শিবালয় উপজেলার যমুনা নদীর পাড়ে। বর্ষায় প্রবল স্রোত প্রতি বছর বাধ, ব্রিজ ভেঙে দেয়। শিবালয় উপজেলা পরিষদের একটা জীপ ছিল। জেলা পরিষদের একটি মোটরসাইকেলও ছিল। সকল এলাকায় সহজে যাওয়ার জন্য আমি মোটর সাইকেল প্রাধান্য দিতাম একদিন আব্দুল আলিম মোটরসাইকেলে আমাকে নালি স্কুলে নিয়ে গেল। বর্ষা শেষ শরৎ কাল শুরু। নদীর সৌন্দর্য দেখার জন্য পদ্মা নদীর পাড়ে নিয়ে যেতে বললাম। নদীর এপার থেকে ওপার পরিস্কার দেখা যায়। যে কোন জায়গার চেয়ে নদী এখানে সবচেয়ে সরু। নদীর ধারে একটি রোগাটে বটগাছ। পাশ দিয়ে নদী বেশ গভীর হয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। মাটি শক্ত আঠালো, নদীর পানি বাড়লে স্রোত উপরে এসে গাছের গোড়ার শক্ত মাটি ক্ষয়ে দিয়েছে। অন্য আর দশটা নদীর পাড়ের মত অযত্নে পড়ে আছে। জিজ্ঞাসা করলে বলল এলাকার নাম পাটুরিয়া। বর্ষার ঘোলা থেকে শরতের পরিষ্কার হতে যাওয়া নদীর পানি। তাকালেই মনে হল নদীর ওপার বেশি দূরে নয়। পার হতে বড়জোর 20-25 মিনিট।
তখন ঘাট আরিচায়, ফেরি-আরিচা থেকে দৌলতদিয়া যায়। দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা সময় লাগে। তাই একটি ফেরি দিনে বেশিবার যাতায়াত করতে পারে না।
এছাড়া এখান থেকে ফেরি পাবনার কাজীপুর ঘাটে যায়। এই ঘাটে যানজট লেগেই থাকে। ঈদের সময় পারাপারের জন্য একাধিক দিন অপেক্ষা করতে হয়। পর পর তিন রাত জেগে ঈদে মানুষের বাড়ি যাত্রা নিশ্চিত করতে হয়েছে। তাই দেখা মাত্র আমার মনের ভেতর একটা আশা জাগলো। যদি এখানে ফেরিঘাট করা যেত তবে ২০-২৫ মিনিটে মানুষকে ওপারে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হতো। অল্প সময়ে পার হওয়ার জন্য এখনকার তুলনায় অনেক বেশিবার যাওয়ার আসা করতে পারত। কোন যানজট থাকত না। ফেরির তেল কম খরচ হত তাই লাভজনক হত। আমি সবে সিনিয়র সহকারী সচিব তাই নেটওয়ার্কে সীমাবদ্ধতা আছে। কিন্তু আরিচা ঘাটে থাকা একটি বাড়তি সুযোগ পেয়ে গেলাম। এখানে উচ্চপদস্থরা যাতায়াত করে। আমি যখন বিসিএস প্রশাসন একাডেমিতে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করি। তখন এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী কামরুল ইসলাম সিদ্দিকী আমাকে প্রায়ই ক্লাস দেওয়ার জন্য অনুরোধ করতেন। সুযোগের সন্ধানে রইলাম এবং পেয়েও গেলাম। তিনি খুব ভালো নেটওয়ার্কিংকরতে পারেন। মন্ত্রীদের সাথে খুব ভালো যোগাযোগ। তার বাড়ি কুষ্টিয়া জেলায়। তাকে একদিন ঘাটে পেলাম। আমাকে প্রায়ই ভিআইপিদের protocol করতে হতো। সেদিন ওনার protocol ডিউটিতে আসলাম। কথায় কথায় বললাম স্যার আপনার আর আমার উভয়ের বাড়ি নদীর ওই পার। কিন্তু ওপার যাতায়াত করা কঠিন। যদি ঈদের সময় হয় তাহলে তো আর কথাই নেই। ফেরিঘাটে কোন টয়লেট নেই পানি খাওয়ার কোন ব্যবস্থা নেই। যদি বর্ষার সময় হয় তাহলে অনেক সময় ঘাট বন্ধ থাকে। তখন মানুষকে অনেক দুরাবস্থায় পড়তে হয়। এখন ফেরিতে নদী পার হতে আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা সময় লাগে। আরিচাঘাট বেশ অনেক দূরে দূরে বাজারের ভিতরে। আমি একটা জায়গা দেখেছি সেখান থেকে নদী পার হতে ২০ থেকে ২৫ মিনিট সময় লাগবে। এপার থেকে ওপারে সহজেই দেখা যায়। নদীর পাড় খুবই শক্ত সহজে ভাঙবে না। সাথে পূর্ব পরিচয়ের কারণে সহজ হতে পারলাম। এছাড়াও আর একটা ঘটনা ঘটার কারণে উনি আমাকে ভালোভাবেই চিনতেন। কিছুদিন পরে আরেকটি ঘটনা ঘটল।