স্কুল একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান। এলাকার সবার মতামত এবং অংশগ্রহণে স্কুল স্থাপন করা হলে সেই প্রতিষ্ঠান ভিন্নমাত্রিক। একটি স্কুল একটি এলাকায় ব্যাপক সমাজে অর্থনৈতিক পরিবর্তন আনতে পারে। স্কুল স্থাপনের ক্ষেত্রে সার্বিক দিক বিবেচনায় রাখা উচিত।
স্কুল স্থাপন:
স্কুল স্থাপন একটি শতবর্ষী সিদ্ধান্ত। অনেকে নিজেকে অমর করার জন্য স্কুল স্থাপন করেন। অনেকে অর্থশালী এবং ক্ষমতাবান হওয়ার পর নির্বাচন বা অন্য কোন মতলবে নিজেকে সাধারণের কাছে তুলে ধরার জন্য স্কুল স্থাপন করেন।
স্কুল স্থাপনের সরকারী অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। তাই অনুমোদনের জন্য কি কি শর্তাবলী আছে তা আগেই পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। বাজেট সংস্থান করে তারপর কাজে নামা সঠিক হবে। শিক্ষক নিয়োগ সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষক নিয়োগ স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক, সুচিন্তিত ও সুপরিকল্পিত এবং দীর্ঘমেয়াদী চিন্তাপ্রসূত হতে হবে।
স্কুলের অবস্থান:
স্কুল কোথায় হবে এটি দীর্ঘদিনের জন্য সিদ্ধান্ত। এই সিদ্ধান্ত সঠিক না হলে যুগ যুগ ধরে লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী-শিক্ষকের কত সময় ও অর্থ অপচয় হবে তার হিসাব করা হয় না। প্রতিষ্ঠানের কাছে দূর্গন্ধ, শব্দ, ধূলো, শিশুদের জন্য ক্ষতিকর এমন কিছু সৃষ্টির উৎস আছে কি না বা ভবিষ্যতে হবে কিনা তা বিবেচনায় আনা যেতে পারে। আমরা উন্নত হচ্ছি, আরো হব। উন্নতির সাথে সাথে রুচি, লাইফ স্টাইল বদলে যায়। তখন আরো কী কী সুযোগ সৃষ্টি করা দরকার হতে পারে, তার সুযোগ আছে কি না। ইন্টারনেট, বিদ্যুৎ, পানি ও পয়ঃনিস্কাশন ব্যবস্থা, যাতায়াত ব্যবস্থা ভূত-ভবিষ্যত-বর্তমান। বন্যযুক্ত না বন্যামুক্ত। নিকটে জনবসতি আছে কি না সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকার শ্যামপুর মডেল স্কুল ও কলেজ ঢাকার ডেমরার এমন একটি এলাকায় যেখানে সবই শিল্প, আবাসিক ভবন বিরল তাই শিক্ষার্থী পাওয়া যায় না। দূর থেকে আসতে সময় এবং জানজট বিবেচনায় আনতে হয়। অবশ্য পুরোনো শুনামি প্রতিষ্ঠান হলে আলাদা কথা; সেক্ষেত্রে বহুদূর থেকে সময় ব্যয় করে শিক্ষার্থী আসে ভালো শিক্ষা, ভালো ফলের জন্য। তাই আবাসিক প্রতিষ্ঠান ছাড়া নতুন প্রতিষ্ঠানকে আবাসিক এলাকার বাইরে প্রতিষ্ঠিত করা অপেক্ষাকৃত কঠিন।
শহরের কথা বলা হলো, শহরের বাইরের অবস্থা কী? সেখানে বালিক বিদ্যালয়, সহশিক্ষার বিদ্যালয় ও মাদ্রাসা লুটোপুটি খায়। আবার হাওড়, দ্বীপ, পার্বত্য এলাকায় বহুদূরে বিদ্যালয়। প্রতিদিন আসা সম্ভব না তাই হোস্টেল দরকার। হাওড় এলাকায় মানুষ গুচ্ছাকারে বাস করে কিন্তু বর্ষার মাসগুলোতে শিক্ষালয়ে উপস্থিতি কম। এ এলাকার জন্য উদ্ভাবনী চিন্তা করা যায়। রাবার দিয়ে এমন নৌকা তৈরি করা যায়, যা ভাজ করে পিঠে রাখা যায় আবার নদীর কাছে আসলে হাওয়া দিয়ে নৌকার কাজ চালানো যায়। এ বিষয়ে প্রকল্প নেয়া যেতে পারে। কিংবা প্রতি মহল্লার জন্য সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় বড় নৌকা তৈরি করা যায়। স্কুল স্থাপনের সময় এসব বিষয় বিবেচনা করতে হবে।
