ফৈনিসিয়ানরা (লেবানিজ) ঠিক কবে আলজেরিয়ায় এসেছে তা না জানলেও সাধারণভাবে বলা যায় যে দিন মানুষ সাগরে নৌকা চালাতে শিখেছে তার থেকে বেশি দূরে না। তখনও লোহা আবিস্কার হয়নি যে তা দিয়ে একের পর এক তক্তা জোড়া দিয়ে সমুদ্রগামী জাহাজ তৈরি করবে। তবে তার জন্য মানুষ বসে থাকেনি। নীল নদ কিংবা দজলা-ফোরাত নদীতে চামড়া দিয়ে কাঠের তক্তা জোড়া দিয়ে নৌকা চালিয়ে হাত পাকিয়ে তারপর সাগরে নেমেছে। তারও আগে মুলি বাশের মতো নলখাগড়ার বান্ডিল বেঁধে নৌকা তৈরি করে আর পাল আবিস্কার করে বাতাসের শক্তিকে আয়ত্ব করতে শিখেছে। সে যুগে সিংহ, হায়েনার মত বিপজ্জনক পশু ছাড়াও আরো বিপজ্জনক মানুষের এলাকা পেরিয়ে সুমের (ইরাক) আর মিসর দুই দিক থেকে লেবানন (কেনান) এলাকায় মানুষ এসেছিলো। ২-৩ লাখ বছর আগে আফ্রিকায় আধুনিক মানুষের আবির্ভাব হয়েছে মর্মে নৃতাত্বিকদের কথা মেনে নিলেও বিরতিহীন আসা যাওয়া চালু ছিলো একথা নিরাপদে বলা যায়। খাদ্যাভাব বা প্রাপ্তি, নিরাপত্তা বা প্রভাব, আবহাওয়া বা মহামারি, মনুষ্যসৃষ্ট বা প্রাকৃতিক দূর্যোগ, ধর্ম বিশ্বাস ইত্যাদি নানাবিধ কারণে অভিপ্রয়ান উস্কে দিয়ে থাকবে। একই কারণে লেবানিজরা সমুদ্র পথে বাণিজ্যে নেমে থাকবে। ভূমধ্যসাগর অপেক্ষাকৃত শান্ত হলেও সাম্প্রতিক সমুদ্রতলে আবিস্কৃত প্রগৈতিহাসিক আমলের জাহাজডুবির প্রমাণ থেকে বাণিজ্যে বর্তমানের মত সেকালেও ঝুকি নেয়ার প্রমাণ মেলে।
আমরা যারা ইউপিয়ান ধাঁচের শিক্ষায় শিক্ষিত তারা আফ্রিকাকে অসভ্য দারিদ্রপীড়িত মহাদেশ হিসেবে ভাবতে অভ্যস্ত। কিন্তু একবারও ভেবে দেখিনা যখন মানুষ ইউরোপে বনে-জঙ্গলে খাদ্যান্যেষে ব্যস্ত তখন ফৈনশিয়ানরা ব্যবসার পণ্য নিয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিচ্ছে। বলাবাহুল্য ভূমধ্যসাগরের দক্ষিনপাড় সম্পূর্ণটাই আফ্রিকা। যদি সেখানে সভ্য কেউ না থাকে, ‘সান-খৈ’ হয় তবে পন্য কে নিবে। আন্দামানে জারোয়াদের কাছে কেউ কখনও তৈজসপত্র বা পোশাকের মত পণ্য নিয়ে পোর্ট ব্লেয়ারে জাহাজ ভিড়িয়েছে কি?

