নোট-গাইড বই বন্ধ সম্পর্কে টেলিভিশনে প্রায়ই টক-শো হয় । প্রায় সকল ক্ষেত্রেই সরকারের উপর দোষারোপ করে টক-শো শেষ হয়। নোট-গাইড বই আসলে কি ? নোট-গাইড বন্ধ করা সম্পর্কে কোন আইন আছে কিনা ? আইন থাকলে বন্ধ করা সম্ভব হতো কিনা ? বাস্তবে সরকারের পক্ষে নোট-গাইড বই বন্ধ করা সম্ভব কিনা ? নোট-গাইড বই শিক্ষার্থীদের জন্য ক্ষতিকর কিনা ? অভিভাবকরা কেন নোট-গাইড বই পড়ান কিংবা পড়াতে বাধ্য হন ?
নোট-গাইড বই পাঠ্যবইয়ের সংক্ষিপ্ত রুপ। মূল বই না পড়ে কিংবা অল্প পড়ে স্বল্প পরিশ্রমে নোট বই পড়ে সহজে পাস করা যায়। পাঠ্য পুস্তকের চেয়ে নোট বই বেশি সহজলভ্য। যেকোন বইয়ের দোকানে পাওয়া যায়, দাম নাগালের মধ্যেই থাকে। অভিভাবকরা তার সন্তানদের অধিক সাফল্য চান। সেটা নোট বই পড়েই হোক আর না পড়ে হোক। কারণ এগুলো তো আর সার্টিফিকেটে লেখা থাকে না
নোট বই লেখেন শিক্ষকরা। নোট বই লিখে তারা টাকা আয় করতে পারেন। নোট বই কেনার জন্য শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করার অভিযোগ আছে। কারণ হিসেবে কমিশন পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। দোকানগুলো নোট বই বিক্রি করে তাদের রুটি-রুজি কামাই করে।
এখানে দেখা যাচ্ছে নোট বই বিক্রি হওয়ার কারণে শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবক, পুস্তক বিক্রেতা, ছাপাখানার মালিক-শ্রমিক প্রত্যেকটি মানুষ যারা এর সাথে জড়িত তারা লাভবান হচ্ছে। সকলেই যদি লাভবান হয় তবে নোট বই কেন বিক্রি হবে না?, কেন ব্যবহার হবে না? এরা আবার শিক্ষার সাথে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত। তাহলে নোট বই বিক্রি হওয়ায় স্বাভাবিক। শিক্ষকরা নীরবে নোট বই প্রমোট করছেন কিংবা এর বিস্তারে বাধা দিচ্ছেন না। তা সত্বেও আমাদের মানুষেরা প্রতিনিয়ত এর বিরুদ্ধে বলে যাচ্ছে।
অভিভাবকরা তার সন্তানদের নোট-গাইড বই কিনে দেন। যিনি নোট-গাইডের বিরুদ্ধে বক্তৃতা দিচ্ছেন তিনিও তাঁর সন্তানদের জন্য নোট-গাইড বই কেনেন। অর্থাৎ নোট-গাইড বইয়ের ব্যাপক চাহিদা আছে।
নোট-গাইড বই বন্ধ করতে হলে প্রথমে চাহিদা কিভাবে বন্ধ করা যায় সেভাবে ভাবতে হবে। চাহিদা থাকলে তা বিক্রি হবে, ব্যবহার হবে। কৃত্রিমভাবে বন্ধ করতে গেলে চোরাগোপ্তা ছাপা এবং বিক্রি হবে। হচ্ছেও তাই, ২য় থেকে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত নোট-গাইড বই পাঞ্জেরী, লেকচার, অনুপম, নবদূত, জননী, পপি ও জুপিটার নামের প্রকাশকের বই বাজারে পাওয়া যাচ্ছে।
