথি আসলে এগুলো খাওয়ানো যায়। আমি আমেরিকানদের খাইয়ে সন্তুষ্ট করেছি। আমার মনে হয় রাষ্ট্রীয় দুপুরের কিংবা রাতের খাবারে এগুলো রাখলে বিদেশিদের খাওয়ার অভ্যাস হবে। অভ্যাস তৈরি হবে, আমাদের দেশে ভারতীয় দোসার প্রচলন হলে, ইউরোপ আমেরিকায় কেন কচুর লতি খাওয়ার প্রচলন হবে না? জয়পুরহাট জেলা প্রশাসককে বিষয়টি বলেছি তার অতিথিদের খাবার টেবিলে কচুর লতি থাকে।
জয়পুরহাটের branding দেশি মুরগি আর কচুর লতি। সজিনা, ডিম ভাজি কেন branding হবে না? এই প্রশ্ন রাখলাম?
সকালে হাঁটতে বেরিয়েছে, আসল উদ্দেশ্য এলাকাটাকে দেখা। আমার সাথে আছেন প্রাক্তন পরমাণু শক্তি কমিশনের পরিচালক। ১৯৯১ সালে অবসরে গেছেন। হাঁটছে আর আলাপ করছি। ভিন্ন ধরনের মানুষ। ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। আলাপ হচ্ছিল অনেক সময় কলাগাছে একাধিক কাধী বের হয়। কিন্তু আমরা খারাপ লক্ষণ মনে করি। সাথে সাথে কেটে ফেলি। একই গাছে একাধিক কাঁধী উচ্চ ফলনের লক্ষণ। আমরা যদি এই গাছটাকে বংশবিস্তার করতে পারতাম, কাছে কালচারই হোক আর, অন্য ভাবেই হোক। আমরা একটা নতুন জাত তৈরি করতে পারতাম। আমাদেরকে তাই নতুনভাবে ভাবতে হবে। শিক্ষালয়ে critical thinking nurture করতে হবে। দেখতে হবে সমাজে এখনো কুসংস্কার, এখনও যুক্তি সহকারে কাজ করার মানুষের অভাব।
কিছুদূর হাঁটতেই লক্ষ্য করলাম একজন বৃদ্ধ বয়সি মানুষ রাস্তায় বসে আছে একটা গরুর শরীর প্রান্তের খুটা তার হাতে। একজন দাঁড়িওয়ালা ভদ্রলোক তার বুক মালিশ করছে। সে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। দম নিতে কষ্ট হচ্ছে। আমরা কাছে এসে একটা ভালো গাড়িকে থামতে বললাম। সে থামল না। বিষয়টি সে বুঝতে পেরেছে। সে ভেবেছে, এই অসুস্থ মানুষটাকে নিলে পাবেনা। সে সকালে বাজারের মালামাল নিলে লাভ করতে পারবে। অন্তত তিনজন কে বললাম। শেষে টাকা দিবো বললাম। কিন্ত কেউ থামল না। এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে এই অবস্থা। আমার মনে হয় আমরা স্কুল থেকে শেখাতে পারছি না। কেমব্রিজ স্কুল থেকে শিখলেও বাস্তবে অন্য অসুবিধা দেখে। সেটা প্রয়োগ করছে না। তাহলে আমাদের সংস্কার শেখা শেখানোয় হবে না। আমাদের প্রশাসনে, রাজনীতিতে, নেতৃত্বে মোদ্দা কথা সুশাসনে মনোযোগী হতে হবে। আমাদের নেতা সৃষ্টির জন্য প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো প্রয়োজন। লোক প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের আদলে একটা প্রতিষ্ঠান দরকার সেখানে knowledge সংগ্রহ, সংরক্ষণ, সৃষ্টি, গবেষণা ও বিতরণ করা হবে।
কয়েক মিনিট পরে একটা লোক এদিকে আসছিলো তাকে বললাম এই মানুষটার বাড়ী চেনেন। সে বল্লো আমার ভাই। ছবিটা দেখুন।
তুমি এসেছিলে আজ অরুণ-কিরণ পারিজাত লয়ে সাথে নিদ্রিত পুরী পথিক ছিল না পথে একা চলি গেলে তোমার বিজয় রথে।





অসাধারন…
ধন্যবাদ।