মিশন চীন-আরব যুদ্ধক্ষেত্র Talas তালাস:
লন্ডন থেকে রেজা, কুয়েত থেকে আকবর, আর বাংলাদেশ থেকে আমি, কিরঘিস্ততান থেকে আমাদের গাইড Azamat অর্থাৎ ভালছেলে রওনা হলাম ১২৬৭ বছর আগের যুদ্ধক্ষেত্র আবিষ্কার করতে। আজমত সাবেক কেজিবি সদস্য তবে বিগত হলেও কেজিবির বিগত হয় না। সাথে সোভিয়েত পিস্তল। কিরঘিজ ইংরেজিতে পরিণত করার জন্য গুলমিরা বা শান্তির ফুল। এই সুযোগে AkhilJibek (সাদা সিল্ক) গুলমিরার আপা অর্থাৎ মা আমাদের জিপে ২৯৩ কিমি দূরে বাপের বাড়ী যাচ্ছে। কে জানে গুলমিরার ৪২ জেনারেশন আগের পূর্বপুরুষ আরব ও পূর্বনারী মঙ্গল ছিলো না। মুখে মঙ্গলয়েড ছাপ ও দশাসই চেহারা আর পিটপিটে চোখ দেখে অনুমান করা অযৌক্তিক হবে না।
আমরা ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেয়া ট্যাং ডাইনাস্টির সাথে আরবদের যুদ্ধের যুদ্ধক্ষেত্র আবিস্কারে খিরগিস্তানের রাজধানী Bishkek থেকে ১২ সেপ্টেম্বর ১.৩০মি রওনা হলাম। আমরা কিরঘিজস্তান বলি কিন্তু ঐ দেশিরা নাসিকা ও তালু দিয়ে খিরঘিস্তান উচ্চারণ করে।
৪ হাজার কিলোমিটার দূর থেকে এসে ১২৬৭ বছর আগের আরব বেদুইনদের যুদ্ধক্ষেত্র তালাসের তালাসে বের হয়েছি। সোভিয়েত ইউনিয়নের সময় একমাত্র রাশিয়ান ছাড়া স্থানীয়় প্রত্নতত্ত্ব ইতিহাস নিয়ে খুব বেশি গবেষণা হয়নি। মুসলমানদের ইতিহাস হলে তো আর কথাই নেই। তাই এরা প্রাচীন ইতিহাস ভুলেে যেতে বসেছে, অপরপক্ষে মানাস কাহিনী নিয়ে বাড়াবাড়ির কমতি নেই।
সোভিয়েত ইউনিয়ন সৃষ্টির আগে গরমের দিনেও হাড় কাঁপানো শীতের একমাত্র রাস্তা তারাস থেকে বিশকেক যেতে ৩৪০০ মি উঁচু Otmok গিরিপথ পেরিয়ে দুইদিন লাগতো এবং একমাত্র যানবাহন ঘোড়া। তবে এ কথা ভুললে চলবে না হাজার বছর আগে এই রাস্তা সিল্ক রোড এর অংশ ছিল। তখনকার একমাত্র বাহন ঘোড়া গাধা কিংবা পায়ে হাটা। আজকের মত এত শক্ত পুলিশি ব্যবস্থাও ছিল না। আর মানুষ খেকো বন্যজন্তু ছিল। সোভিয়েত আমলে এখান থেকে বর্তমানের কাজাকিস্তানের সীমান্ত পর্যন্ত ঘোড়ায় চড়়ে যেেত। সেখান থেকে রেলে খিরঘিজ রাজধানী বিশকেক।

Otmok Pass ওতমক গিরিপথ
এখনো আমরা রাস্তায় সেই ঘোড়া বহর দেখতে পাই। তবে উদ্দেশ্য ভিন্ন দুধ, মাংস, কিউমিস, পনির ইত্যাদি। আমাদের মত এরাও মুসলিম সংখ্যাগুরু তবে ঘোড়ার মাংস, কিউমিস (ঘোড়ার দুধ গাজিয়ে আমাদের দেশের তাড়ির মত অ্যালকোহলিক পানীয়) খেতে ভালোবাসে।


