ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের খসড়া cabinet অনুমোদন দিয়েছে। এই আইন সম্পর্কে সাংবাদিকরা উদ্বিগ্ন। বিভিন্ন টেলিভিশনের টকশোতে তার প্রমাণ মেলে। এই আইনে অনেকগুলো ভালো দিক আছে। পর্ণ সম্পর্কে ২০১২ সালের সুনির্দিষ্ট আইন থাকলেও ডিজিটাল জগতে তার কোনো প্রয়োগ দেখা যায় না। সে কারণে ফেসবুকে গভীর রাতে এমন সব বিষয় থাকে যা খুবই আপত্তিকর এবং মানুষকে বিপদে নেওয়ার ফাঁদ। এই আইনের ১৮ ধারায় সে সম্পর্কে বিধান রাখা হয়েছে আশা করা যায় এর প্রয়োগ হবে, মানুষ ভালো ফল পাবে । নিঃসন্দেহে একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ।
আমরা লক্ষ্য করেছি আজকাল বিভিন্ন দেশের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশীরা সামাজিক যোগাযোগেসহ তথ্যপ্রযুক্তির বিভিন্ন মাধ্যমের সহায়তায় হস্তক্ষেপ করে সিরিয়া, লিবিয়া ইত্যাদি দেশে শেষমেষ ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে। তথাকথিত আরব-বসন্তের সময় মিশরে আমরা যা লক্ষ্য করেছি তা নিশ্চয়ই এদেশে ঘটতে দিতে পারি না। ১৫ এবং ১৬ ধারা বিদেশিদের এইসব কর্মকাণ্ড বিরত রাখার জন্য ডিটারেন্ট হিসেবে কাজ করবে।
এই আইনের ব্যাপারে সাংবাদিকরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। তারা তাদের অনুসন্ধিৎসার সংবাদ সংগ্রহে বিপদের পূর্বাভাস ধরে নিয়েছে। কিন্তু সাংবাদিকরাই শুধু এ দেশের একক নাগরিক না, যদিও তারা নাগরিকদের স্বার্থ রক্ষা করবে এটাই স্বাভাবিক। তবে মনে রাখতে হবে এটা একটি পেশা। এবং খবরের মিডিয়াগুলো একটি ব্যবসা কিংবা ব্যবসা রক্ষা করা ঢাল। তাই বড় বড় business house টেলিভিশন খবরের কাগজের মালিক বা বাধ্য হয়ে মালিক হয়েছে। এদেশে যারা স্বল্পবিত্ত বা ক্ষমতার অধিকারী তাদের স্বার্থ কে রক্ষা করবে? আমরা একের পর এক লক্ষ্য করেছি বহু মেয়েদেরকে প্রলুব্ধ করে, বল প্রয়োগে কিম্বা সম্পর্ক স্থাপন করে আপত্তিকর ছবি প্রকাশ করে আত্মহত্যার মতো ঘটনা ঘটিয়েছে। সংবাদকর্মীরাই এসব ঘটনার সংবাদ মাধ্যমে তুলে ধরার জন্যই আমাদের গোচরীভূত হয়েছে। সুতরাং এ দুইয়ের একটি সর্বোচ্চ উপকারী প্রতিফলন এই আইনে থাকতে হবে।
আমরা লক্ষ্য করেছি গুপ্তচরের মত শব্দ ব্যবহার করে সাংবাদিক সমাজের আশঙ্কা আরও উসকে দিয়েছে। শুধু এই শব্দটি ব্যবহারের জন্য সাংবাদিকদের কাছে এই আইনের আকর্ষণ কমানো হয়েছে। ‘গুপ্তচর শব্দটি ব্যবহার না করে ‘গোপনেগোপনে সংগ্রহের” কথা উল্লেখ করে একই উদ্দেশ্য সাধিত করা সম্ভব ছিল।
আইনের খসড়া তৈরি বিষয়টা দিকে আলোকপাত করা যাক। আমাদের দেশে যা হয় তা হল অভিজ্ঞ বা বিশেষজ্ঞরা তাদের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানের আলোকে খসড়া পরিমার্জন করে থাকে। তবে মূল খসড়া মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা তৈরি করে থাকেন। এরপর আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং, ক্যাবিনেটের অনুমোদনের পর সংসদে পাঠানো হয়। সংসদ কমিটি গঠন থেকে শুরু করে তাদের পদ্ধতি অনুসরণ করে আইন পাস করে থাকে। সুতরাং চাইলে এখনও বহু স্তরে পরিবর্ধন এবং পরিমার্জনের সুযোগ আছে।
