৩রা নভেম্বর ১৯৭৫ জাতীয় চার নেতাকে কারাভ্যন্তরে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। পৃথিবীর ইতিহাসে এই ধরনের ঘটনা এই প্রথম ঘটল।
প্রেক্ষাপট:
১৫ আগস্ট ১৯৭৫ ঢাকা সবে দৃশ্যমান হচ্ছে, তখনো সূর্য ওঠেনি। গোলা গুলির বিকট শব্দ, কিন্তু কিছুক্ষণ পর শব্দ থেমে গেল। তাজউদ্দিন আহমেদের বাড়ি বঙ্গবন্ধুর বাড়ি থেকে মাত্র ১০ মিনিটের হাঁটা রাস্তা। মনে হলো বঙ্গবন্ধুর বাড়ি ৩২ নাম্বরের দিক থেকে শব্দটা আসছে। তাজউদ্দীন আহমদ ওইদিন সকালেই গাজীপুরের কাপাসিয়া থানা স্বাস্থ্যকেন্দ্র উদ্বোধনে যাবেন। তাজউদ্দীন কন্যা সিমিন হোসেন রিমি সহপাঠী বান্ধবী মন্ত্রী ইউসুফ আলীর মেয়ে কে ফোন করলেন। সে রেডিও শুনতে বলল। সবাই একত্রে, তাজউদ্দিন আহমেদ রেডিওতে মেজর ডালিমের ঘোষণার পর বললেন, “কে মুজিব ভাইয়ের শত্রু তা জীবিত অবস্থায় জানতে পারলেন না।” বুঝতে বাকি রইল না, তাজউদ্দীনকে তার স্ত্রী পাশের বাড়িতে পালাতে বললেন। দেখতে দেখতে তাজউদ্দিনের বাড়িও সেনা সদস্যরা ঘিরে ফেলল। ক্যাপ্টেন শহীদ ঢুকে টেলিফোনের তার ছিড়ে ফেলে বলল “কেউ বাড়ি থেকে বের হবে না, কেউ বাড়িতে ঢুকবেনা।” পুরো পরিবার বন্দী অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে। অনিশ্চয়তা, আতঙ্কে আছেন যেকোনো সময় তাদেরকে হত্যা করা হতে পারে।
পরদিন ১৬ আগস্ট ১৯৭৫ কে যেন কলিংবেল টিপতেই থাকলেন। মেজর ডালিম দোতালায় এসে তাজউদ্দীন আহমদকে বললেন ভয় পাবেননা। তাজউদ্দীন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেননা বললেন” চুপ কর, বল তোমরা দেখতে এসেছে।’ তাজউদ্দিন ধরে নিয়েছেন তারা রেকি করতে এসেছে। তাদেরকে সপরিবারে শেষ করে দেয়া হবে। মিসেস তাজউদ্দিন আসলেন, তবে তাকে কিছু বলা হলো না। পরদিন রবিবার ১৭ আগস্ট ঘোষণা দেয়া হলো ১৮ আগস্ট থেকে সকল স্কুল কলেজ খুলবে। উপস্থিত পাহারার সেনাদেরকে অনুরোধ করা হলো তারা দুইবোন যেন স্কুলে যেতে পারে। তারা অন্যদের সাথে কথা বলে permission দিল। তাদের ছোট্ট একটা vox wagon গাড়ি ছিল সেই গাড়িতে প্রথম স্কুলে যেতেই সবাই ঘিরে ধরলো, যেন তারা ভূত দেখছে। বিখ্যাত অভিনেত্রী সুবর্ণা মোস্তফা সহ তার অন্যান্য সহপাঠীরা ধরে নিয়েছে তাদের সবাইকে হত্যা করা হয়েছে।
এভাবেই ২৩ শে আগস্ট ১৯৭৫ চলে আসলো। পুলিশের একটি দল এসে বলল তাদের সাথে যেতে হবে। তাজউদ্দীন জিজ্ঞাসা করলেন কাপড়-চোপড় নেবেন কিনা? উত্তর আসলো “নিলে ভালো হয়”। কন্যা সিমিন আর পুত্র সোহেল তাজ এর মাথার ওপরে হাত দিলেন। এমন সময় মিসেস তাজউদ্দিন বললেন “কবে ছাড়বে বলে মনে হয়”। তাজউদ্দিনের মুখ থেকে উত্তর এলো “take it forever”। তাদের কথাই সত্য প্রমাণিত হলো তেসরা নভেম্বর। গাড়ি বারান্দায় পুলিশের গাড়ি ছেড়ে দিচ্ছে, সিমিন সেখানে গিয়ে দাঁড়াল। ধীরে ধীরে গাড়িটা এর বাইরে গেল। সাদা একজন মানুষ ছুটে এসে জিজ্ঞাসা করল, তাজউদ্দীন একটা জবাব দিতেই গাড়িটা গতি বাড়িয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। বহু বছর পরে জানা গেল সেই সাদা মানুষটি একজন সাংবাদিক Lawrence lipschultz. তিনি কি জিজ্ঞাসা করেছিলেন তাও জানা গেল। “আপনাকে কি মন্ত্রিসভা গঠনের জন্য নেয়া হচ্ছে?” জিপের সামনের সীটে বসা তাজউদ্দিন জবাব দিলেন “মনে হয় না”। তাকে 1974 সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে এবং সামরিক আইনে গ্রেফতার দেখানো হয়েছিল।