বারবের-আফ্রিকার কালো চুলের ফর্সা মানুষ
এবার আসি কারা বাস করতো আফ্রিকার উত্তরের এই অঞ্চলে? মিসরের সিউয়া থেকে শুরু করে আটলান্টিকের পাড় মরক্কো পর্যন্ত সবই ফরসা সুদর্শন মানুষের বাস। আমাদের প্রচলিত ধারণা আফ্রিকার মানুষ সবাই কালো; পাছা ও বুক মাংসালো এই ধারণাও নিছক ভুল। এই অঞ্চলের কাল চুলের সাদা মানুষগুলো সম্ভবত মানুষ সৃষ্টির সময় থেকে এই এলাকায় আছে। মানুষ সৃষ্টির আদিতে মানুষ কালো ছিলো না। কালো মানুষ সাদাদের চেয়ে বেশি আধুনিক। কারণ তাদের অতিরিক্ত একটা বায়োলজিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি আছে। তা আল্ট্রাভায়োলেট থেকে রক্ষার মেলানিন সংশ্লেষনের জন্য নিবেদিত। আল্ট্রাভায়োলেট থেকে বাঁচার জন্য প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে যা আমরা অর্জন করেছি।
ফিরে যাই আফ্রিকার ফর্সা মানুষদের কথায়। এরা যে আফ্রিয়ার আদি মানুষ তা কেউই স্বীকার করতে চায় না। তাই এদেরকে আফ্রো-এশিয়াটিক বলে। যেন এরা পরবর্তীকালে এশিয়া থেকে তথা আরব থেকে এসেছে। কিন্তু এরা আরবদের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইসলামের প্রথম যুগের প্রগাঢ় ধর্মীয় বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে তারিক বিন জিয়াদের মত বহু সেনানী ইসলামের পতাকাতলে সমবেত হলেও বিদ্রোহ করে নিজেদের স্বকীয়তা প্রকাশ করতে কখনও দ্বিধা করেনি। রোমান আমলে ভলুবিলিসের শাসক রোমে পড়ুয়া যুবা-২ রোমের রাস্তায় ঘুরিয়ে (Trianphal procession) মৃত্যুদন্ড, আর কার্থেজের পক্ষত্যাগী রোমের নব্য মিত্র মেসিনিসার (Missinissa) সুপারিশ অগ্রাহ্য হওয়ায় সাইফ্যাক্সের বিধবা পত্নীকে সেটা এড়ানোর জন্য বিষপান করতে হয়েছে। মেসিনিসার পুত্র চোখ-কান বুজে কাটালেও তার পুত্র মিসিপি’র (Micipi) পালিত পুত্র জুগার্থা (Jugurtha) নিশ্চিত পরাজয় জেনেও যুদ্ধবন্দী চেইন-বন্দী হয়ে রোমের শাসক সুল্লা’র (Sulla) সামনে তার রাজকীয় কানের দুলটি হতে বঞ্চিত করার সময় কান ছিড়ে ফেলা হয়। ১০৪ খৃ. পূর্বাব্দে রোমের (Tullinium) কারাগারে নিক্ষিপ্ত হলে অনাহারে মৃত্যু হয়। শান্তনা শুধু এইটুকুই পিটার ও পল দু’জন এইখানে বন্দী ছিলেন। আলজেরিয়ার মাসকারায় জন্ম আমির আব্দুল কাদের একইভাবে ১৮৪৭ সালে ফ্রান্সের কাছে বন্দী হয়ে একই ভাগ্য বরণ করেছে। এখন রোম নেই ফ্রান্স আছে, গাদাফির অবস্থা বিবেচনায় সম্পর্ক একই, পার্থক্য সময়ের ভার্সনে।