এখনো ঘোড়ায় চড়ে মানুষ নিত্য দিনের কাজ করে।
আলেক্সান্ডারভকা গ্রামে রাস্তার পাশে Dungan মহিলা ফল এবং সবজির খোলা দোকান দিয়েছে। Dungan সিল্করুট আমলের আরব পিতা এবং চৈনিক মা হতে বংশোদ্ভূত। এদেরকে চেনার আর খুব সম্মানের চোখে দেখিনি। উপরন্ত এরা মুসলমান তাই এদের অনেককে হত্যা করা হয়েছিল। বাকিরা দেশ ছেড়ে পালিয়ে বিভিন্ন পার্শ্ববর্তী দেশে আশ্রয় নিয়েছে। হাজার হাজার বছর পর এরা এখন এই অবস্থায় পৌঁছেছে। এটা খুবই ধর্মপ্রাণ মুসলমান। মূলত কৃষি পেশায় হলেও তাদের আর্থিক স্বচ্ছলতা আছে। এমনি একটি দোকান থেকে ১৫ কেজি ওজনের দারবুজ (তরমুজ) ১১৩ সম যা ১১৩ টাকার সমান আর খওন Koun ১৭ ছম প্রতি কেজি।

Dungan মহিলা Koun বা Honey Melon সহ তার রাস্তার পাশের দোকানে দাঁড়িয়ে আছে
Koun না খাওয়ালে বোঝা সম্ভব না, রং জমে যাওয়া সাদা মধুর মত, কামড় দিলে আপনা আপনি মুখের মধ্যে গলে যায়, মুখে স্পর্শ করলে ভিন্ন অনুভূতি হয়। মিষ্টি এবং স্বাদ কেমন সেটা আপনি এসে খেয়ে দেখবেন।

Yurt ইয়র্ত
ক্ষুধা লেগে গেছে বলতেই রাস্তার পাশের ‘ইয়র্ত’এর (চামড়ার বা কার্পেটের তৈরি গোলাকার ঘরে) কাছে গাড়ী থামিয়ে কয়েকটিতে ‘তামাক বারবে’ বলতে অবশেষে সাড়া মিললো। কোন ইয়র্তে আলো নেই, সন্ধ্যা সমাগত তাই খাবার শেষ, খামোখা তেল না পোড়ানোর স্বাভাবিক। এয়ার্তের পাশে ঘোড়া, ভেড়া আর ছাগলের পাল। ফ্রেশ ঘোড়ার দুধ খাওয়ার ইচ্ছা থাকলেও আকবর ভাইয়ের ঘোর আপত্তিতে বাদ দিতে হলো।

Otmok অথাৎ Mountain Pass থেকে রাস্তা দুই ভাগ হয়েছে ডানদিকে তালাস ১০০ কিমি, ওস ৪০০ কিমি.। সবাই ক্ষুধার্ত এই নির্জন পাহাড়ের মাঝে রাস্তার সংযোগ স্থলে একটি রেস্তোরা। সেখানে নেমে স্রেফ ভেড়ার মাংস সিদ্ধ আর নুডুলস বটকা গন্ধ থাকলেও খেলাম। এবার আমরা তালাসের দিকে চললাম। যাত্রা শুরু হলো চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার গুলমিরা গাড়ী থেকে নামাতে নিষেধ করল। কারণ প্রতি বছর কিছু মানুষ নেকড়ের খাদ্য হয়। কিছুদুর আসতেই শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল ভাবলাম ফুসফুস কাজ করছে না। গুল স্বরণ করিয়ে দিল আমরা ৩৩২৬ মিটারের ওতমক গিরিপথ পার হচ্ছি। এর চেয়ে বেশি উচ্চতায় উঠেছি কিন্তূ এমন হয়নি। অন্ধকার তাই জিজ্ঞাসা করে জানলাম এখানে বৃক্ষ নেই। আমরা বাংলাদেশিরা প্রচুর গাছপালার পরিবেষ্টিত থাকি তাই অনুভব করি না। ভারতের কারগিল কিংবা লেহ এলাকায় গিয়ে হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিলাম। মাথা ব্যথা করে, ঘুম হয়় না ইত্যাদি। বৃষ্টি হয় না তাই ঝর্ণার দু’পাশ ছাড়া গাছ, এমনকি ঘাসশৃণ্য।অক্সিজেনের অভাব এ যেন চাঁদের দেশ। এমন সময় একটা নেকড়ে ঘাড়ের পশম খাড়া করে রাস্তা ঘেসে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর আলো অর্থাৎ গ্রাম মিললো।