১৯৮০ সালের নোট বই (নিষিদ্ধকরণ) আইনে প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ্যপুস্তকের নোট বা গাইড বই মুদ্রণ ও বিক্রয় নিষিদ্ধ। এই আইন লঙ্ঘনের দায়ে সর্বোচ্চ সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড অথবা ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান আছে। এছাড়া ২০০৮ সালে নির্বাহী আদেশে নোটবই ও গাইডবই নিষিদ্ধ করা হয়।। ২০০৮ সালেেই হাইকোর্ট বিভাগ নোট বইয়ের পাশাপাশি গাইড বইও নিষিদ্ধের আদেশ দেয়। এই আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করা হলে ২০০৯ সালের ডিসেম্বর মাসে এক রায়ে আপিল বিভাগ খারিজ করা হয়।
দেখা যাচ্ছে আইন থাকা সত্ত্বেও প্রয়োগ করা যাচ্ছে না। ২৭ ডিসেম্বর, বুধবার ২০১৭ দুদকের উদ্ধৃতি দিয়ে বাংলানিউজ জানায়, দেশে বিদ্যমান নোটবই (নিষিদ্ধকরণ আইন) ১৯৮০ (১৯৮০ সালের ১২ নম্বর আইন) থাকা সত্ত্বেও দায়িত্বপ্রাপ্ত বিভিন্ন সরকারি সংস্থার কিছু কর্মকর্তা নিয়মিত মাসোয়ারা (অনৈতিক আর্থিক লেন-দেন) নেন।
পাঞ্জেরী, লেকচার, অনুপম, রয়েল, আদিল, কম্পিউটার, জুপিটার ৯ম ও ১০ম শ্রেণি পর্যন্ত গাইড বইয়ের প্রকাশক। এছাড়া একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির জন্য গাইড বইয়ের প্রকাশনী হিসেবে বাজারে লেকচার, পাঞ্জেরী, জ্ঞানগৃহ, জুপিটার, পপি, মিজান লাইব্রেরি, কাজল ব্রাদার্স, দি রয়েল সায়েন্টিফিক পাবলিকেশন্সের বই পাওয়া যাচ্ছে। এসব বই টেস্ট পেপার, সহায়ক বই, মেড ইজি বিভিন্ন নামে বাজারে বিক্রি হচ্ছে।
দুদক বলছে, শ্রেণিভিত্তিক গাইড বইয়ের পাশাপাশি ডিগ্রি, অনার্স ও মাস্টার্স শ্রেণির বিভিন্ন গাইড বই এবং প্রফেসর’স, ওরাকল, এমপিও, থ্রি ডক্টরস ও সাইফুর’স নামে চাকরিতে নিয়োগ সংক্রান্ত বিভিন্ন গাইড বাজারে রয়েছে। যদিও দেশে ১৯৮০ সালের নোট বই নিষিদ্ধকরণ আইন বিদ্যমান। আর এই আইন অনুসারে গাইড ও নোটবই ছাপা এবং বাজারজাত করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
আমরা স্ববিরোধিতায় ভুগি তাই যারা এ বিষয়ে বিচার করবেন তাদের সন্তানরাও বাস্তবে নোট-গাইড বই ব্যবহার করে। তবে এটি বন্ধে দেওয়ানী মামলা করা সম্ভব। হয়তো টর্ট মামলাও করা সম্ভব। আমাদের দেশে জেল-জরিমানাই ভয় পায় না সেখানে কে দায়িত্ব নিয়ে এইসব মামলা করে নিজেকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলবেন ?
শ্রেণিকক্ষে শেখা-শেখানোয় ঘাটতি না থাকলে কেন নোট-গাইড বই কিনবেন ? ক্লাসেই যদি সব পড়াশোনা হয়ে যায় সবকিছু বুঝতে পারে তবে বাড়িতে গিয়ে নোট-গাইড বই পড়ার জন্য কে পরিশ্রম করবেন ?