মিসরের সিউয়া থেকে শুরু করে মরোক্ক পর্যন্ত তাদেরকে নিজেদের বারবের বলে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করে। ইসলামে অটুট বিশ্বাস থাকলেও তাদের বিদ্রোহী মন এখনও আরবি ভাষার চেয়ে ফরাসিকে প্রাধান্য দেয়। মিজ সোয়াত আমাকে বলেছে সে অনেক কিছু আরবিতে না পেলেও ফরাসি ভাষায় পায়। তাদের দাবি দাওয়া বিশ্ববাসীর কাছে স্পষ্ট না হলেও কুর্দিদের মতো তারা যে দেশে থাকুক না কেন পৃথক সত্তা বজায় রাখতে চায়। আলজেরিয়াতে আমি তাদের তীব্র চাপা অসন্তোষ অনুভব করেছি। যেমনটা ইস্তানবুলে পরিচিত কুর্দি ‘বিরগুলের’ মাঝে দেখেছি।
ফেরা যাক বারবেরদের বিষয়ে আলজেরিয়ার ‘তহসিলি-এন-আজেরি’ এলাকায় পাথরের গায়ে আঁকা ১২০০০ বছর আগের আঁকা চিত্র থেকে তাদের স্রষ্টা যে বাববের তাতে কোন অস্পষ্টতা নেই। ঐ এলাকার বিশাল হ্রদের পাড়ে তাদের বসবাস ছিলো। জলবায়ুর পরিবর্তনে শুস্কতায় হ্রদের সঙ্কুচিত হওয়ার সাথে সাথে অপেক্ষাকৃত আর্দ্র পশুচারণ বা ফসল উপযোগী উত্তরের দিকে আসতে বাধ্য হয়। তাই তারা উত্তর আফ্রিকায় ছড়ানো ছিটানো।
লিব’রা মিসরের ফারাওদের তটস্থ করে রেখেছিলো।রামজেজ-২ এর সমাধিসৌধে এদের কথাই লেখা। মিসরের ২১ থেকে ২৪ বংশের ফারাও শাসক লিব’রা আসলে বার্বের। এদের নাম অনুসারেই লিবিয়া। সমগ্র ভূমধ্যসাগর তীরের ১০০ মাইল অভ্যন্তর পর্যন্ত রোমান আমলের শস্যাগার দু’হাজার বছর পর আজ অনেক পরিবর্তিত হলেও ইতিহাস তার সাক্ষ্য।

No Progress without war. কেমেট (মিসর) আর সুমের (ইরাক) এর মাঝে লেভান্ট যুদ্ধ বিগ্ররহের ময়দান। সমুদ্রে বাণিজ্যেও পণ্য নিরাপত্তার জন্য যুদ্ধ সাজ দরকার। প্রথমে স্রেফ বাণিজ্য তারপর বসতি তারপর রাজ্য এমনি করে গড়ে ওঠে কার্থেজ, আলজাজের, ওরন, কনস্তানটাইন। জনবৃদ্ধি, বাণিজ্য বৃদ্ধি, টেকনোলজি হস্তান্তর তারপর মূল থেকে বিচ্ছিন্ন। এমনিভাবে বিচ্ছিন্ন লেবানন থেকে কার্থেজ। যেমনটা পরবর্তীকালে ব্রিটেন থেকে আমেরিকা। নিজের মতো করে ভাবা, নিজের মতো করে গড়া। আলাদা চিন্তা-চেতনা। আলাদা দেশ, আলাদা জগত। কারা শাসন করবে নতুন না পুরাতন রা? ভিনজাতিকে ডেকে আনা, এক সময় বিজয়ীর বেশে, এভাবে এসেছে গ্রীস, রোম, আরব, স্পেনিশ, ফরাসি, ইংরেজ। আবার বিজিত ইহুদি, মুসলমানদের অটোমানরা স্পেন থেকে এনে এখানে ঠাঁই দিয়েছিলো। তাই ‘সাইরিনিকা’ লিবিয়া থেকে আলাদা সত্তা নিয়ে তাদের মতো করে থাকতে চায়। এদের সকলেই কম বেশি বংশগতির রহস্য ডিএনএ ছাপ রেখে গেছে। কেউ সাদা, কারও নীল চোখ, কারও নাক বাঁশির মতো কারও বা বিশাল বপু। এক কালে কোন সীমান্ত না থাকলেও এখন দেশে, এলাকায়, শহরে বিভক্ত বারবেররা। তবে আরবদের রক্ত ধমনিতে সবচেযে বেশি সংমিশ্রিত হয়ে প্রবাহিত হলেও তারা পৃথক, বারবের? তাই তারা আরব না বারবের; মুসলমান না বারবের এ সত্তার সন্ধানে! এই দোদুল্যতায় ভর করে একদিন হয়তো শক্তিধর কোন দেশের প্ররোচনায় স্বাধীন করে ফেলবে কোন এক এলাকার বারবের। একাংশের বারবেরদের নামে হবে স্বাধীন দেশ। তখন তাঁরাই হবে আদিবাসী আজকের মত উড়ে আসা কেউ না!