আলমাস
Amanbayev গ্রাম:
রাত দশটায় উলান আমাদেরকে তার গ্রামের রেস্তোরায় নিয়ে আসলো, ততক্ষনে রেস্তোরাঁ বন্ধ হয়ে গেছে রেস্তোরাঁর মালিককে তাই ফোন করে আসতে বলল। মালিক আসার পরে আমাদেরকে খাবার তৈরি করে দিল। ইতিমধ্যেই উলান ও রাইসার Okul Ata (God father) আলমাস আসলো তার সাথে আমরা কারাখানিদ থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত কিরঘিজ ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করলাম। সে একসময় Chyngiz Choku এর বাবার প্রতিষ্ঠিত স্কুলে শিক্ষকতা করেছে। এরপর সে সোভিয়েত সরকারের থার্ড গ্রেডের চাকরি করেছে, সর্বশেষ পরিবেশ বিভাগের তালাসে জোনাল প্রধান হিসেবে কাজ করে ছেড়ে।
13 সেপ্টেম্বর খাওয়া সেরে রাত 11 টার সময় উলান ও রাইসার আমান বায়েব গ্রামের বাড়িতে আসলাম, বিশাল আকারের বাড়ি।


আমানবায়েভ গ্রামে ঈশান ও রাইসার বাড়ী
এদেশে ফ্যামিলি বেশ বড়, একসাথে থাকা ভালোবাসে। এই গ্রামের 1000 বাড়িতে প্রায় 10 হাজার মানুষ বাস করে। শীতপ্রধান দেশে সাধারণত ছোট ছোট বাড়ি হয় এখানে তার ব্যতিক্রম। বাড়িগুলো বিশালাকৃতির। বাড়ির সাথে বাগান, খামার ও বাড়ির জন্য প্রয়োজনীয় আঙ্গিনা সবই আছে।
আমরা রাইসাদের বাড়িতে রাতে থাকলাম। গরমকাল হলেও আমাদের কাছে প্রচন্ড শীত মনে হলো তবে তাদের বড় বড় কম্বল শীতকে সহজেই জয় করার সুযোগ করে দিল। পানি বরফের মতো ঠান্ডা; প্রায় ৯ মিটার গভীর কূপ থেকে বিদ্যুতের মোটরের সাহায্যে উত্তোলন করে।

ঈশান খুব থেকে বৈদ্যুতিক মোটরে পানি তুলছে
সেইপানি দিয়ে মুখ ধুলাম। সকালে আমাদেরকে ঘরের ভিতরে গিজারে গরম পানির বেসিনে মুখ ধোয়ার জন্য আহ্বান জানালো। রাইসা সকাল ছয়টায় উঠে আমাদের জন্য খাবার তৈরিতে ব্যস্ত। সেই সাথে তার ৫ ছেলেমেয়ের মধ্যে বড় তিন মেয়েকে স্কুলে পাঠানোর জন্য ও প্রস্তুত করাতে হয়।