তাহলে আমাদেরকে শ্রেণিকক্ষের পাঠদান পদ্ধতি, শিখন পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে হবে। প্রতিটি শিক্ষার্থীর প্রতি নজর দিতে হবে। প্রতিদিন প্রতিটি শিক্ষার্থীকে মূল্যায়ন করতে হবে। মূল্যায়নে প্রতিদিন যে দুর্বলতা ধরা পড়বে পরদিনই সে ঘাটতি পূরণের ব্যবস্থা করতে হবে। সেক্ষেত্রে প্রতিটি শ্রেণীর শিক্ষক, বিষয় শিক্ষককে পরিশ্রম করতে হবে। প্রতিটি শ্রেণীর শিক্ষক প্রতিদিনের ক্লাস শেষে প্রত্যেক শিক্ষার্থী সম্পর্কে প্রধান শিক্ষকের কাছে প্রতিদিন মূল্যায়নের পর রিপোর্ট করবেন। প্রধান শিক্ষক সেই মূল্যায়ন বিবেচনা করে শ্রেণীর শিক্ষককে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিবেন। তবেই নোট বই পড়ার কোনো সুযোগ পাবে না। আমাদের শ্রেণী শিক্ষক, আমাদের বিষয় শিক্ষক, আমাদের প্রধান শিক্ষক এই সময়, এই মেধা ও মনন দেওয়ার জন্য প্রস্তুত আছে কি ? এই প্রস্তুতি নোট-গাইড বই বন্ধ করার প্রথম পদক্ষেপ। যদি প্রস্তুত থাকে তবে নোট-গাইড বই বন্ধ করা সম্ভব। যদি প্রস্তুত না থাকে তবে কালোবাজারিতে হলেও নোট-গাইড বই চলবে।
দ্বিতীয় এবং অতি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হচ্ছে প্রশ্ন সেট করা। অনেকে মুখে মুখে বলে থাকেন নোট-গাইড বই থেকে পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্ন সেট করা হয়। কারা প্রশ্ন সেট করেন এর উত্তরে নিশ্চয় বলবেন শিক্ষকরা। প্রশ্নের উত্তর যদি নোট বইয়ে পাওয়া যায় তবে তো নোট বই পড়া স্বাভাবিক। প্রশ্নের উত্তর নোট বইএ খুঁজে না পাওয়া গেলে কেন নোট বই পড়বে ? তাহলে নোট বই বন্ধ করতে হলে এমন
বই লিখতে হবে যার ভেতর এসব প্রশ্নের উত্তর থাকবে না। বাস্তবে তা করা সম্ভব না। বিকল্প কি হতে পারে ? যদি পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে এমন প্রশ্ন করা হয় যা নোট গাইড বইয়ের পাওয়া যাবে না। তবে নোট বই গাইড বইয়ের উপযোগিতা থাকবে না। উপযোগিতা না থাকলে শিক্ষার্থীরা তা কিনবে না। তার পিছনে মেহনত করবেনা। তাহলে পরীক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষকদেরকে এমন প্রশ্ন করতে হবে যা নোট-গাইড বইয়ের পাওয়া যাবে না। শিক্ষকরা কেন এই প্রশ্ন করবেন ? তাদের লাভ কি ? বরং এতে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাদেরকে বেশি খাটুনি করতে হবে। আর্থিক কোনো লাভ নেই।
অর্থাৎ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে শিক্ষকরা এ কাজ করবেন না। সেক্ষেত্রে বাধ্য করতে হবে। দু’ভাবে বাধ্য করানো যেতে পারে। প্রথমত প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে বাধ্য করা যায়। যদি কেউ নোট-গাইড বই ব্যবহার করে বা করায় সহায়তা করে তবে সেই শিক্ষক, শিক্ষা ব্যবস্থাপনার সাথে সম্পর্কিত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের কিংবা প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়া যায়। কেন্দ্র এককভাবে এই ব্যবস্থার মাধ্যমে নোট-গাইড বই বন্ধ করা যাবে বলে আমার মনে হয় না
