মানিকগঞ্জ জেলার যমুনা নদীর গা ঘেসে শিবালয় উপজেলা তার ছোট্ট একটি গ্রামের নাম দশচিরা। এই গ্রামে একটা প্রাইমারি স্কুল আছে। এখনকার স্যনিটারি অবস্থা ভালো না। সবাই খালের, ডোবার ধারে পাটের চটের ঘেরা দিয়ে বেশিরভাগ মানুষ পায়খানা তৈরি করে। পেটের পীড়া লেগেই থাকে। বর্ষাকালে তো কথাই নেই।
আমার উপজেলার অফিসের পশ্চিম দিকে পাবলিক হেলথের অফিস। অসংখ্যা টয়লেটের রিং বহুদিন যাবত পড়ে আছে। এই পড়ে থাকা পায়খানার রিং এবং উপজেলার জেলার খোলা পায়খানা একত্র করে কিভাবে একটা ভালো কাজ করা যায় চিন্তা করতে থাকলাম। মাথায় একটা বুদ্ধি ঢুকলো শিক্ষকদের সহায়তায় ছাত্রদের বাড়িতে পাঠানো যেত তাহলে প্রতিটা বাড়িতে স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা হত। এসব রোগ কমে যেত। কৃমি কমে যেত। যে কথা সেই কাজ মহিলা প্রধান শিক্ষকএবং তার স্কুলের শিক্ষকদের সাথে কথা বললাম। শিক্ষা অফিসারদের সাথে কথাআলোচনা করলাম যাতে তারা মনে না করে শিক্ষার সাথে পায়খানার আবার সম্পর্ক কি। আমাদের শিক্ষায় হস্তক্ষেপ এবং শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করা হচ্ছে ইত্যাদি, ইত্যাদি। আসলে প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আন্তরিক ছিলেন। প্রধান শিক্ষিকা তার দ্বিগুণ অধিক আগ্রহী। নতুন ভালো কিছু করতে চায়। তাকে বললাম ছাত্রদের কাছে শুনুন যাদের বাড়িতে ঝোলা-খোলা-কাঁচা অস্বাস্থ্যকর পায়খানা তাদের তালিকা করে ফেলুন। আমি তাদের সবার বাড়ি পায়খানা পাঠিয়ে দেবো। তখন বুঝিনি-ভাবিনি যে এগুলো পাঠানো সোজা কাজ না। সবার বাড়িতে তো রাস্তা নেই। রাস্তার পাশে যায় তারপর একটু হেটে যায়; রাস্তার পাশে সাঁকো পার হয়ে যায়। নতুন সমস্যা, নতুন সমাধান দরকার। টাকা দিয়ে চুক্তিতে পাঠাতে হলে অনেক টাকা দরকার, কোথায় পাবো? উপজেলা পরিষদের গম দিয়ে একটা ভ্যান কিনলাম। গম দিয়ে একজনকে মাস্টাররোলে রাখলাম। প্রধান শিক্ষকের disposalএ দিয়ে দিলাম। পাঠানো শুরু হয়ে গেল কিন্তু অনেকে পায়খানা সেট করেনি। ফেলে রেখেছে। টাকা ও দিচ্ছে না। পাবলিক হেলথের চাক পায়খানা, তাদেরকে টাকা দিলে, নতুন পায়খানার চাক হবে না। নতুন করে ভাবতে হল, পরামর্শ করতে হলো। কি করা যায়? মাথায় আর একটা বুদ্ধির ঢুকলো। ওসি সাহেব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এমএ পাস। তিনি খুবই ভদ্র এবং শিক্ষিত। তাকে বললে নিশ্চয়ই বিষয়টা বুঝবে। তার সাথে পরামর্শ করলাম। বললাম আপনার একজন সাব ইন্সপেক্টর দিন যে আমাকে এই ভালো কাজের সাহায্য করবে। টাকা আদায়ের কাজটা করবে। বিতরনের সময় খবর রাখবে। আমি জানি একেবারে grammar মানলে পুলিশ দিয়ে কাজ করানো যাবেনা’। কিন্তু কাবিননামাই সব কিছু লেখা থাকে। আইন দিয়ে সবকিছু হয় না। আইনের বাইরে জনহিতকর, মানবতা, অধিকার, ন্যায়নীতি আরো অনেক কিছু আছে। ওসি সাহেব অনেক খুশি হয়েই রাজি হলেন। একজন সাব-ইন্সপেক্টরকে এ বিষয়ে দায়িত্ব দিলেন। তিনিও বেশ আগ্রহ সহকারে কাজ করলেন। টাকা সহজে আদায় হয়ে গেল। অন্যান্য গ্রামেও দেওয়া শুরু করলাম। স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানার চাক ফুরিয়ে গেল। প্রধান প্রকৌশলী পাবলিক হেলথে তদবির করা শুরু করলাম। সহজেই তো সব কিছু পাওয়া যায় না। পেয়ে গেলাম আর একজন অসাধারণ কর্মী। ডাক্তার মুসা উপজেলা হেলথ এবং পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা। চৌকস কর্মকর্তা কাজ করার ইচ্ছা প্রবল, ছোট বড় চিন্তা নেই। তিনি হাল ধরলেন, আরো দ্বিগুন উৎসাহে কাজ শুরু করলেন। দেশের এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং মিডিয়ার চোখে পড়ল। এ বিষয়ে বিশেষ program হল টেলিভিশনে। বাংলাদেশের প্রথম স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা গ্রামের নাম দশচিরা। আমি ইতিমধ্যেই চলে এসেছি। মোসা সাহেব মনের মাধুরী দিয়ে, আন্তরিকতা দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে, সাংগঠনিক দক্ষতা দিয়ে এই কাজটি করেছেন। প্রধান শিক্ষক একজন মহিলা নিজের কাজের বাইরে এসে স্বাস্থ্যের কাজ করেছেন। কাজটিকে তাঁর শিক্ষার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ না? তিনি তো নাও করতে পারতেন, চেয়ারম্যানের কাছে ধরনা ধরতে পারতেন। বলতে পারতেন কোথাকার এক পাগলা উপজেলা নির্বাহী অফিসার আমাকে দিয়ে যা আমার করার কথা না আমাকে দিয়ে তা করাতে চায়।
প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে যোগদান করে দেখি আর কেউ নন আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডাক্তার সুরাইয়া ডাক্তার মুসার স্ত্রী।