আলমাস স্থানীয় ইতিহাস সম্পর্কে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল। আমাদেরকে বলল যে রাশিয়ান আমলে কিরগিজিস্তানের ইতিহাস সম্পর্কে কখনো বিস্তারিত স্কুলে পড়ানো হয়নি। রাশিয়ার ইতিহাস প্রাধান্য পেত। গত ৩৪ বছরে খিরগিস্তানের ইতিহাসের প্রতি জোর দেওয়া হয়েছে। তাই স্থানীয় জনসাধারণ আরব ও চায়নার মধ্যে তালাশ-এর যুদ্ধ সম্পর্কে কিছুই জানেনা। রাইসা খুব সকালে উঠেই তার পাঁচটা ছেলে মেয়েকে স্কুলে জন্য প্রস্তুত করে আমাদের জন্য খাবার তৈরি করে দিল। রাইস স্থানীয় সরকারের কাজ করে। উলান তেল কোম্পানিতে কাজ করে। তাদের একাধিক কার আছে এর মধ্যে Pajero V8 অন্তর্ভুক্ত।


রাইসা বাড়ী সংলগ্ন বাগান থেকে আমাদের জন্য আপেল তুলছে।
আমাদের বিদায় বেলায় রাইসা আমাদের জন্য আপেল তুলে দিল। তাদের যতগুলো বাড়িতে গিয়েছি দেখেছে মেয়েরা যথেষ্ট পরিশ্রম এ এবং ঘরের বিষয়গুলো তারা একাই সামাল দেয়। তাই জানতে ইচ্ছে হলো কোন ধরনের মেয়েদের এদেশের ছেলেরা পছন্দ করে। আমি তাদেরকে জিজ্ঞাসা করলাম যেখানে ভাল স্ত্রীর সংজ্ঞা কি। তারা বলল যে পরিবারের সবার জন্য যত্ন নিবে। ভালো family’ হবে। শহরে ব্লান্ট হেয়ার সৌন্দর্য ইত্যাদি না করা হলেও গ্রামে প্রায় সবার মাথায় স্কার্ফ থাকে তাই চুলের রং খুব একটা বিবেচনা বিবেচ্য বিষয় হচ্ছে পরিবারকে যত্ন না অন্যদের প্রতি আত্মীয়-স্বজন অন্যদের প্রতি সদয় কিনা। এখন এখানে তালাকের হার বেশ বেশি প্রায় 25-30 শতাংশ। তালাক খুবই সোজা ইসলামী সিস্টেমে তবে সাম্প্রতিক বিয়ে রেজিস্ট্রেশন করার নিয়ম হয়েছে।

পরদিন অর্থাৎ 14 সেপ্টেম্বর দুপুর বারোটায় যুদ্ধক্ষেত্রে সন্ধানে বেরিয়ে পড়লাম সাথে উলান এবং আলমাস। গ্রাম থেকে বেরিয়ে আসতেই চোখে পড়লো বিশাল উচু পাহাড় তার মাথায় বরফ মিলে একাকার হয়ে গেছে।

Chyngiz Choku , 4410m, Manas Choku 4484m.
প্রথমশৃঙ্গটি তাদের জাতীয় বীর মানাস এর নাম অনুসারে, দ্বিতীয়টি তাদের শ্রেষ্ঠ লেখক Chyngiz Choku , 4410m, Manas Choku 4484m. জিজ্ঞাসা করায় আলমাস মহা প্রশান্তিতে উত্তর দিলো, মনে হল সে যেন এই প্রশ্নটির উত্তর দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়েছিল। সে জানালো সোভিয়েত আমলের সরকারি অফিসার থাকাকালীনই নামটি তার নিজেরই দেওয়া। পাদদেশে Chyngiz এর নিজের গ্রাম Sheker তার নিজের tribe নাম অনুসারে দেওয়া হয়েছে।

Chyngiz Choku এর ছবি

এই বছর তার 90 তম জন্ম বার্ষিকী 80 বছর বয়সে 2007 সালে মৃত্যুবরণ করে। তার বিখ্যাত উক্তি “মানুষের জন্য সবচেয়ে কঠিন কাজ প্রতিদিন মানুষ থাকা”।