কোনখোজ খবর নেই। এভাবেই সেপ্টেম্বর মাস চলে আসলো। সিমিন প্রতিদিন বাসার গেটের ভেতর থেকে পুলিশের পাহারায় স্কুলে যায়। পুলিশের গাড়ি একটু পিছিয়ে পড়েছে এমন সময় একটা রিক্সা নিয়ে সোজা বেইলি রোডের খালাতো ভাইয়ের বাসায় যায়। তার সাথে লক্ষ্মীবাজারে যশোরের একজন উকিলের বাসায় যায়। স্বাধীনতা যুদ্ধে যাওয়ার সময় আশ্রয় দেয়ার সূত্রে তার সাথে তাজউদ্দিনের ঘনিষ্ঠ পরিচয় ছিল। তার মাধ্যমে দরখাস্ত করে জেলখানায় বাবার সাথে ৫ জনের দেখা করার অনুমতি নিয়ে স্কুল ছুটির সময় এসে হাজির। পুলিশ কিছুই বুঝতে পারেনি।
পরিবারেরসদস্যদের জেলখানায় তাজউদ্দিনের সাথে দেখা করতে গেলে বললেন এতদিন কেন আসনি? জেলখানায় ক্যাপ্টেন মনসুর আলী ও তার পরিবারের সাথে দেখা মিলল পরিদর্শন কক্ষে কান্নাকাটি করছেন।
তাজউদ্দিনের সাথে তার পরিবার দেখা করলেন। চারিদিকে কারফিউ। তাজউদ্দীন বললেন মোস্তাক একটি সভা ডাকবে। সবাইকে খবর দেয়া দরকার কেউ যেন এই সভায় না যায় সিমিন এমপি হোস্টেলে গিয়ে সবাইকে এই বার্তাটা দিলেন। সবাই ঠিকই সেই মিটিংয়ে হাজির হল।
অক্টোবরের 23 কি 24 তারিখ হবে পরিবারের সদস্যরা তাজউদ্দিনের সাথে দেখা করলেন। তাজউদ্দীন বললেন রাতে স্বপ্ন দেখেছি “মুজিব ভাই বলছে, তাজউদ্দীন আমার একা ভালো লাগছে না তুমি চলে এসো। মনে হয় এরা আর আমাদেরকে বাঁচিয়ে রাখবে না। মিসেস তাজউদ্দিন হাইকোর্টে রিট পিটিশন করেছেন। পহেলা নভেম্বর উকিল সহ তাজউদ্দিনের সাথে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে দেখা করলেন। মাত্র 20 মিনিটে দেখা, তারপর বারবার শেষ করতে তাগিদ দিচ্ছিলো। মিসেস তাজউদ্দিন তাজউদ্দিনকে খুবই উদ্বিগ্ন এবং বিবর্ণ দেখলেন। তার ডায়েরীটার বিষয়ে খোঁজ রাখতে বললেন। মনে হয় উনি আঁচ করতে পেরেছিলেন কি হতে যাচ্ছে। জেলখানাতে সেনাবাহিনীর লোকের আনাগোনা। মেজর ডালিম ও জেলখানার ভেতর এসেছিল। সম্ভবত তারা করতে এসেছিল। বঙ্গভবন থেকে কর্নেল রশিদ জেলখানার ডিআইজিকে পাঠিয়েছিলেন। তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। জেলখানার high profile বন্দীদের নিরাপত্তা দেয়ার মত যথেষ্ট force আপনার আছে কিনা। উত্তরে বলেছিলো আছে। পাল্টা প্রশ্ন যদি সেনাবাহিনীর লোক আসে। উত্তর তাহলে আমাদের পর্যাপ্ত শক্তি নেই। জেলখানার কারারক্ষী তো সেনাবাহিনীর মত প্রশিক্ষিত না। এসবই নেতাকে হত্যা করার প্রস্তুতি। কোন ধরনের বাধা আসতে পারে তা পরখ করে দেখা। চার্জের সম্ভবত জেলখানার ভেতরে থেকেই এসব আচ করতে পেরেছিলেন।