পুকুর:
প্রতি বছর পানিতে ডুবে দশ হাজারের বেশি মৃত্যু হয়। সমুদ্রে স্নান করতে গিয়ে গত ১৭ বছরে ১৫০ জন মারা গেছে। শিশুকাল থেকে সাঁতার শেখালে এর বড় একটা সংখ্য প্রাণে বাঁচানো সম্ভব। সাঁতার একটি ভালো ব্যায়াম। অফিসার্স ক্লাবে সাঁতারের ব্যবস্থা আছে। সকলের বাড়ীতে পুকুর থাকে না, সবার বাড়ী নদী, খাল, বিল, হাওড় কিংবা বাওড়ের ধারে না। সেই কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিশেষত স্কুলে পুকুর থাকা দরকার। এমন একদিন আসবে যখন আমরা আরো বিত্তশালী দেশ হব তখন সুইমিং পুল মেনটেইন করার ক্ষমতা অর্জন করব। পরবর্তী কোন এক সময় সুইমিং পুলের সার্কুসার হয়তো হবে। এখন আপাততঃ পুকুর নিয়ে সন্তোষ্ট থাকা যায়। পুকুরে সান বাঁধানো ঘাট থাকতে পারে। নিদেনপক্ষে, কাঠের গুড়ি দিয়ে ঘাট করা যায়। সেই ঘাট দিয়ে সাঁতার অনুশীলন করানো যায়। তাই পুকুর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিকল্পনায় থাকা দরকার। আমি শিক্ষা সচিব থাকাকালীন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে থেকে একটি পরিপত্র জারী করা হয়েছিলো। কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পুকুর না থাকলে অন্য প্রতিষ্ঠান যাতে তাদের পুকুর ব্যবহার করতে দেয় সে জন্য বলা হয়েছে।
খেলার মাঠ:
একসময় ছিলো যখন শিক্ষার্থীরা মাইলের পর মাইল হেটে স্কুলে আসতো। তখন এমন কোন স্কুল ছিলো না যেখানে খেলার মাঠ ছিলো না। এখন শিশুরা হেটে স্কুলে আসে না, হেটে স্কুলে আসা আভিজাত্যের লক্ষণ না। যত্রতত্র স্কুল স্থাপন করা হয়েছে। এরপর জাঙ্ক ফুড তো আছেই। শিশুরা মেদবহুল হচ্ছে তাই আমেরিকার স্কুলের শিক্ষার্থীদের দুই কিলোমিটার হাটানোর ক্লাস দেখে আসলাম নিউ জার্সিতে।
ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশে নগরায়ন হচ্ছে সেই সাথে জমির দাম বাড়ছে, বিক্রয়যোগ্য জমি পাওয়া যায় না। তাই হাল আমলে প্রতিষ্ঠিত বা শহুরে প্রতিষ্ঠানের জমিতে খেলার মাঠ নেই। স্কুল শুরুর আগে এসেম্বলির করার সুযোগ নেই। শ্রেণী কক্ষে ৫০ জন শিক্ষার্থীকে এক মিনিট করে বললে ৫০ মিনিটের কাজ হয়। এসেম্বলিতে! ৭০০ জন শিক্ষার্থীকে বললে ৭০০ মিনিট বলা হয়। আমাদের শিশুরাও মুটিয়ে যাবে, শারিরীক পরিশ্রম না করার জন্য নানান রোগ বাসা বাঁধতে চাইবে। তাই খেলার মাঠ চাইই। এখানেই সরকারের কড়াকড়ি চাই, খেলার মাঠ ছাড়া স্কুল হবে না।
ফুলের বাগান:
সৃষ্টির একটা আনন্দ আছে। সেই আনন্দ আরো সৃষ্টিকে উৎসাহিত করে। শৈশবে ফুলের বাগান সৃষ্টিশীল হওয়ার জন্য লাগসই। স্কুলে ফুলের বাগান কমিউনিটি বাগানের কাজ করে যেখানে অনেকে একত্রে বা পালাক্রমে কাজ করার মধ্যদিয়ে টিম গড়তে, টিমে কাজ করতে এবং সহমর্মিতার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা পায়। স্কুল শেষে বাড়ীতে গিয়ে বাগান করে, গাছ, পরিবেশ, সহজিবিতা, বৃদ্ধি ও পুষ্টি সম্পর্কে শেখে। বাংলাদেশ আয়তনে ছোট হলেও উদ্ভিদ বৈচিত্রে সমৃদ্ধ। বাংলাদেশের ফুল,ফল, সম্পর্কে ধারণা পায়। বনফুল, বললে গাছ সম্পর্কে কৌতুহলী হতে উৎসাহিত করবে।