দ্বিতীয়ত আর একটি ব্যবস্থা নেওয়া যায় যা আমার কাছে বেশি উপযোগী বলে মনে হয়। এই ব্যবস্থাটি নিলে ব্যবস্থা অধিকতর কার্যকারী হবে। দ্বিতীয় ব্যবস্থাটি হচ্ছে শিক্ষক নেতাদের কাছে দায়িত্ব দেওয়া। যদিও শিক্ষকরা নানা গ্রুপে বিভক্ত এবং প্রত্যেক গ্রুপের পৃথক পৃথক নেতা আছে। প্রতিটি গ্রুপকে নোট-গাইড বই বন্ধ করার দায়িত্ব দিতে হবে। আমরা লক্ষ্য করেছি শিক্ষক নেতৃবৃন্দ বেতন-ভাতা সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির ছাড়া অন্য বিষয়ে দাবি করেন না। তাদেরকে বিষয়টি স্মরণ করিয়ে শিক্ষার উন্নয়নে নোট-গাইড বই বন্ধ করার দায়িত্ব নেয়ার জন্য বলা যায়। আমার কাছে মনে হয় শিক্ষক নেতারাই সবচেয়ে বেশি কার্যকরী হবেন। আগেই বলেছি উভয় ব্যবস্থা একত্রে নেয়া হলে নোট-গাইড বই বন্ধ করা সহজ হবে।
এখনকার lifestyle এর যুগে এরপরও অনেকের নোট-গাইড বই বিক্রি এবং ব্যবহারের চেষ্টা করবেন এটাই স্বাভাবিক। অনেক বিভাগের মত শিক্ষকদের উপরি আয়ের সুযোগ কম। শিক্ষক হিসেবে বেতন আর খাতা দেখার আয়ের উপর অতিরিক্ত আয়ের ব্যবস্থা করা গেলে শিক্ষকরা আরো বেশি নিরাপদ বোধ করতেন। সহজে নোট-গাইড লেখা ও ব্যবহারের দিকে ঝুঁকতেন না। বিকল্প হিসেবে শিক্ষা কনটেন্ট তৈরি, youtube content তৈরি, লেখালেখি ইত্যাদি করে আয় করা সম্ভব।
শিক্ষকদের এইদিকে প্রশিক্ষণ দেয়া হলে তারা বাড়তি আয় করতে পারতেন। একই সাথে তাদের শিখা শেখানোর যোগ্যতা আরো বাড়তো। ফলশ্রুতিতে সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা আরও অগ্রগতি হতো। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে specially designed প্রকল্প হাতে নিতে পারে।
বাজারে নোট-গাইড বইয়ের ব্যাপক চাহিদা স্বীকার করেই নোট-গাইড বই প্রকাশকদের সম্পর্কে ইতিবাচক মনোভাব নিতে হবে। তাদেরকে দূরে রেখে, সংশোধনের চেষ্টা না করে শুধু আইন দিয়ে, শাস্তি দিয়ে নোট-গাইড বইয়ের ব্যবহার বন্ধ করা যাবে না। মনে রাখতে হবে, ইউরোপ আমেরিকার মতো দেশেও নোট-গাইড বই আছে তবে তা ভিন্ন শ্রেণীর, ভিন্ন মানের। সেখানকার শাসন ব্যবস্থা আমাদের শাসন ব্যবস্থা, জনসাধারণের শিক্ষার মান এবং দৃষ্টিভঙ্গি এক না। অনেক সময় আর্থসামাজিক ব্যবস্থা সমাজের এই ধরনের বিকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করে।
সেই বিবেচনায়, এ সম্পর্কে একটি গবেষণামূলক সমীক্ষা চালানো উচিত। nctb এই সমীক্ষা চালাতে পারে অথবা ir কে outsource করতে পারে।
নোট-গাইড বই গুলো কিভাবে আরো উন্নত করা যায় সে বিষয়ে nctb নোট-গাইড বই প্রকাশকদের পরামর্শ দিতে পারে। নোট-গাইড বই গুলো আরও উন্নত হলে এর বিরুদ্ধে অভিযোগ কমে যাবে। ফলশ্রুতিতে নোট-গাইড বই গুলো স্বপ্নের সহায়ক হতে পারে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে রেগুলেটরি পদক্ষেপ নিতে পারে।
অভিভাবকদের সচেতন করার জন্য প্রোগ্রাম হাতে নেওয়া যায়। এজন্য রেডিও-টেলিভিশনে ক্যাম্পেইন, ওয়ার্কশপ সেমিনার, অভিভাবক দিবস ইত্যাদির মাধ্যমে নোট-গাইড ব্যবহারের কুফল তুলে ধরা যায়। অভিভাবকদের কাছে নোট-গাইডের ভুলভ্রান্তি তুলে ধরা যায়। এসবের ফলে অভিভাবকরা তার সন্তানদের নোট-গাইড কেনা থেকে বিরত থাকতে পারে