টার্কি
পথে দেখা হলো টার্কির সাথে, এদের ভাষায় এদের বন্য টার্কি উলার Ular বলে। গৃহপালিত টার্কিকে এদের ভাষায় Indyuk .
অল্পক্ষণের মধ্যেই আমরা Seker গ্রামে টিলার উপর পৌঁছে গেলাম সেখানে সাদা রঙের একটি সাধারণ সমাধি। এটা কবরস্থান যেখানে আরব এবং চাইনিজ যোদ্ধারা কোন বিরোধ ছাড়াই 1267 বছর যাবত ৭৫১ সালের জুলাই মাস থেকে শায়িত আছে। জানা গেল সাদা কবরটি মাটির ছিল কিন্তু ১৯৭৪ সালে কোন সহৃদয় ব্যক্তি এটি কে ইট দিয়ে মাটির সমাধির আদলে বর্তমান সমাধিটি নির্মাণ করেছেন।

শেকের গ্রামের টিলার উপর আরব যোদ্ধার কবর
ছিটকিনি খুলে ভেতরে ঢুকতেই সমাধির ভেতর একটি বিছানো কার্পেট চোখে পড়ল। পূর্ব দিকে একটি বেঞ্চের উপর কয়েকটি জায়নামাজ রাখা। পশ্চিম দিকে আরবি লেখা একটি পাথর ,পাশেই একটি বেঞ্চ।


পাথরে আরব যোদ্ধার পরিচয়
পাথরের ওপর আরবি লেখা থেকেই মৃতের পরিচয় পাওয়া যায়।
Talas থেকে স্থানটি ১০০ কিলোমিটার দূরে। এখানে কিরঘিজ খানদের প্রাসাদ ছিল। যুদ্ধক্ষেত্র প্রায় 100 কিলোমিটার বিস্তৃত ছিল। এই এলাকা থেকে প্রথমে যুদ্ধ শুরু হয়। তালাশ নদীর তীরে চীনাদের পরাজয়ের মাধ্যমে যুদ্ধ শেষ হয়। এখান থেকে তালাশ নদীর তীরের যুদ্ধক্ষেত্র প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে। এই পাহাড় থেকে সামনে আরেকটি পাহাড়ের সাথে ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ পথ দিয়ে সংযুক্ত ছিল। সেই পাহাড়ে সুড়ঙ্গের ভেতরে রসদ সংরক্ষণ করা হতো। আমরা এখন সেই পাহাড়ে যাব।
এই পাহাড়টির নাম Joun Dobo অর্থাৎ প্রশস্ত পর্বত।