বাংলাদেশ পলিমাটির, যেদিকে যে যাক গাছ চোখে পড়বে, যাকিছু খাওয়া হোক গাছ তার মধ্যে আছে, যে আশ্রয়ে থাক কোন না কোন অংশ গাছের। সকল পর্যায়ে গাছ লাগানো ও পরিচর্যার জ্ঞান থাকলে ভালো হয়। তাই বাগান করা জীবনের জন্য প্রস্তুতি। জীবনের জন্য প্রস্তুতিই শিক্ষা। বাংলাদেশের শিশুদের জন্য বাগান করা শিক্ষার অংশ। বাগান স্কুলের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
প্রাচীর:
প্রাইভেসি সবাই চায়। ——-প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ——/সেমিনারে একটি মেয়ে জানায় সে সীমানা প্রাচীর চায়। ইউনিসেফ থেকে উপস্থিত প্রতিনিধিরা প্রশ্নে জানাল বখাটে ছেলেদের উপদ্রবের জন্য এই দাবি। যখন জমির স্বল্পতা ছিল না। ইটের দেয়াল দেয়ার সামর্থ ছিল না। তখন ও মানুষ বাড়ীর চারপাশে গাছ লাগিয়ে, শুকনো কলা পাতাদিয়ে বেড়াদিয়ে নিজেদেরকে আড়াল করতো। বনের জীবও তাদের এলাকার বাউন্ডারী নিজেরাই রচনা কর। কোন ফিজিক্যাল বাউন্ডারী না থাকলেও মনের কোনে বাউন্ডারী রচনা করে নেন। গিয়েছিলাম কেনিয়ার ন্যাশনাল সাফারি পার্কে। গাইড বিভিন্ন বুনো জীব দেখানোর জন্য বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে গেল। সে জানালো বিভিন্ন জীব বিভিন্ন এলাকায় থাকে। সত্যি সত্যি তাই হলো। বুনো মহিষ, সিংহ, জিরাফ সবই আলাদা আলাদা জায়গায় থাকে। নিজস্ব পরিচিত এলাকায় নিরাপদ বোধ করে। মনের বাউন্ডারী রচনা করে, নিরাপদ বোধ করে। আমেরিকান আর্মির প্রশিক্ষণ ম্যানুয়াল দেখার সুযোগ হয়েছিলো সেখান থেকে জেনেছি বেশিরভাগ হত্যাকান্ড বাড়ীর নিকটে ঘটে থাকে, তাও সকালে বা সন্ধায় ঘরে ফেরার সময়। কারণ আর কিছুই না সে নিরাপদ বোধ করে; আততায়ী অসতর্ক মুহুর্ত পায়।
সীমানা প্রাচীর কিছুটা হলেও নিরাপত্তা দেয়, নেয়ও অনেক। দিগন্তে চোখ মেলানো যায় না। জগত সীমাবদ্ধ হয়। তাই এই ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেছি। শিক্ষা সচিব থাকাকালীন সবুজ বা গ্রিন বাউন্ডারির নির্দেশনা দিয়েছি, সার্কুলার ইসু করেছি। প্রয়োজন ধারাবাহিকতা। আমরা যদি গাছ দিয়ে সীমানা প্রাচীর তৈরি করি তবে প্রাইভেসি, নিরাপত্তা ছাড়াও চিত্তাকর্ষক শিক্ষালয় তৈরি করা যায়। বেত গাছ দিয়ে সীমানা প্রাচীর দিলে কেউ ঢুকতে পারবে না। লেবু গাছ, নাটা গাছ, শ্যাকুল (এখন আর খুঁজে পাওয়া যায় না, তবে গুজরাটে বিভিন্ন প্রকারের শ্যাকুল পাওয়া যায়), বুচ, মম্ফল, কাঁঠালিচাঁপা আরো হরেক রকমের গাছ দিয়ে বেড়া দিলে নিরাপত্তার অভাব হবে না। শাড়া, দুরান্তা, —- আরো বহুগাছ দিয়ে সীমানা প্রাচীর দেয়া যায়। এছাড়া চিত্তাকর্ষক, বিপদাপন্ন উদ্ভিদ সংরক্ষণ, বৈজ্ঞানিক নাম শেখার মত তৃপ্তি। ইটের দেয়াল প্রাণহীন, ব্যয়বহুল, প্রকৃতি বিচ্ছিন্ন। নিরাপত্তার সমস্যা না থাকলে খোলা রাখুন। খোলা রাখতে মন না চাইলে আপনি কী চান?
