১৮৩০ সালের আচমকা যে দেশটিতে ফরাসিরা গোলা বর্ষণ শুরু করলো। দখল করে নিল সায়ত্বশাসিত অটোমান pradesh। উকবা ইবনে নাফির আফ্রিকা বিজয়, আর কাহিনার প্রতিশোধ ও তার পুত্রের মুসলিম ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার পর এতবড়ো ঝাকুনি এখানকার মুসলিমরা খায়নি। ১৫ লক্ষ মানুষের অবিশ্বাস্য নৃশংস হত্যার অর্জিত আলজেরিয়ার স্বাধীনতা। আমাদের ৩০ লক্ষ শহীদের পর তাদের স্থান। ছোটবেলায় জামিলা বুপাশা, জামেলা বুহারিদ, জামিলা বুয়েজার মত স্বাধীনতা সংগ্রামীদের আত্মত্যাগের কথা পড়েছি।
সেই দেশে দুপুর ১২ টা ৫০ মিনিটে হূয়ারী বুমেদীন বিমান বন্দরের গ্রানাইটের মেঝেতে জীবনের প্রথম পা রাখলাম।

দু’ঘণ্টাইমিগ্রেশনের লাইনে দাঁড়ানোর পর আলজিয়ার্সে ঢোকার বৈধতা পেলাম। বিমানবন্দর থেকে বারো মাইল দূরত্বে আলজিয়ার্স শুরু হলেও ৫০ কিলোমিটার দূরের ভূমধ্যসাগরের তীরের পাম বিচ এলাকার আব্বাসিদ হোটেলে পৌঁছাতে আরও এক ঘন্টা।
মিজ সোয়াতের রাখালিতে হোটেলে আসতে আমাদের কোনই বেগ পেতে হল না। সে নিজেই ‘বারবের’ Tamajik ভাষার প্রতি আবেগপ্রবণ, যদিও ফরাসি, ইংরেজি এবং আরবি স্বচ্ছন্দে বলতে পারে। Human evolution human migration বলতেই তার deeply religious, ইসলামের প্রতি প্রগাঢ় শ্রদ্ধার পরিচয় পেলাম। বুঝতে দেরি রইল না কেন হাজার হাজার বারবারদের বিভিন্ন সময়ে হত্যা করা হয়েছে। কেন অন্যান্য সংখ্যালঘুর মতো তারাও একই সাথে দলবেঁধে লা’ কসবা তে বসবাস করে। আসলে একই ধর্মের হলেও আদিতে পার্থক্য থাকলে তা দূর হয় না। যেমন ইরান-ইরাক মুসলমান কিন্তু পূর্বপুরুষরা এলামাইট আর ইরাকের পূর্বপুরুষরা sumerian এসিরিয়ান সবসময়ই যুদ্ধ-বিগ্রহ করেছে। তাইতো জীবজগতের থিওরি ontogeny repeats phylogeny.
হোটেলে এসেই গোসল করে বেরিয়ে পড়লাম পিছনের বিচে। বহু মানুষ মাছ ধরছে। পরিষ্কার পানি আর মৃদু ঢেউ।
পশ্চিমেরহেলে পড়া সূর্য পূবের শহরতলীর ভবন গুলোর উপর পড়ে মনোরম দৃশ্য সৃষ্টি করেছে। সবাই পাথরে গা এলিয়ে উপভোগ করছে।
সন্ধ্যা সাতটায় বেরিয়ে পড়তে হবে রাতের খাবারের জন্য। সোয়াত এসে হাজির হলো অদূরে মেসিনিসা রেস্তোরাঁতে রাতের খাবার খাওয়ার জন্য। বারবারদের সালাদ অপূর্ব। এরপর রাতের খাবার টুনা মাছের একটা প্রকাণ্ড টুকরো। হবেই বা না কেন, এদের বিশাল বলিষ্ঠ বপু রোমান আমলের নুমিডিয়ান যোদ্ধাদের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। ভূমধ্য সাগরের ওপারে উত্তরে রোম। এখনো কি তারা বন্ধু হতে পেরেছে? সম্ভবত না? তাইতো ক’বছর আগে italian বিমান বাহিনী গাদ্দাফিকে শেষ করার জন্য বিনা প্ররোচনায় যুদ্ধে নেমেছিল।বেশ কিছু বছর যাবত education for sustainable development অনুসরণ করে আসছি। খাবার নষ্ট করি না, আজকে ক্ষমতার বাইরে। আমরা শেয়ার করে খাবার শেষ করতে পারলাম না। অগত্য নষ্ট করতে হলো।