মূল draft তৈরির কাজটা মন্ত্রণালয়ে হয়ে থাকে। পৃথিবীর অনেক দেশের পার্লামেন্টের সাথে drafting বিশেষজ্ঞরা থাকেন তারা গবেষণা এবং জনসাধারণের মতামতের ভিত্তিতে খসড়া তৈরি করে থাকেন। আমাদের দেশে পদ্ধতি ভিন্ন। তবে মন্ত্রণালয় কারা আছেন কিভাবে কাজটি করছেন তার উপর খসড়ার গুণগত মান নির্ভর করে।
আমার মনে হয় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো নতুন বিষয়গুলো একবারে দন্ডবিধির মতো তৈরি করা সম্ভব না। এই আইন এখনো evolving পর্যায়ে আছে। ২০ ১৬ সালের ICT Act ২০১৩ সালে সংশোধিত হয়েছে।সংশোধন একটি চলমান প্রক্রিয়া।
আমার মতে কিভাবে অপরাধ সংগঠিত হয়েছে, তদন্তে কি পাওয়া গেছে, বিচারের সময় সাক্ষ্য-প্রমাণে কোন কোন বিষয় উঠে এসেছে, কোন সাজা হওয়া উচিত সে সম্পর্কে সংগঠিত অপরাধ, অভিযোগে নথিপত্র আদালত এবং পুলিশের কাছে রক্ষিত প্রমাণাদি পরীক্ষা করে আইনের খসড়া করা উচিত। সেক্ষেত্রে সঠিক চিত্র পাওয়া সম্ভব। অথবা বর্তমানে আন্দাজে ঢিল ছোড়ার মত আইন তৈরি করা ছাড়া কোনো বিকল্প থাকবে না। এগুলো পরীক্ষা করে খসড়া তৈরি করলে সুনির্দিষ্ট করা সম্ভব। এরপরও কোন কোন বিষয় অস্পষ্ট থেকে যাবে। বিশেষজ্ঞরা সেগুলিকে খসড়ায় কাভার করতে পারে। ভবিষ্যতে যেসব অপরাধের বাস্তব উদাহরণ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে সুনিদৃষ্ট draft করা সম্ভব। যে কারণে ব্রিটিশ আমলে করা অনেক আইন এখনো সমভাবে প্রযোজ্য। যেমন ১৯০৮ সালের সাক্ষ্য আইনে উল্লেখ সাক্ষ্যের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলা হয়েছে “কোন কিছুর উপর কোন কিছু দিয়ে কোন কিছু বোঝাতে চাইলে তা সাক্ষ্য” কম্পিউটার হার্ডডিস্ককে কিবোর্ড দিয়ে কোন কিছু লেখা হলে খালি চোখে দেখা যায় না। আউটপুট ডিভাইসের মাধ্যমে না দেখলে এর ভিতরে কোন কিছু আছে মর্মে অনুমান করা সম্ভব না। কিন্তু বহু বছর আগের স্বাস্থ্যের সংজ্ঞা সাক্ষ্য আইনের এই সংজ্ঞার আওতায় পড়ে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ক্ষেত্রে আমরা এখনও তা আশা করতে পারি না। আরো কিছু বছর অপেক্ষা করতে হবে। অন্য অন্য দেশের এই ধরনের আইন দেখলে সুনির্দিষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে। তাদের সাথে আমাদের আইনের কোনো ক্ষেত্রে মিল থাকবে না এটাই স্বাভাবিক। কোনোটি আমাদের বুঝতে অসুবিধা হয় বটে। তাদের এবং আমাদের এই ক্ষেত্রে উন্নয়নের অবস্থান ভিন্নতর ২০৪১ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন আজকের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ফারাক আকাশ-পাতাল হওয়া স্বাভাবিক।

