সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের ২০১৭ সালের ফলাফল ২০১৬ সালের তুলনায় ৫.৭৯ % কম; জিপিএ-৫, ১৫৭০৮ জন কম। ৭২টি কলেজ থেকে কেউ পাশ করেনি। শতকরা ৩৩ পেলে পাশ, পৃথিবীর কোন দেশে ৩৩ নম্বরে পাশ? প্রতি বছর প্রায় ৪০ লক্ষ শিশু জন্মে তার মধ্যে এ বছর প্রায় ৮ লক্ষ এইচএসসি পাশ করেছে। এইচ এসসি পাশ করে কী কাজ করতে পারে ? আর যদি মোট শিশুর ৮০% যদি এইচ এসসি’র দোর পার হতে না পারে ? তারপরও ৩ লক্ষ ৬১ হাজার পরীক্ষার্থী ফেল করেছে। এই সংখ্যা মালদ্বীপের মোট জনসংখ্যার চেয়েও বেশি; ভুটানের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি। বাংলাদেশের অনেক সংসদীয় এলাকার মোট জনসংখ্যার চেয়ে বেশি শিক্ষার্থী ফেল করেছে। এটা কী বড় ক্ষতি না ?
আত্মীয় স্বজনকে হিসাব থেকে বাদ দিলেও ফেল করা পরিবারে গড়ে যদি ৫ জন করে সদস্য থাকে তবে ১৮ লক্ষ মানুষ কষ্ট পাচ্ছে। মা-বাবার স্বপ্ন, শিশুর ভবিষ্যৎ চুরমার হয়ে যাচ্ছে।
কেন এমন হচ্ছে ?
একটা অজুহাত হতে পারে সবাই পাশ করে না। পড়েনি তাই পাশ করে নি!
কে তার জন্য দায়ী ?
যারা দায়িত্বে আছেন তারা কী দায়ী না?
কিছু কি করার নেই ?
চেষ্টা করলে প্রত্যেকেই কি পাশ করানো যেতো না ? উত্তর অবশ্যই হ্যাঁ। পাশ করানো দায়িত্ব ! ভালো করাই স্বাভাবিক ! অকৃতকার্য হওয়া, দায়িত্ব সঠিকভাবে পালনা না করার জন্য হয়েছে। এ কথা সত্য এক’দু বছরে হয়নি, বহু বছরের অবহেলা অবক্ষয়, সংস্কারের অভাবের জন্য হয়েছে এবং তা পূরণ করা সম্ভব।
কুমিল্লা বোর্ডের ৪৯.৫২% প্রায় অর্ধেক অকৃতকার্য। গত দুই বছর যাবত ফলাফল খারাপ হচ্ছে। ফলাফল খারাপ হওয়া না হওয়া বা পরীক্ষা একটি ইনডিকেটর, এখান থেকে বোঝা যায় লেখাপড়া কোন দিকে যাচ্ছে। কম পাশ করছে তার অর্থ শিক্ষার মান ভালো এবং সঠিকভাবেই মূল্যায়ন হচ্ছে এই ধারণা কিংবা আত্মতুষ্টি নিতান্ত আহম্মকি মনে হয়। তাই যখন বলা হয় মূল্যায়নের পদ্ধতি পরিবর্তনের কারণে ফলাফল খারাপ তখন মন মানতে সায় দেয় না। মোদ্দকথা পরীক্ষা পদ্ধতির পরিবর্তন এনে শিক্ষায় বড় পরিবর্তন আসবে না। হয়তো কী হচ্ছে তা আরো পরিস্কার বোঝা যাবে। উত্তরণের সঠিক পথ দেখাতে সাহায্য করবে। কিন্তু ইপ্সিত পরিবর্তন আনতে হলে শেখা ও শেখানোয় পরিবর্তন আনতে হবে। তা করতে হলে বেশ কিছু কাজ করতে হবে।
ফসল কটায় মুন্সিয়ানা দেখিয়ে ফসল উৎপাদন কত আর বাড়ানো যায় ? ফসল ফলানোয় মনোযোগ দেয়া দরকার। তার কিছু উল্লেখ করছি:-
১.কলেজ পর্যায়ে কনটাক্ট আওয়ার:
খুব কম; কনটাক্ট আওয়ার বাড়াতে হবে। বাস্তবে কনটাক্ট আওয়ার কত তা কেউই বলতে পারে না। এব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইআরএ বা অন্য কোন সংস্থার কোন গবেষণা আছে এমন তথ্য আমার জানা নেই। শিক্ষাবিদদের বলতে শুনিনি, লেখা দেখিনি। একজন সাংবাদিকের সাথে আলোচনা করে বুঝেছি ২৪ মাসের সময়ের মধ্যে ১৯ মাসের বেশি পড়াশোনার জন্য পাওয়া যায় না। এই ১৯ মাস সময়ের মধ্যে ছুটি আছে; প্রতিদিন কত ঘন্টা কনটাক্ট আওয়ার তা আমার কাছে খুব কম বলে মনে হয়। অন লাইনে ভর্তি পদ্ধতি চালু করে পরীক্ষার ফলাফল ও ক্লাস শুরু করার মধ্যের সময় অনেক কমিয়ে আনা গেছে। তারপরও আরো কমানোর সুযোগ আছে। আমি মনে করি বর্তমান ভর্তির সফটওয়ার পরীক্ষার ফলাফল দেয়ার সফটওয়ারের সাথে একীভূত করা দরকার। এইচএসসি পরীক্ষার পর কে কোন কলেজে ভর্তি হতে চায় সেই অপশন নেয়া যায়। ইতোমধ্যে পরীক্ষার ফলাফল প্রক্রিয়া হতে পারে।পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের সাথে (অকৃতকার্যদের বাদ) দিয়ে কলেজ প্লেসমেন্ট দেয়া যায়। পরবর্তী কয়েক দিন শুধু কলেজ পরিবর্তনের জন্য ব্যয় হবে। এতে অনেক সময় বাচবে। সেই সময় শেখা শেখানোর জন্য ব্যয় করা যায় ।
২.একইভাবে এইস এসসি পরীক্ষা ডিসেম্বর মাসে নিতে হবে। দীর্ঘ সময় ব্যাপী পরীক্ষা নেয়ার কালচার পরিবর্তন করতে হবে। আগামী পাঁচ বছরের সময় প্রকাশ করা হলে পরীক্ষার্থীদের প্রস্তুতি থাকবে বিধায় আন্দোলন হবে না। তারপরও দূর্যোগ, রাজনৈতিক ডামাডোল থাকবেই।
৩.পরিদর্শনে দেখেছি এবং সবাই অকপটে স্বীকার করে ১২টার পর শিক্ষার্থীদের কলেজে পাওয়া না যাওয়া সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। এই সংস্কৃতির কারণগুলো বের করতে হবে। একমাত্র কারণ জানা গেলেই তবে তা শুধরানো সম্ভব। জনপ্রিয়তা বজায় রাখার জন্য কেউই কাউকে বেজার করতে চায় না। কিন্তু অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে এই বিশ্বাস কাজে লাগে না। এতে সমালোচিত হতে হয়, জনপ্রিয়তা হারাতে হ্য় কিন্তু উত্তরসূরিরা একই পথে চলছে। সামান্য কিছু উদ্ভাবনী কাজের মাধ্যমে আমরা কারণগুলো বের করতে পারি। কারণ বের করা গেলে সমাধান দেয়া যায়।
সারা বছরের কোন দিনে, কোন সময়ে, কোন শিক্ষক, কোন ক্লাস নিবেন; কেউ কোন ক্লাস না নিতে পারলে কে বদলী শিক্ষক হবেন তার পরিকল্পনা থাকতে হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী একটি সফটওয়ার ব্যবহার করে কার কী পারফরমেন্স তা সহজে দেখা যাবে। সেখান থেকে ব্যবস্থা নেয়া যাবে। ওপেন হওয়ার কারণে সবাই সতর্ক হবে।
৪.বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞান বিষয়ক ক্লাসে উপস্থিতি কম:
এবিষয়ে সবাই একবাক্যে স্বীকার করেছেন। এখানেও কোন গবেষণা নেই। তবে আমার ধারণা শিক্ষকরা যেভাবে বিজ্ঞানের বিষয়গুলো পড়ান তার চেয়ে ইউটিউব বা অন্যান্য মিডিয়াতে আরো আকর্ষনীয় ও অল্প সময়ে সহজবোধ্য। তাহলে কেন তারা অনাকার্ষনীয় ক্লাসে, অতিরিক্ত সময় নষ্ট করবেন ? প্রতিটি বিজ্ঞান শিক্ষককে এই সব কনটেন্ট ও মাল্টিমিডিয়া ব্যবহার করতে বাধ্য করতে হবে। প্রশিক্ষণ দিতে উৎসাহিত করতে হবে। কে দেখভাল করবে ? কথায় খৈ ফুটালে হবে না। শেষ মেষ ধরা পড়তে হবে!
৪.বড় বড় কলেজে এইচএসসি অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্ব পেয়ে থাকে। অনার্স ক্লাসে ক্লাস নেয়া সম্মানের। বড় বড় কলেজগুলো অনার্স নিয়ে ব্যস্ত থাকায় এদিকে নজর কম। সিলেবাস শেষ করে না। সাজ্শনভিত্তিক লেখাপড়া। লেখাপড়া আজকাল শুধু জ্ঞানার্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না। জীবনের জন্য প্রস্তুতি। ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশ হতে হলে পরীক্ষার খাতাদেখায় পরিবর্তন আনা যথেষ্ট না।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলছেন: “পাশের হার নয়, মানুষ হতে হবে।”