স্কুল ভবন:
বিদ্যালয়ের একটি বিশেষায়িত স্থান তাই বিশেষ ধরনের পরিবেশ প্রয়োজন। এজন্য ভবনগুলি ও বিশেষায়িত হওয়া দরকার। বাস্তবে আমাদের দেশে স্কুল এবং দোকান ঘরের মধ্যে নকশায় তেমন কোন পার্থক্য দেখা যায় না। তবে অর্থনৈতিক অগ্রগতির সাথে সাথে ধরে ডিজাইনের পরিবর্তন ধীরে হলেও আসছে।
স্কুল ভবন খোলামেলা এবং আলো-বাতাসে পরিপূর্ণ হওয়া দরকার, শব্দ, দুর্গন্ধ দূষণ থেকে মুক্ত থাকা দরকার। শ্রেণিকক্ষ গুলোতে পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের ব্যবস্থা থাকা উচিত। শিক্ষকদের বসার কক্ষ, সভাকক্ষ, প্রশিক্ষণ কক্ষ, ডাইনিং হল, লাইব্রেরী, শিক্ষার্থীদের জন্য মিলনায়তন, indoor games, খেলার মাঠ, ফুলের বাগান এমনকি এমনকি school campus mini বোটানিক্যাল গার্ডেনে পরিণত করা সম্ভব।
জমির এবং আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে লিখিত সকল সুযোগ-সুবিধা একই সাথে তৈরি করা হয়তো সম্ভব না বিকল্প উদ্ভাবনীমূলক ব্যবস্থা নেয়া যায়। যেমন মিলনায়তন করা সম্ভব না হলে গুলোর মাঝে স্থানান্তরযোগ্য পাটিশন দিয়ে মিলনায়তনের কাজ চালানো সম্ভব।
ক্লাসরুম:
ক্লাসরুমে মন জানালা আলো-বাতাস প্রবেশ নিশ্চিত করতে পারে। তবে জানালা দিয়ে দৃষ্টি শ্রেণীকক্ষের বাইরে গেলে মনোযোগ অন্যত্র নিবদ্ধ হয়। শিক্ষকের উপস্থাপনা এড়িয়ে মন অন্যত্র বিচরণ করতে পারে। তাই জানালা দৃষ্টির একটু উঁচুতে ও স্থাপন করতে হয়। এতে আলো বাতাস চলাচলে কোন অসুবিধা না হলেও ক্লাসরুমের বাইরের জগত দৃষ্টির বাইরে থাকে।
দরজাতে এমন হওয়া প্রয়োজন যেন প্রধান শিক্ষক দরজা না খুলে শ্রেণিকক্ষের ভিতর অবলোকন করতে পারে। এজন্য দরজায় দাঁড়িয়ে থাকার উচ্চতায় চোখের সোজাসুজি slot থাকতে পারে।
পর্যাপ্ত আলোর জন্য বৈদ্যুতিক বাতির ব্যবস্থা থাকা দরকার। বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকলে সৌর বিদ্যুতের ব্যবস্থা করতে হবে।
ক্লাসরুমের দেয়াল:
শেখা সেখানে ক্লাস রুমের দেয়াল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। আমাদের দেশের ক্লাস রুমের দেয়াল ব্যবহার করতে দেখা যায় না। কিন্তু স্কুলগুলোতে দেয়ালে ব্যবহৃত হয়। পরিকল্পিতভাবে দেয়ালে লেখা রাখলে শিক্ষার্থীদের চোখে পড়বে এবং রিপিটেশন এর মাধ্যমে শিখবে। এই লেখা যদি শিক্ষার্থী নিজেরাই লিখে তবে শেখার মানটা আরো ভালো হয়।
লেবরেটরি:
ল্যাবরেটরি এখন আর বিজ্ঞানের ছাত্রদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এখন সকল বিষয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ভাষা ল্যাবরেটরি দরকার। সকলের জন্য computer laboratory দরকার। জীববিদ্যা, পদার্থবিদ্যা, রসায়নবিদ্যার বিজ্ঞানাগার সনাতনী। laboratory ছাড়াও আজকাল ক্লাস রুমের সাথে একটি কক্ষে জরুরী কিছু সরঞ্জাম রেখে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবহার করা। এটি খুবই লাগসই। এর জন্য বড় কক্ষে প্রয়োজন হয় না। এছাড়া আজকাল classroom ও ল্যাবরেটরির হাইব্রিড তৈরি হয়েছে। মাঝখানে শিক্ষার্থী দু’পাশে একই কক্ষে ল্যাব কিংবা মাঝখানে ল্যাব দু’পাশে শিক্ষার্থী বসেন থাকেন। আমরা ধরনের ল্যাব তৈরি করে হাতে কলমে শিক্ষা দেয়া ছাড়াও অল্প সময়ে বেশি শিক্ষা দান করতে পারি। ল্যাবগুলো আলাদাভাবে থাকলে উপরের তলাগুলোতে স্থাপন করা যায়। কারন ল্যাবগুলো অপেক্ষাকৃত কম ব্যবহৃত হয়।
ক্যান্টিন:
বেশ কয়েক মাস আগে কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারি আর নাগেশ্বরী উপজেলার স্কুলে গিয়েছিলাম। সেখানকার ছেলে-মেয়েদের চোখ জ্বলজ্বল আর মুখ কমনীয় দেখেছি। কুড়িগ্রাম আর মঙ্গল পীড়িত না। বাংলাদেশ আর দুর্ভিক্ষে দেশ না।
কিন্তু বহু বছর যাবত বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থীদের জিজ্ঞেস করে দেখেছি স্কুলে আসার সময় অধিকাংশ শিশুরা খেয়ে আসে না। এমন না যে তাদের খাবারের অভাব। হতে পারে মায়েরা সকালে উঠতে পারেন না। অথবা উঠলেও নজর দেন না। তারা খাবার তৈরি করার চেয়ে ফাস্টফুড/পাউরুটির/নুডুলসের দিকে ঝোকেন। আমি অনেক বছর যাবত লক্ষ্য করছি। আমার কথা কেউ বিশ্বাস করতে চায় না। এটা চলতে থাকলে শিশুরা খাটো হবে। ১৮৫৫ সালের দিকে আফ্রিকার সুদানের ‘দিনকা’ উপজাতির গড় উচ্চতা ৫ফুট ১১ ইঞ্চি ছিলো এখন তাদের উচ্চতা ৫ ফুট ৯ইঞ্চি। বিষয়টি সিরিয়াস।আজ ৩০ মে ২০১৬ সকাল ১০ টায় বঙ্গবন্ধু মিউজিয়মে ‘ঘাসফুল শিশু-কিশোর সংগঠন’ এর উদ্যোগে রায়ের বাজার উচ্চ বিদ্যালয় ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণীর ছাত্রীরা পরিদর্শনে এসেছিলো। পরিদর্শন সম্পর্কে বিভিন্ন প্রশ্নোত্তরের আগে তাদেরকে জিজ্ঞাসা করি সময় অভাবে সকালে কে কে খেয়ে আসতে পারেননি? যদি বলতাম কে কে খেয়ে আসনি তবে অনেকে লজ্জা পেয়ে হাত উঁচু করতো না। ফলাফল দেখুন। মায়েদের সচেতন হতে হবে। বাপদের খবর রাখতে হবে। প্রধান শিক্ষক মায়েদের সম্মেলন করে সচেতন করতে পারেন।
বারান্দা:
আলো-বাতাস চলাচল, বর্ষায় পানির ছটা থেকে রক্ষা ছাড়াও ক্লাস শেষ কয়েক মিনিট বিরতিতে শিক্ষার্থীরা বারান্দায় আসে। এক কক্ষ থেকে আরেক কক্ষে চলাচলের জন্য বারান্দা দরকার। এখন শহরে বহুতল স্কুল ভবন হচ্ছে, এই ভবনের বারান্দায় গ্রিল না থাকলে শিশুরা কৌতুহলবসত বারান্দার রেলিংএ চড়লে পড়ে গিয়ে বিপদ হতে পারে। তাই নান্দনিক রেলিং প্রয়োজন। বারান্দা যত ছোট হোক ফুলের টব রাখা যেতে পারে। শিক্ষার্থীদের পালাক্রমে টবের ফুলগাছ রক্ষণাবেক্ষনের দায়িত্ব দিলে বাস্তব জীবনের শিক্ষা পায়।