নভেম্বরের 2 তারিখ তাজউদ্দীন মেয়েদেরকে খাটের উপর শুতে দিয়ে নিজে মেঝেতে শুলেন। মায়ের ঘুম নেই মেয়েদের ঘুম নেই। কিছুক্ষণ পরপর একেঅপরের খোঁজ নিচ্ছেন ঘুমিয়েছেন কি না। হ্যাঙ্গারে বাবার হাফ শার্ট ঝুঁলানো। সিমি দেখছেন তার বাবা দাঁড়িয়ে আছে। এভাবে সবাই ঘুমিয়ে পড়লেন। সকালে ফাইটার প্লেনের শব্দে ঘুম ভাঙলো। বেলা গড়াতেই আশা জাগল ভালো কিছু হবে। ক্যান্টনমেন্ট খালেদ মোশাররফ ক্ষমতা নিয়েছে।
তেসরানভেম্বর ঢাকা সেনানিবাসের ক্ষমতার ভারসাম্য কখনো দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। জিয়াউর রহমান সেনাপ্রধান কিন্তু তাতে তিনি সন্তুষ্ট না। তিনি প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ও একইসাথে রাষ্ট্রপতি হতে চান। একজন civilian রাষ্ট্রপতি থাকবেন তা কি করে হয়? খন্দকার মুশতাকের সাথে দেখা হয় না। ফাইল আসে ফাইল যায়। মাঝে দুই বাধা জেনারেল খলিলুর রহমান এবং খন্দকার মোশতাকের প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা উপদেষ্টা মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি কর্নেল ওসমানী।
আরো অনেকেই সেনা প্রধান, প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এবং রাষ্ট্রপতি হতে চান। এর ৯ বছর পরেও আমি একই উচ্চাভিলাষ প্রশিক্ষনার্থী সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে দেখেছি। সেটা 1984 সালের ফেব্রয়ারি মাসের কথা; বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে প্রশিক্ষনার্থী হিসাবে যাই। আমি বাংলাদেশের প্রথম সিভিল অফিসার যে মিলিটারি একাডেমিতে প্রশিক্ষণের জন্য সর্বপ্রথম গিয়া হাজির হয়েছে। আমার বেচে আমি প্রথম হিসাবে আমি course senior। আমাকে training officer হিসেবে জাহাঙ্গীর কোম্পানির অন্যান্য প্রশিক্ষণাধীন সামরিক অফিসারদের সাথে রাখা হল। সবাই প্রশিক্ষনার্থী সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট বা সমপর্যায়ের। বয়সে আমার চেয়ে অনেক তরুণ। ক্যান্টিনে খাবার সময় তাদের সাথে কথা বলা শুরু করলাম। জিজ্ঞাসা করলাম কি হতে চান? অকপটে বলে ফেলল রাষ্ট্রপতি হতে চাই। বিষয়টি আমার কাছে কৌতূহল উদ্দীপক মনে হল। আমি অনেককে জিজ্ঞাসা করেছি চারজনকে পেয়েছি তারা রাষ্ট্রপতি হতে চায়। একসাথে তো আর চারজন রাষ্ট্রপতি হতে পারে না। তাহলে তো কাউকে না কাউকে শেষ করতে হবে। এই প্রশ্ন তো আমার মনে জাগতেই পারে। প্রশ্ন তো তাদের কাছেও করা যেতে পারে। যাহোক তেসরা নভেম্বর থেকে অনেকেই উৎসাহিত হয়েছেন।
তেসরা নভেম্বর মধ্যরাতে জিয়াউর রহমানকে ৪ বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ তার গৃহে অন্তরীণ রাখলেন।
ও দিকে বঙ্গভবনে কর্নেল রশিদ এবং ফারুক বন্দুকের নল দিয়ে দেশ চালাচ্ছে। পরদিন খালেদ মোশাররফের অনুসারী কর্নেল শাফায়াত জামিল, 46 independent ব্রিগেডের কমান্ডার বঙ্গভবনে গেলেন। ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফকে সেনাপ্রধান করার জন্য চাপ দিলেন। মোস্তাক অনেক মন্ত্রিসভার বৈঠক ছাড়া কিছুই করবেন না। তেসরা নভেম্বর দুপুর রাত পর্যন্ত মন্ত্রিসভার বৈঠক বসল। খালেদ মোশাররফ সেনাপ্রধান হলেন। দুই দল মুখোমুখি। মোস্তাক রশিদ ফারুক শঙ্কিত কি জানি আবার ফিরে আসে বঙ্গবন্ধুর অনুসারীরা।