একই শেখের গ্রামে কয়েক মিনিটের মধ্যেই Juan Dubo টিলায় পৌঁছে গেলাম। টিলার বিস্তৃত এলাকাজুড়ে কবরস্থান। আলমাস জানালো সবে টেনে আনার আমল থেকেই ঐতিহাসিক স্থানগুলোকে কবরস্থানে রূপান্তরিত করা হয়েছে। এখানে কবরস্থ করার সময় প্রাচীন আমলের অনেক নিদর্শন পাওয়া যায়। তার কয়েকটি স্কুলে রক্ষিত আছে। আমাদের সামনে একটি কবরের ওপর হাজার বছর আগের মাটির পাত্র চোখে পড়লো। একই ধরনের তবে বড় আকারের পাত্র তুরস্কের রাজধানী ‘হাটুসা’তে দেখেছি। সকল মানব সম্পদের জন্য এমন একটি সম্পদের এমন অব্যবস্থাপনা দেখে খারাপ লাগলো। পরক্ষনেই ভাবলাম আমরা আমাদের প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ সাথে কতদূর ন্যায়বিচার করতে পারছি। সিরাজউদ্দৌলার পরিবার যেখানে আটক ছিল যেখান থেকে নৌকায় নিয়ে গিয়ে তাদেরকে ডুবিয়ে মারা হয়েছিল সেসব স্থানের জন্য আমরা কি করেছি। আমাদের শিশুদেরকে পরবর্তী প্রজন্মকে কতদূর শিখেছি? যাহোক এলাকাটি বোঝার চেষ্টা করলাম পাশ দিয়ে পানি বয়ে যাচ্ছে, প্রাচীন আমলের সকল প্রাসাদগুলোর পাশ দিয়ে যে ‘মট’ Mout তৈরি করা হতো ঠিক তারই আদলে এখনো পাশ দিয়ে পানি বয়ে যাচ্ছে। টেইলার এক পাশ দিয়ে একটি সুরঙ্গ একটু ভিতরে গিয়ে চার ভাগ হয়ে চারটি সুড়ঙ্গ হয়েছে কিন্তু এই 1267 বছরে উপর থেকে মাটি পড়ে সুরঙ্গ গুলো বন্ধ হয়ে গেছে। তবে একটু পাহাড়ের উপরে গিয়েই নিচের দিকে বাতাস চলাচলের জন্য খাড়া সুড়ঙ্গ দেখা গেল। পাশে আরো ভরাট নিচু জায়গা দেখা গেল সম্ভবত আরো সুরঙ্গ ছিল যা এখন বন্ধ হয়ে গেছে। আলমাস আমাদেরকে জানানো এই পাহাড় থেকে শেকের পাহাড় পর্যন্ত সুরঙ্গ দিয়ে সংযুক্ত ছিল। রসদ সংরক্ষণাগার আর খানের প্রাসাদের মধ্যে এই সুরঙ্গ দিয়ে যোগাযোগ ছিল। দুটি পাহাড়ের দূরত্ব এক কিলোমিটারের মত হবে। এই পাহাড়ের উত্তর দিকে সভা করার জন্য একটি চন্দ্রাকৃতি স্থান এখনও দৃশ্যমান, যা অনেকটা অ্যাম্ফিথিয়েটার এর আদলে সাজানো।
অনেক সময় শাপে বর হয় অসুর বাণী পালের প্রাসাদ আগুনে পুড়িয়ে দেওয়ার জন্য কাদার ট্যাবলেটগুলো পড়ে স্থায়ী পোড়ামাটির ট্যাবলেটে পরিণত হওয়ায় আশূরবানি পাল আমাদের হাতে এসেছে। ঠিক তেমনি সোভিয়েতদের ইতিহাস ঐতিহ্য পরবর্তী প্রজন্ম থেকে দূরে রাখার জন্য প্রচেষ্টার কারণে কবরস্থান তৈরি প্রাচীন সেই তথ্য ইন সিটু সংরক্ষণ সহায়তা করেছে। একদিন হয়তো এরা নিজেরাই নিজেদের ইতিহাস খুঁজে বের করবে। এক সময়ে নিজেদের ঐতিহ্য তাদের তৎকালীন বন্ধু জীবন উৎসর্গকারী আরব যোদ্ধাদের তথ্য আবিষ্কার হবে। আমাদের আজই বিশকেক ফিরতে হবে তাই আর কালক্ষেপণ নয় তালাশ নদীর তীরে যুদ্ধের সমাপ্তি স্থলে পৌঁছাতে হবে।
তাই এখান থেকে আমরা চললাম তালাশ নদীর তীরে যেখানে তিনটি মাটির দুর্গ ছিল। এখানে আর ওদের সাথে সেনাদের যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। আরবরা বিজয়ী হয় চীনা সেনারা এখান থেকে পালিয়ে যায়। শুধুমাত্র সামান্য অংশ নদীর ধারে ক্ষেতের মধ্যে দৃষ্টিগোচর হয় বাকি অংশের অস্তিত্ব নেই। তবে এখানে যাওয়ার আগেই একটি মসজিদ এবং তার পিছনের আপেল বাগান নজর কাড়ে। তার পিছনে তালাশ নদী খালের মত অংশ দিয়ে পানি প্রবাহিত হয় বাকি অংশ শুকনো নদীর তলদেশ।