মিলনায়তন:
একসাথে সকল শিক্ষার্থীকে নিয়ে কোন অনুষ্ঠান করার জন্য মিলনায়তন প্রয়োজন। বিভিন্ন দিবসে যেমন স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, কোন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির পরিদর্শনে মিলনায়তন ব্যবহার করা হয়। বেশিরভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মিলনায়তন নেই। মিলনায়তন ছাড়া সামাজিক বা রাস্ট্রীয় অনুষ্ঠানের আনন্দ ভাগাভাগি করার কোন সুযোগ নেই। কিন্তু মিলনায়তন তৈরি ব্যয় সাপেক্ষ। তবে আজকাল বিভিন্ন মেলা করার জন্য স্টীলের ফ্রেমে ক্যনভ্যাস ঢাকা টেমপোরারি মিলনায়তন স্বল্প খরচে লাগসই। ভারচের নাগাল্যান্ডের রাজধানী কোহিমাতে এমন মিলনায়তন আছে। পরিকল্পনায় প্রথম থেকে মিলনায়তন রাখা যায়। পুরোনো ভবনের উর্ধ্বমুখি সম্প্রসারন করার সুযোগ না থাকলে সাশ্রয়ীভাবে মিলনায়তন করার জন্য ছাদের উপর টিন দিয়ে অতিরিক্ত বড় টানা ঘর করা যায়। এখানে লোড নিয়ে সমস্যা হয় না। তবে প্রকৌশলীর পরামর্শ ছাড়া করা যাবে না। এছাড়া শ্রেণীকক্ষের মাঝের পার্টিশন বিশেষভাবে তৈরি করে ক্লাসের সময় পার্টিশন দিয়ে ক্লাস এবং বাকি সময় মিলনায়তন হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
টয়লেট:
আজকাল সব শিক্ষা প্রতিঠানে টয়লেট আছে। কোন কোন প্রতিষ্ঠান বেশ পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখে। নতুন করে স্থাপিত ভবন গুলোতে ছেলে ও মেয়েদের পৃথক পৃথক টয়লেট করা হয়। কাজের মান ভালো করা, পরিচ্ছন্ন রাখা, টয়লেট সামগ্রী নিয়মিত সরবরাহ রাখা গুরুত্বপূণ বিষয়। অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে টয়লেটে লাইট থাকে না। লাগানোর পর নষ্ট হলে আর প্রতিস্থাপন করা হয় না। মোশন এবং আলোর তিব্রতার সেন্সর ব্যবহার করে সহজে এ সমস্যার সমাধান করা যায়। কেউ ঢুকলে আলো জ্বলবে, বেরিয়ে আসলে বাতি নিভে যাবে। দিনের বেলায় নির্দিষ্ট লুমেনের নিচেয় আলোর তীব্রতা কমে গেলে জ্বলে উঠবে নতুবা নেভানো থাকবে। এভাবে লাইট পাওয়াল সম্ভব একই সাথে সাস্রয়ী হতে শেখানো সম্ভব।
টয়লেটে ট্যাপ, বেসিন খারাপ থাকার ঘটনা বহু, কোন বিষয় খারাপ হওয়ার পর সাথে সাথে প্রতিস্থাপন করা হয় না। এটি আমাদের কালচার, কোন কিছু খারাপ হওয়ার সাথে সাথে প্রতিস্থাপন বা মেরামত করার ব্যবস্থা করার কালচার গড়ে তুলতে হবে। ট্যাপে সেন্সর লাগিয়ে পানির অপচয় রোধ করাযায়।
