৯ মাস মিয়ানওয়ালি জেলে আটক, রেডিও-টেলিভিশন খবরের কাগজ কিছুই দেয়া হয়নি। বহিবিশ্বের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। এমন পরিস্থিতিতে ভুট্টো নিজে ড্রাইভ করে পিন্ডির সেনা ঘাটির ‘সিহলা গেস্ট হাউজে’ গৃহন্দীকে পাকিস্তানের সাথে কোন একটা সম্পর্ক রাখার কথা বলেন। গুরু গম্ভীর উত্তর-
আমি ঢাকায় জনসভা করবো। আমি আমার লোকদের সাথে দেখা করব। আলোচনা করে আপনাকে জানাবো। আগে দেশে যেতে দিন তারপর সিদ্ধান্ত। তারিখটা ছিলো ২৭ ডিসেম্বর ১৯৭১।
পাকিস্তানের নতুন শপথ নেয়া প্রেসিডেন্ট গ্যাড়া কলে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১, বাংলার মাটিতে ৯৬ হাজার আত্মসমর্পনকারী পাকিস্তানী সৈন্যের কী হবে ? ৩ জানুয়ারি ১৯৭২ করাচীর নিশতার পার্কে জনসভায় উপস্থিত জনসাধারণের কাছে জিজ্ঞাসা করেন শেখ মুজিবকে মুক্ত করবে কি না। উপস্থিত সবাই সমস্বরে হ্যা বলে। তাৎক্ষণিক ভুট্টো ঘোষণা করেন তার সরকার বাংলাদেশের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে বিনা শর্তে মুক্তির দেবে। ৬ জানুয়ারি ডন পত্রিকায় শেখ মুজিবুর রহমানকে অবিলম্বে মুক্তির আহবান জানায়। ৭ জানুয়ারি রাওয়ীলপিন্ডিতে মুক্তির জন্য বিক্ষোভ। জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে বিশেষ বিমান সরাসরি বাংলাদেশে নেয়ার জন্য প্রস্তুত। ৭ তারিখে ভুট্টো লারকানা থেকে রওয়ালপিন্ডিতে পৌঁছানোয় জল্পনা কল্পনা আরো জোরদার হয়। বিবিসির মাধ্যমে বাংলাদেশিরা খবর জানতে পারে।
অবশেষে সকল উৎকন্ঠার অবসান ঘটিয়ে ৮ জানুয়ারি পিআইএ ফ্লাইটে রাত ৩.০০ রওনা হয়ে দুপুর ১২.৩৫ মি. লন্ডন পৌছান। তার পরনে গলাখোলা শার্ট, ধূসর স্যুট ও ধূসর ওভার কোট। বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউন্জে ব্রিটিশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক কর্মকর্তা মি. আয়ান সাদারল্যান্ডের সাথে আলাপ করেন। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হীথ এর সাথে তার অফিস ১০ নং ডাউনিং স্ট্রীটে দেখা করেন। কলরিজ হোটেলে উঠেই তাজ উদ্দিনকে বলেন ” হ্যালো তাজউদ্দিন দেশের মানুষ কেমন আছে ?”।
বেগম মুজিবকে ফোন করেন
“বেঁচে আছো তো—”
এরপর দিল্লি হয়ে বাড়ী ফেরার পালা ৯ তারিখ রাতে পাইলট স্কোয়াড্রন লিডার ক্রুগ লন্ডন হতে রয়াল এয়ার ফোর্সের কমেট বিমানে রওনা দিয়ে ১০ তারিখে নিকোসিয়ায় এবং বাহরাইনে যাত্রা বিরতি করে ১৫ ঘন্টায় ঢাকা পৌছায়। সকাল ৮.৩২ মি. দিল্লিতে পৌঁছালে ২১ টি তোপধ্বনির মাধ্যমে স্বাগত জানানো হয়। স্থল, নৌ ও বিমান বাহিনীর পক্ষ হতে গার্ড অব অনার দেয়া হয়। ভারতে তিন ঘন্টা অবস্থানকালে ক্যান্টনমেন্ট প্যারেড গ্রাউন্ডে বক্তৃতার জন্য নেয়া হয়। ইন্দিরা গান্ধি বলেন-আমি আমার দেশ এবং বাংলাদেশের মানুষ আপনার জন্য গর্ব বোধ করছি।
বাংলাদেশে কুর্মিটোলা বিমান বন্দরে দুপুর ১.৪২ মি. পৌঁছালো জনতা বিমানে সিড়ি থেকে মানুষে একাকার হয়। প্রিয় নেতাকে ফিরে পেয়ে প্রতিটি বাংলাদেশী বাড়ীতে ঈদের আনন্দ। বঙ্গবন্ধুনেতৃত্বে End of the War and Begining of another-যুদ্ধবিদ্ধস্ত দেশ গড়ার, সোনার বাংলা গড়ার যুদ্ধ, যার কোন শেষ নেই প্রতিবছর গড়িয়ে গড়িয়ে আসে ১০ জানুয়ারীর স্মৃতি। বাঙালি জাতির পিতাকে ফিরে পাওয়ার মধুর স্মৃতি।-সংকলনে: সজিব, শাম্মী ও আমি।







