যারা প্রতি বছর লেখাপড়া শেষ করছে তারা তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ পাচ্ছে না। বাংলাদেশের যারা স্কুল থেকে ঝরে পড়ছে তাদের আয়-উপার্জনের কোন পথ দেখা যায় না। কোনমতে কৃষিকাজ কিম্বা কোন মেকাক্যাল বা কোন দোকানে কাজের সাথে কিছু তরুণ-তরুণী সম্পৃক্ত। অন্যরা বেকার বা ছদ্ম বেকার থাকে।
এটুআই এর এনপিডি হওয়ার পর কিভাবে পাশ করে বের হওয়া এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ঝরে পড়া তরুণ তরুণীদের কাজে লাগানো যায় এই ভাবনায় পেয়ে বসলো। কিভাবে এইসব তরুণ-তরুণীরা অন্যদেরকেও কাজে লাগাতে পারে সেটা ভাবতে থাকলাম। অনেকে আমাকে বলল ইংরেজি জানেনা। গ্রামের ছেলে মেয়ে,। শিক্ষা-দীক্ষায় মনোযোগী না তাই এদের দিয়ে আইটি’র কাজ করানো সম্ভব না। কিভাবে মেনে নিই ? কারণ আমি জানি আইটি শেখার বিষয় না আইটি ব্যবহারের। প্রশিক্ষণের কোন ভালো ব্যবস্থা নেই তারপরও অনেকে নিজের প্রচেষ্টায় ও ব্যবস্থাপনার outsourcer হয়েছে। ইতিমধ্যেই অনেক সংস্থা অ্যাওয়ার্ড দেওয়া শুরু করেছে। ধান কাটার জন্য সবাই প্রস্তুত কিন্তু লাগাবে কে। মাননীয় প্রধান মন্ত্রীর একান্ত সচিব এবং a2i এর এনপিডি থাকার সুবাদে ইউএনডিপির country ম্যানেজারের সাথে কথা বললাম, এটুআই এর সিনিয়রকে মেম্বারদের সাথে কথা বললাম। পরে জেনেছি তারা বলেছে হঠাৎ করে এরকম একটা পাগলামির সিদ্ধান্ত নেন। অবাস্তব সিদ্ধান্ত নেন। এগুলো আসলে বাস্তবে সম্ভব না। আমি থামতে রাজি না। Let us try and fail এই সংকল্প নিয়ে স্বনির্ভর নামের একটি এনজিওকে দিয়ে কয়েকটি experiment করালাম। সাহস পেলাম, ইতিবাচক ফল পেলাম। আমি বিশ্বাস করি ইংরেজি না জানালেও আউটসোর্সিংয়ের কাজ করতে পারে। নিরক্ষর স্বামী বা স্ত্রীর কাছে কোনো চিঠি আসলে তা কি পড়া হয় না ? নিশ্চয়ই সাক্ষর মানুষকে দিয়ে পড়ানো হয়। কেউ যদি ইংরেজি জানা একজনকে রেখে একটা দল তৈরি করে এবং আউটসোর্সিং করে তবে ইংরেজি কি কোন বাধা ? যদি ভালো মানের প্রশিক্ষণ দেয়া হয় এবং দলে কাজ করে তবে সহজে আউটসোর্সিং কাজ করতে পারে। স্বনির্ভরের অভিজ্ঞতায় এগিয়ে যওয়ার প্রত্যয় পেলাম।
আমি তখন সবে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব হয়েছি। সংস্থার কাছে ধরনা দিতে চাই না, নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে চাই। প্রকল্প তৈরি করলাম ১৮০ কোটি টাকার। একটা সুন্দর প্রাসঙ্গিক নাম দিতে হবে। প্রকল্পের নাম আমি নিজে রাখলাম ‘লানিং আনিং’; শিখতে পারবেন আবার একসাথে আয় করতে পারবেন। আয় করতে পারবেন আবার শিখতে পারবেন। অতএব এই কাজ করলে