যুক্তরাজ্যে বিটিশ-বাংলাদেশীদের পরিচালনায় অন্তত ১০ হাজার রেস্তোরাঁ আছে যেখানে অন্তত এক লক্ষ মানুষ কাজ করে। এইসব রেস্তোরায় প্রতিবছর অন্তত চার থেকে পাঁচ বিলিয়ন পাউন্ডের কেনাবেচা হয়। এসব রেস্তোরায় ব্রিটিশ-বাংলাদেশী দ্বিতীয় জেনারেশন কাজ করতে চায় না। রেস্তোরাঁ ব্যবসার কারণে আমাদের বাংলাদেশী ব্রিটিশরা বেশ ভালোভাবেই আছে। তাদের ছেলেমেয়েরা বড় কিছু হতে যাচ্ছে। তাহলে এসব রেস্তোরাঁর ভবিষ্যৎ কী? একটু তলিয়ে দেখা যাক।
Euro Foods group সেলিম হোসেন এর ছোট ভাই শাজাহান সাহেবের Cardiff-এর টিফিন রেস্তোরায় রাতে খাবারের জন্য আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে হাজির হলাম। শাজাহান ভাই বললেন আমাদের হোটেলের যত বেশি সুন্দরী আসবে তত বেশি লাভ। কিছুটা হকচকিয়ে গেলাম ভাবলাম সুন্দরিদের সাথে অন্য অনেকে আসে কিংবা আশপাশে ঘুরঘুর করে তাই বেশি বিক্রি, বেশি লাভ।
ঘটনাটা এখানে না। তার হোটেলে সমাজের অপেক্ষাকৃত উচ্চ শ্রেণীর লোকেরা আসে। আমি লক্ষ্য করলাম বেশিরভাগ কাস্টমার মোটাসোটা। তার যুক্তি তার পর্থেযবেক্ষণ থেকে। সুন্দরীরা স্লিম ফিগার রাখার জন্য কম খান তাই বেশি লাভ হয়। তার রেস্তোরাঁর নাম tiffin, পরিবেশনা buffet. বেশিরভাগ কর্মচারী জাতে ইংরেজ। এটি একটি ব্যতিক্রম। বাঙালি রেস্তোরায় ইংরেজ কর্মচারী এর আগে চোখে পড়েনি। তারওপর মফস্বল শহর Newport। তা সত্বেও তার ব্যবসা রমরমা। বুফে করেছে কারণ কর্মচারী কম লাগে, কাস্টমার যত খুশি তত খেতে পারে। সালাদ থেকে শুরু করে সার্টাটার, মেইন ডিস, ডেজার্ট পর্যন্ত প্রায় ৪৫টি আইটেম জনপ্রতি মাত্র ১৫ পাউন্ড। তবে যেকোনো ড্রিংক খেলে তার জন্য আলাদা বিল দিতে হবে। খাবারের মান এবং হাইজিন অতি উন্নত। এদের মাথাপিছু আয় আমাদের চেয়ে অন্তত ৩৫ গুণ বেশি। কিন্তু আমাদের ঢাকায় একই খাবার অন্তত তিন গুণ বেশি দাম। মানেও নিয়ন্ত্রন নেই।
এখন ইমিগ্রেশনে কড়াকড়ি। তবে রেস্তোরাঁর কথা বলে বাংলাদেশ থেকে কর্মচারী আনতে কোন বাধা নেই। শর্ত প্রশিক্ষণ থাকতে হবে, আরও শর্ত নিয়মিত নির্দিষ্ট হারে ব্যাংকের মাধ্যমে বেতন দিতে হবে তাও বছরে প্রায় ৩০ হাজার পাউন্ড। যখনই আপনার ৩০ হাজার পাউন্ড বেতন দেয়ার সামর্থ্য হল তখনই আপনাকে ট্যাক্স দিতে হবে। ব্যবসায় লোকসান হয়েছে তা দেখানো সহজ না। ৩০ হাজার পাউন্ড চুক্তি করে টাকা না দিলে বা তার কাছ থেকে অন্য ভাবে ফেরত নিলে সরাসরি শ্রীঘরে যেতে হবে। আরো অবাক হলাম যখন জানলাম ইংরেজরা এখানে খেতে এসে বাঙালি কর্মচারীদের পরিবেশনা পছন্দ করে। হোকনা ভিন্ন এটিকেট, হোকনা ভিন্ন accented ইংরেজি। ভাবলাম জাদুঘরে না হয় শেখার বিষয় আছে হোটেলে উঠে তারা ভিন্ন culture শিখতে চায়, জানতে চায়, উপভোগ করতে চায় ?
আরো অবাক হলাম যখন জানলাম ইংরেজ কর্মচারীরা কম বেতনে চাকরি করে, যে কোন কাজে দ্বিধা নেই। বাঙালি কর্মচারীরা বেশি বেতন চায়, কদিন পর এটা করবে না ওটা করবে না বলে। তারা বেশি চুজি কারণ চাহিদা বেশি। নারীদের কারণ খুঁজতে গিয়ে বার্মিংহামের মেজবা ভাইয়ের কথা মনে পড়ল। সেটা ২০০৯ সালের কথা তখন সিটি কাউন্সিল এর চাকরি করতেন। এমন সময় তার এক কলিগের বিয়ের দাওয়াত পেলেন। তিনি খাসা ইংরেজ। লক্ষ্য করলেন বিয়ের দাওয়াতে যারা গেছে তারা সবাই যার যার মতো খাবারের বিল দিচ্ছে। কনেপক্ষও তাই, মেজবাহ ভাই বিপদে পড়ে গেলেন। যাহোক অনেকগুলো কাপড়-চোপড় পরা তার জন্য blessings হয়েছিল, সবগুলো পকেট হাতিয়ে কোনমতে বিলের টাকা দিয়ে সেবারের মতো মানসম্মান রক্ষা করেছিলেন। এখন নাকি আর এমনটা নেই তারা প্রাচ্যের সংস্কৃতি ধীরে ধীরে গ্রহণ করছেন। আর আমাদের ? যারা এখানে আসে তাদের পরিবারের কেউ না কেউ বাংলাদেশ থাকে। সিলেটে হলে কথাই নেই, সকাল ১১ টায় উঠবে; গাড়ি থাকতে হবে, কমিউনিটি সেন্টারে অনুষ্ঠান করতে হবে, ইন্টারনেট সহকারে iphone থাকতে হবে। এসব টাকা আসবে কোত্থেকে ? যুক্তরাজ্য ! না দিতে পারলে মান-সম্মান যাবে। তাই বেশি চাহিদা বেশি আয়। যেটুকু সময় পায় তাও আমরা যারা দেশ থেকে আসি তাদের খেদমতে চলে যায়। তাদের বাসায় থাকি, তাদের হোটেলে খাই, তাদের গাড়িতে চড়ি, তাদের সাথে বেড়াতে যাই, আবার তাদের টাকায় marketing। এই সুযোগে তাদের কিছুটা recreation হয়, আথিতেয়তা পাই, নিরাপত্তা পাই, আর্থিক শারীরিক মানসিক। তারা ড্রইং রুমে শুয়ে আমাদের জন্য bedrooms ছেড়ে দেয়। জানিনা অন্য কোন জেলার মানুষ এটা করে কি না। এরপরেও ছিলেটি ভাষা নিয়ে অনেকে ঠাট্টা মশকরা করেন। এটাই সিলেট সমাজ। এটাই বাঙালির সমাজ।
(বিশেষ দ্রষ্টব্য: তেসরা থেকে ২০ শে নভেম্বর ২০১৭ পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থেকে লেখা)