দুর্গের দেয়ালের বিদ্যমান অংশ

মসজিদ

দুর্গের দেয়ালে ঢোকার আগে মসজিদ ও আপেল বাগান


তালাশ নদীর শুকনো গর্ভ
এখান থেকে রওনা হলাম Talas Region Carabouri District এর Kirovoskoe water Resorvior. এই বাধ সিল্ক রুটের তিনটি ঐতিহাসিক শহর Shelzhy, Budenovka, Beisheke কাপ্তাই বাধের মত পানিতে ডুবে গেছে।

বাঁধে লেনিনের মূর্তি

এই পানির নিচে ডুবে আছে তিনটি ঐতিহাসিক শহর।
আমাদের মিশন শেষ, সময় শেষ। রওনা হলাম বিশকেক এর উদ্দেশ্যে। আজমত গাড়িচালক আগেই বলেছি। সে এক হাতে চালিয়ে আমাদেরকে বিশকেক নিতে চায় কিন্তু বিশকেক এখনো চারশো কিলোমিটার দূরে। যাওয়ার পথে আমরা তালাশ শহর দেখে যেতে চাই। ছোট্ট শহর তালাশ অন্যান্য শহরের মতোই ছিমছাম সাজানো গোছানো। এদের শুধু একটা জিনিস এই অভাব দেখা গেছে সেটা হচ্ছে এদের টয়লেট। ওয়াটার সিল না মাছের আসা-যাওয়ায় কোন বাধা নেই। মূলঘর থেকে কিছুটা দূরে সীমানা দেয়ালের বাইরে। সম্ভবত বাইরে থাকার কারণে তাপমাত্রা শূন্যের নিচে নেমে গেলে টয়লেটের আটকে থাকা পানি বরফ জমে যায় তাই ময়লা পাস করতে পারে না। সম্ভবত এ কারণেই তারা এ ধরনের টয়লেট ব্যবহার করে। কিন্তু ভালো হোটেলে আধুনিক টয়লেট আছে। তালাশ শহর 35 হাজার মানুষের হলে কি হবে সুন্দর আধুনিক হোটেল আছে। এমনি একটা হোটেলের ছবি দেখছেন, এখানে আমরা খাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম, সন্ধ্যা ছয়টা বেজে গেলেও দুপুরের খাওয়া।

তালাস শহরে হ

এখানে আজমতের বন্ধু আনোয়ার আমাদের খাবার জন্য নির্ধারিত করে রেখেছে।

রেস্টুরেন্টের নাম চাই খানা অর্থাৎ টি-হাউজ তবে সব ধরনের স্থানীয় খাবার পাওয়া যায়। Besh Barmak বা ঘোড়ার মাংস আছে। আকবর ভাই এর ঘোড়ার মাংস নাম শুনার সাথে সাথে দৌড় দিয়ে হল থেকে বেরিয়ে যেতে চায়। তাই আজ সন্ধ্যায় আর ঘোড়ার মাংস টেস্ট করা হলো না। আমরা তোকোচ (তন্দুর), লাঘমান, গানফান


গানফান
নফান, সালাদ ও চা অর্ডার দিলাম। এরা চা দিয়ে খাবার শুরু করে। এমনকি রুটি চা দিয়ে ভিজিয়ে খায়। এরপর সালাদ। টমেটো আর শসার সালাদ অসাধারণ স্বাদ, এখানে সাধারণত রাসায়নিক সার ব্যবহার করা হয় না।


তোকোচ


চায়ে বা চা


সালাদ
এরপর মূল খাবার একে একে আসলো।

Santa (সালমন)
খাবার শেষে সন্ধ্যা 7 টা 30 মিনিটে আমাদের যাত্রা শুরু হলো । বিশকেক পৌঁছাতে হলে এখনও 300 কিলোমিটার যেতে হবে। এবার ড্রাইভিং সিটে বসেছেন আছে আকবর ভাই।