আস্তে আস্তে উপরের দিকে যেতে পারবে। আয় ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকবে। আয় বাড়তে থাকলে জীবনটা সুন্দর হবে। আত্মীয়স্বজন পরিবার পরিজন এবং প্রতিবেশী সেবা দিতে পারবে। ক্রমান্বয়ে বড়, জটিল এবং বেশি আয়ের কাজ করতে পারবে। শুরু করলাম ঢাকায় প্রশিক্ষণ, গুলো, নির্বাচন করলাম কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে, খুজে-বেছে নিলাম এমন কিছু মানুষকে যারা সুন্দরভাবে কাজটি করাতে পারবেন। এরপর পাঠিয়ে দিলাম জেলায় জেলায়, ৬৪ জেলায় ;জেলা প্রশাসকের সহায়তা নিলাম। ঢাকা থেকে একজন প্রশিক্ষক পাঠালাম জেলায়, স্থানীয়ভাবে জেলা থেকে নিলাম একজন। হোক না সে দুর্বল আগামী দিনে সে সবল হবে। দেখতে দেখতে বলিষ্ঠ প্রশিক্ষক তৈরি হল। পরবর্তী প্রশিক্ষণ স্থানীয় প্রশিক্ষক দিয়েই শুরু করা হলো। জেলা থেকে যাত্রা শুরু হয়ে প্রতিটি উপজেলায় প্রশিক্ষণ দেয়া হলো। স্থানীয়ভাবে তাদের অনেকেরই আইটি দোকান, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে, ব্যবসায়িক ফার্ম খুলে বসলো। হালে পানি পেলাম। উপজেলা থেকে ইউনিয়নে শুরু করেছি। স্বপ্ন ছিল ইউনিয়নে উদ্যোক্তা হবে, তারা নিজেরাই প্রশিক্ষণ দেবে আউটসোর্সিং করবে। তারপর আরও বড় হবে, উপজেলা থেকে জেলা, সেখান থেকে হাইটেক পার্ক।
ডাক পড়ল শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে ছুটে গেলাম সেখানে কাজের জন্য। সময় খুবই কম। এরই মধ্যে আমাদের সব কাজ শুরু করতে হবে, শেষও করতে হবে। এ যেন মরুভূমি, বৃষ্টি আসলেই বীজগুলোকে অঙ্কুর বের করে পাতা দিয়ে ফুল ফল দিয়ে বীজ রেখে জীবনকে শেষ করতে হবে।
আমার স্বপ্ন ছিল এসব আউটসোর্সিং করা তরুণ-তরুণীরা এক এক জন উদ্যোক্তা হবে। অন্যদেরকে কাজ দেবে। তারা আবার বড় হয়ে অন্যদেরকে কাজ দেবে। এভাবেই বাংলাদেশের সকল তরুণ-তরুণীর জন্য কাজ সৃষ্টি হবে। প্রত্যেকের জন্য একটা সুন্দর জীবন হবে। স্লোগান হবে চাকরির নেব না চাকরি দেব। আমি নিয়মিত বাংলাদেশের আউটসোর্সিং এর অবস্থান পর্যালোচনা করি। কোন কোন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিলেন বেশি আয় করতে পারবে, ফিলিপাইন পাকিস্তান ভারতের মতো দেশকে নিয়ে যেতে পারবে প্রশিক্ষণ দিই। প্রশিক্ষণের সিলেবাস পরিবর্তন করে কঠিন থেকে কঠিনতর করি।বাংলাদেশের অবস্থান প্রথম তিনটি দেশের মধ্যে চলে এসেছে তবে ফ্রিল্যান্সারের সংখ্যা বিবেচনায় আয়ের বিবেচনায় না। আমার দিন ফুরিয়ে আসছে। আমি রাজমিস্ত্রি ঘরের কাজ শেষ করি, চুনকামের মিস্ত্রি চলে আসে, আমার আর স্থান নেই। আমাকে যেতে হবে, চলেও এসেছি।