লাইব্রেরি:
হাজার হাজার বছরের, কোটি কেটি মানুষের গবেষণা, অভিজ্ঞতা, কল্পনা ও চিন্তা প্রসূত জ্ঞান বই আকারে প্রকাশ করা হয়। আবার অসংখ্যা বই লাইব্রেরিতে সঞ্চত থাকে। তাই লাইব্রেরি ছাড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অসম্পূর্ণ। সেই—-সালে রবীন্দ্রনাথ জানান দিয়ে গেছেন “মহাসমুদ্রের শত বছরের কল্লোল কেহ যদি এমন করিয়া বাধিয়া রাখিতে পারিত, যে ঘুমাইয়া পড়া শিশুটির মত চুপটি করিয়া থাকিত তবে সেই মহাসমুদ্রের সাথে লাইব্রেরির তুলনা হইত”। লাইব্রেরির জন্য পৃথক একটি মানানসই কক্ষ প্রয়োজন। শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনুযায়ী নির্ধারণ করা উচিত। সাধারণ বই পড়ার জন্য বড় কক্ষ থাকা দরকার যা থেকে থাকে। এছাড়াও অনেক বিষয় গ্রুপে পড়বে চাইলে তার সুযোগ থাকা দরকার। সাধারণ কক্ষে পড়ার সময় কোন বিষয় নিয়ে গ্রুপে আলোচনা করলে অন্যের পড়ায় ব্যঘাত ঘটে। তাই এই ব্যবস্থা অবশ্যই থাকা দরকার কিন্তু আমাদের শিক্ষা প্রতিঠানের লাইব্রেরিতে নেই। সেই মোতাবেক ফার্নিচার সরবরাহ করা দরকার। গোল টেবিল হলে ভালো হয়। একাধিক টেবিল থাকতে পারে। বিরল বই, প্রাচীন আমলের বই পড়ার জন্য আলাদা কক্ষ থাকতে পারে। অপেক্ষাকৃত ছোট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হয়তো প্রয়োজন নেই তবে বিশ্ববিদ্যালয় বা বড় কলেজের জন্য অবশ্যই প্রয়োজন।
কম্পিউটার, নোটপ্যাড ইত্যাদির মাধ্যমে ইলেক্ট্রনিক কনটেন্ট বা মাল্টিমিডিয়া মিডিয়া বই পড়ার জন্য ব্যবস্থা থাকা এখন আর বিলাসিতা না। রোজকার খবরের কাগজ তো আছেই তবে ইলেক্টনিক ভার্সন পড়ার সুযোগ থাকলে চলবে। এসবের জন্য উচ্চ গতির ইন্টারনেট কানেকশন দরকার।
লাইব্রেরির জন্য ওয়েবসাইট করা যায় যেখানে অপুরও থাকবে। প্রতিষ্ঠান থেকে বিশেষ বিশেষ দিবসে যে ম্যাগজিন বের করা হয় তা ইলেক্ট্রনিক করার সুযোগ রাখতে বলা যায়। প্রতি বছর সক্ষমতা অনুযায়ী এক বা একাধিক বই ইলেক্ট্রনিক করার জন্য তাগিদ থাকতে পারে। প্রথমে এ সবের জন্য সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় প্রশিক্ষণ দেয়া যায়। এখন থেকে ইলেক্ট্রনিক বই কেনার সক্ষমতার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের সার্কুলার দরকার হতে পারে। সাধারণত ক্লাস চলাকালীন সময় লাইব্রেরি খোলা থাকে। ঐ সময়ে শ্রেণীকক্ষে পাঠগ্রহণরত থাকায় লাইব্রেরিতে যাওয়া সম্ভব না। তাই স্কুল ছুটির পর লাইব্রেরি খোলার ব্যবস্থা থাকা অতীব জরুরি। কিন্তু বাস্তবে তা করা হয় না। এই বিষয়টি ক্রিটিকালি চিন্তা করতে হবে।