উনার মা মারা গেলে ৬ জন মন্ত্রী নিয়ে ওনার বাড়িতে গেলেন। আমিও সুযোগ পেয়ে গেলাম তাদের সবাইকে আদর করে বিআইডব্লিউটিএর survey ফেরিতে করে পার করিয়ে দিলাম। তাদের ফেরার সময় আমি দৌলতদিয়া ঘাটে ওত পেতে বসে থাকলাম। একই ফেরিতে পার করিয়ে দেেয়াার আগে এবং পাটুরিয়া ঘাট পার হতে যে ২০-২৫ মিনিট সময় লাগে তা বাস্তবে দেেখিয়়ে দিলাম। তারপর বললাম যদি এখান থেকে ফেরি পারাপার করা যায় তবে বিআইডব্লিউটিসি’র অনেক তেল সাশ্রয় হবে। একটি ফেরি দিয়ে বেশি পারাপার করা যাবে। সময় বাঁচবে। ঈদে এবং বরষায় পারাপার আরো সহজ হবে। আমাদের সবার যে পেরেশানি হয় অনেক কমে যাবে। উনারা দেখে খুবই সন্তুষ্ট হলেন। ফেরিতে ভালো খাওয়া দাওয়া এয়ারকন্ডিশন ছিল। একটা মৃত বাড়ি থেকে আসছে মনটা অনেক নরম ছিল। ওই ফেরিতে অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন মন্ত্রী এম কে আনোয়ার ছিলেন। তিনি জাতে bureaucrat বিষয়টা বুঝলেন।
সে সময় মানিকগঞ্জের ডিসি ছিলেন নজরুল ইসলাম। তিনি বেশ dynamic অফিসার। তাকে বলার সাথে সাথে তিনি বিষয়টি লুফে নিলেন। তিনি ওই ফেরিতে ছিলেন। আমি মহা খুশি। এসে জেলা প্রশাসকের কাছে একটি চিঠি লিখে ফেললাম। একটি চিঠি আলাদা করে অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহণ মন্ত্রণালয়ে দিলাম। সবাইকে ফোনে বিষয়টি জানালাম। কাজ হতে থাকলো। যখনই নামী দামী লোক ঘাটে আসে। ফেরিঘাট এর সাথে জড়িত ঊর্ধ্বতন তাকেই তাগিদ দিতে থাকি। এরপর আমার বিদায়ের পালা। এখান থেকে আমি রাজশাহী অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক রাজস্ব হয়ে বিদায় নিলাম। ঘাট স্থানান্তরের কাজ থেমে থাকেনি। আরিচা ঘাটের সবাই আন্দোলন শুরু করলো। এখান দিয়ে ভারতীয় গরু আসে। আরো অনেক জিনিস পারাপার হয়। এখানে একটি বাজারে আছে। এখানকার মানুষ তাদের নিজস্ব প্রভাব বলয় তৈরি করেছে। থানা এই ঘাটে অবস্থিত। তাদের এসবের সাথে সম্পর্ক আছে। এখানে থাকতে স্বচ্ছন্দবোধ করেন। তাই তারাও ভিতরে ভিতরে ঘাটের লোকদের সাথে। সে সময় মোহাম্মদ আলী নামের বিআইডব্লিউটিসি একজন ডেপুটি ডিরেক্টর ছিলেন যিনি ঘাটে বসতেন। তিনি অত্যন্ত ভালো অফিসার। আমাদের সাথে সুসম্পর্ক ছিল। ঘাটের লোকজন তার ওপর চড়াও হল। ঘেরাও করে মারপিট করার চেষ্টা করলো। তারা আমার ওপর ক্ষিপ্ত হল। তবে মনে মনে। আমার প্রতি ব্যাপক জনসমর্থন ছিল। এমপি মহোদয় আমাকে পছন্দ করতেন। তিনি সৎ মানুষ ভালো মানুষ শিল্পপতি। তাকে প্রভাবিত করার সহজ না। বলতে পারলেন না। ঘাটের কাজ কিছুদিন পরে শুরু হল। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসলো। আরো কিছুটা সুবিধা হল। ঘাট হয়েছে কিন্তু ব্যাপক বিরোধিতার কারণেই ঘাট স্থানান্তর করা সম্ভব হচ্ছে না। আমি ইতিমধ্যেই ঢাকায় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক রাজস্ব হিসেবে পেস্টিং পেয়েছি, এরপর প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে posting। সরকার ক্ষমতায়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিষয়টিতে interest নিয়েছেন। ফেরিঘাট পাটুরিয়া তে চলে আসলো। মানুষের যাতায়াত আগের তুলনায় কত সহজ হয়েছে। আগের কষ্ট সবাই ভুলে গেছে। প্রতিবছর ফেরিঘাটে গাড়ির সংখ্যা শতকরা দশভাগ বাড়ছে। এখনো ফেরিঘাটে যানজট আছে। আগের মত নাই। উদ্ভাবনের কোন শেষ নেই। এখন পাটুরিয়া আর দৌলতদিয়ায় দুটি ঘাট করা দরকার। ঘাট দুটি ফ্রান্সের ক্যালে ও ইংল্যান্ডের dover এর আদলে করা যায়। দু’পাশে হোটেল-মোটেল থাকবে। কিছু আনন্দ ভ্রমনের জাহাজ ও থাকবে। কিছু বোটেল বা বোট হোটেল থাকবে। A380 প্লেনের মতো একাধিক সিঁড়ি দিয়ে একাধিক তালায় একই সাথে ফেরিতে লোড-আনলোড হবে। হোটেলে হোটেলে পরিচ্ছন্ন টয়লেট খাবার ব্যবস্থা রাত্রি যাপনের ব্যবস্থা থাকবে। ফেরির ভিতর কার্পেট বিছানো। গোসলের ব্যবস্থা। ঘুমানোর ব্যবস্থা।স্বাস্থ্যকর খাবার ব্যবস্থা। সাঁতারের ব্যবস্থাও করা সম্ভব। কে আছেন যিনি আমার স্বপ্নপুরণ করবেন। যা আমি পারিনি।