১৮ নভেম্বর: হোটেলের পিছনে ভূমধ্যসাগর। সকালে উঠেই সাগরের দিকে বেরোলাম সূর্যোদয় দেখার উদ্দেশ্যে। কোন দেখা নেই, আসলে শহরের ভবনগুলো ভেদ করে ওঠার ক্ষমতা নেই। ব্রেকফাস্টে ঢুকে পড়লাম। বরাবরের মতো এবারও baking আইটেম avoid করে জয়তুন, Cargage, তাজা মাংসালো টমেটো, ক্যাপসিকাম, চেরি ও উগার্ড সিদ্ধ ডিম-গোলমরিচ দিয়ে প্রাতরাস সারলাম। সকাল আটটায় বেরোনোর কথা থাকলেও ৮.৪৫ বেজে গেল। আমরা সোয়াত বেরিয়ে পড়লাম Tipaza উদ্দেশ্যে। একসময় তিউনিসিয়া, লিবিয়া আলজেরিয়া, motorco অর্থাৎ বারবার দেশে অবাধ যাতায়াত ছিল। বিংশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে ইউরোপের ঔপনিবেশিক শক্তি উত্তর আফ্রিকা টুকরো টুকরো করে বারবেরদের অবাধ আদান-প্রদান বন্ধ করে দিয়েছে।
বারবেরদের দেশে ফৈনিশিয়ানরা ব্যবসা করতে এসে কাশিমবাজার এর মত কুঠী স্থাপন করে। সেখান থেকে বসতি তারপর কলোনি। একদিন তারা মিলেমিশে একাকার। তাদেরকে পরাজিত করে গ্রিক, তাদের কাছ থেকে হাতবদল হয়ে রোমানরা এখানে কলোনি স্থাপন করেছিল। তারই কিছু নিদর্শন এখনো টিপাজাতে আছে। ৫০ কিলোমিটার দূরের টিপাজা আমাদের গন্তব্য।
টিপাজাতে এক সময় ফৈনিসিয়ান, কেনাইট বা লেবানিজদের ব্যবসায়িক আউটপোস্ট ছিলো। তাদেরকে পরাজিত করে রোমানরা কলোনি স্থাপন করে। রোমে সরবরাহ করার জন্য শুরু করে অলিভ অয়েলের ব্যবসা। কিন্তু সেই আদিবাসী বারবেররা এখনো ওই এলাকায় বসবাস করে। কিভাবে এখন আলাদা একটা প্রদেশে বা উলাইয়া’র রাজধানী মাত্র ৩০ হাজার মানুষ বাস করে।
টিপাসা পোর্টে আসলাম বিভিন্ন প্রকার মাছ দেখলাম তরমধ্যswordfish ছিল।

তরবারি (সোর্ড) মাছ- পোর্ট আলজিয়ার্স, মাছের বাজার

পোটেঅবস্থিত saint salsa হোটেলে বসে পড়লাম। আমাদের সহকর্মীদের কেউ কেউ সোর্ডফিশ খেল। আমি আলজেরিয়ার ভাষায় লাদোগাদ’ (brim) মাছ, সাথে পটেটো চিপস, লেটুস পাতা, বিট ও গাজর ভিনেগার ও জলপাই তেল দিয়ে খেলাম।
জসাথে সবসময় bread, এবারও তার ব্যতিক্রম ছিল না। ব্যারিস্টার সাহেবের কাছ থেকে সোর্ড মাছ টেস্ট করলাম, হালকা গন্ধ থাকলেও আশ ছিল না। sword মাছ বিশালাকৃতির হলেও এট ঠিক ঐ পর্যায়ের ছিল না।
যশোর শহরে আমাদের পৈতৃক বাড়ি পুরাতন কসবা’য় আলজিয়ার্সে এসে আল-কসবা পেলাম। কসবা অটোমান আমলের তুর্কি শহর হলেও অপূর্ব নীল জলের বারবের সাগর তীরের প্রাচীন বসতি। এখনো মধ্যযুগের পাথর বসানো রাস্তা। গরিব বারবেরদের বাসস্থান। ক’বছর আগে ভূমিকম্পে একটি ভবনের কিছু অংশ ধসে পড়েছে। অন্যগুলো দাঁড়িয়ে আছে তবে বয়সের ভারে নুজ্য। সিঁড়ি দিয়ে একদিক থেকে ধাপে ধাপ অজান্তেই পুলিশের গাইডেন্সে একই জায়গায় এসে পৌঁছলাম। তুর্কি আমলের ভবন হলেও তার অনেক আগে থেকে এখানে শহর। তুর্কিদের আগে রোমান তার আগে গ্রীক, তারও আগে সুদর লেবানন থেকে phoenician’রা এখানে এসেছিল তাতে কোন সন্দেহ নেই।
এরইপাশেই ফরাসি স্থাপত্যের সারি সারি শত বছরের পুরাতন বিশাল আকৃতির ভবন। এরই মধ্যে একটি মসজিদ ফরাসিরা

গীর্জায় রূপান্তরিত করেও টিকাতে পারেনি। ১৯৬২ সালের স্বাধীনতার পর পুনরায় ৯৯ ভাগ মুসলমানের দেশে মসজিদে ফিরিয়ে আনা হয়।
ফরাসিদের দূঃশাসন আর শোষণ এখনো শাসকরা ভুলে যায়নি। তাই আজও সেনাবাহিনী ফরাসি ভাষার বদলে ইংরেজি ব্যবহার করে তাদের নাম দিয়েছে defence ministry. কিন্তু শহরের বেশিরভাগ লোক ফরাসি ভাষায় কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। আরবি তাদের পারিবারিক ভাষা। বারবেরদের Timazig ভাষা। ৯০ ভাগ তেল নির্ভর অর্থনীতি হলেও আজও তারা পর্যটকদের জন্য আয়ের একটি সম্ভাব্য বড় উৎস ঐতিহাসিক স্থানগুলো খুলে দেয় নি। আলাপচারিতায় জানা গেল তাদের মনে শঙ্কা তিউনিসিয়ার মতো ইসলামী ঐতিহ্য হারিয়ে যেতে পারে। পর্যটকেরা এসেই সুরা আর রমনের খোঁজে ইসলামিক সমাজকে পশ্চিমা মূল্যবোধে কলুষিত করতে পারে।
স্বাস্থ্য এবং শিক্ষা ফ্রি। সাক্ষরতার হার প্রায় শতভাগ, কালো চুলের ফর্সা দশাসই চেহারার সুদর্শন মানুষগুলোর স্বাস্থ্য অবস্থাও ভাল। প্রগৈতিহাসিক কাল থেকে বিভিন্ন এলাকার মানুষের সংমিশ্রণে নীল চোখের মানুষ থেকে শুরু করে এশিয়ানদের রক্ত এদেব ধমনীতে প্রবাহিত হচ্ছে।
তেজস্বী নারীদের ফরাসিদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর ঘটনার অনেক আগ থেকেই এদের নারী বীরত্ব শুরু। আল-কাহিনার কথাই ধরা যাক। স্বামীকে হারিয়ে রাজদণ্ড হাতে নিয়ে কুশালিয়া’র মাধ্যমে আফ্রিকা বিজয়ী মক্কায় জন্ম গ্রহণকারী রাজবংশের ফিহরি গোত্রের উকবা ইবনে নাফি কে হত্যা করেই ক্ষান্ত হননি। স্বামী হত্যার প্রতিশোধে নতুন ধর্মীয় জোসে বলিয়ান মুসলমানদের পূব দিকে হঠিয়ে দিয়েছিল। আরব সেনাপতি মুছা’র সাথে অমিত বিক্রমে বর্তমান তিউনিসিয়ার আল-জামা’তে যুদ্ধে পরাজিত হলে ছিন্ন মস্তক খলিফার কাছে পাঠানো হলেও। আজও অব্দি barber এর কাছে বীর সেনানী। যদিও বারবেররা সিংহভাগ আজ মুসলমান। আমিও বহু বছরের মনের মধ্যে সুপ্ত থাকা কাহিনার উপস্থিতি অনুভব করছি।
মঙ্গলদের মত শুধু কাহিনার পুত্ররাই না, সমগ্র বারবের মুসলমানরা তাদের স্বকীয়তা নিয়ে আজও কাহিনাকে নিয়ে গর্ববোধ করে।
১৯ নভেম্বর:
সকাল সাতটায় রীতিমতো অন্ধকারে। বঙ্গবন্ধুর সাথে আলজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট বুমেদিনের ওআইসি সম্মেলনে সরাসরি সাক্ষাতের পর এই প্রথম আলজেরিয়ার সাথে বাংলাদেশের দূতাবাসের মাধ্যমে সরাসরি সংযোগ সৃষ্টি হয়েছে। সুদান থেকে দক্ষিণ সুদান পৃথক হওয়ার পর আয়তনের ভিত্তিতে আফ্রিকার বৃহত্তম দেশ আলজেরিয়ার রাজধানী আলজিয়ার্সে গেল এক বছর যাবত বাংলাদেশের দূতাবাস খোলা হয়েছে। তেল ও গ্যাস রিজার্ভে পৃথিবীর দশম দেশ আলজেরিয়া এখনো শিল্প এবং কৃষিতে উন্নত না। তেলের দাম পড়ে যাওয়ায় শিল্প এবং কৃষিতে সম্ভাবনার নতুন দ্বার উন্মোচিত হতে যাচ্ছে। আমরা এসেছি কি কি সম্ভাবনার দুয়ার বাংলাদেশের জন্য খোলা যায়। পৌনে চার কোটি মানুষের দেশে গার্মেন্টস কেন, কৃষিতে এবং তেল শিল্পে জনশক্তি পাঠিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা আয় ছাড়াও সম্পর্ক জোরদার করা যায়। হোটেল থেকে বা হাতে চালিত গাড়িতে সকাল সাড়ে 9 টায় দূতাবাসের উদ্দেশ্যে বের হলাম। আলজিয়ার্সের রাস্তাগুলো এমনভাবে বিন্যস্ত যে, ট্রাফিক পুলিশ বা ট্রাফিক লাইট এর দরকার নেই। তবে প্রায়শই পুলিশের গাড়ি চেক করতে দেখা যায়
কথা হল আমাদের রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ আব্দুল হাই এর সাথে আলোচনার মাধ্যমে নিচের বিষয়ে পরামর্শ পাওয়া গেল:
১। প্রতিবছর শিক্ষা, প্রবাসী কল্যান ইত্যাদি মন্ত্রণালয়ের সাথে একত্রে বসে আলোচনা করা।
২। শিক্ষার্থীদেরকে এখানকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে লেখাপড়ার জন্য পাঠানো হলে দীর্ঘস্থায়ী বন্ধন সৃষ্টি হবে। এই বন্ধন বাংলাদেশীদের এখানে আসা এবং কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
৩। এরা খাদ্য আমদানি করে। কৃষি ক্ষেত্রে বাংলাদেশীদের ত্বকের মৃত সম্ভাবনা থাকে। যার মধ্যে জমি লিজ নিয়ে কৃষিপণ্য উৎপাদনে বাংলাদেশীরা নিয়োজিত হতে পারে।
৪। নবায়নযোগ্য শক্তির ক্ষেত্রে আলজেরিয়াতে অপার সম্ভাবনা আছে। সাহারা মরুভূমিতে ভবিষ্যতে সোলার প্যানেলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ তৈরির ক্ষেত্রে ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারে। তাই এদিকে আমাদের manpower তৈরি করতে হবে। ইডকল ছাড়াও বিভিন্ন এনজিও দেশের প্রত্যান্ত অঞ্চলে সোলার panel সেট করার জন্য দক্ষ লোক তৈরি তাদেরকে বিদেশে রপ্তানির ব্যাপারে সম্ভাব্যতা যাচাই করা যায়।
৫। কৃষি এবং শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের এদের সাথে সম্পর্কের সূচনা করতে পারে।
৬। এদের সাথে এমওইউ করা যেতে পারে।
৭। আলজেরিয়া থেকে বাংলাদেশে টাকা পাঠানোর সময় সাপেক্ষ। চাইনিজ কোম্পানিগুলো এখান থেকে দুবাই দুবাই থেকে টাকা পাঠায়। আমাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এখানে ভিজিট করে বিষয়গুলোর সমাধান বের করতে পারেন।
৮। বোয়েসেল কে সম্পৃক্ত করলে সাধারণ মানুষের প্রতারিত হবার সম্ভাবনা কম।


