নারী নেতৃত্ব অস্বীকার করা পুরুষের একটি চিরন্তন বৈশিষ্ট্য। এটা শুধু মানুষের মধ্যেই বিদ্যমান তা না। মানবেতর পশু প্রজাতিগুলোর মধ্যেও একই ধরনের আচরণ দেখা যায়। তাই নারী সিংহ যখন শিকার করে তখন প্রথমে পুরুষকে ভাগ বসাতে সাথে দেখা যায়। পাখিদের মধ্যে সৌন্দর্য এবং কলাকৌশল দেখে নারীর মন জয় করতে দেখা যায়। তাই পুরুষ পাখিরা সবসময় সুন্দর হয়ে থাকে। মানুষের মধ্যে নারীর সৌন্দর্যে পুরুষকে আকর্ষিত হতে দেখা যায়। তাই মানুষের মধ্যেই নারীরা সৌন্দর্যের অধিকারী। শ্রেণি নির্বিশেষে সৌন্দর্য দেখিয়ে পুরুষকে জয় করতে পারে না। বরং পুরুষ তার আর্থিক সামাজিক শারীরিক ক্ষমতা দেখিয়ে নারীকে জয় করে। নারীর কৃতিত্বকে পুরুষরা কখনোই শিকার করতে চায় না। ঐতিহাসিকভাবে নারীর কৃতিত্বকে খাটো করে দেখাতে চায়। এটা মানুষের সামস্টিক বিচারে ধরা পড়ে না।
প্রাচীনকালের অন্যতম একটি সভ্যতা চীনের একটি ঐতিহাসিক উদাহরণ পর্যালোচনা করা যায়। ষষ্ট শতকের মাঝামাঝি হতে সপ্তম শতকের প্রথম দিকে চীনের Tang বংশের একজন মহিলা সম্রাট Wu Zeting (৬৬০-৭০৫) প্রায় অর্থ শতাব্দী রাজত্ব করেছেন।
কিন্তু ইতিহাসে তাকে সফল সম্রাট হিসেবে দেখানো হয়নি বরং অত্যাচারী শাসক হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়েছে। কিন্তু তার সময়কার তথ্য আধুনিককালে নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করে দেখা যায় তার সময় অভূতপূর্ব উন্নতি হয়েছিল। দেশ-বিদেশে চীনের সুনাম ছড়িয়ে পড়েছিল। তবে পুরুষের যে চিরন্তন একটা যুদ্ধাংদেহী ভাব আছে সেটি তার মধ্যে ছিল না। কূটনৈতিক দক্ষতা দিয়ে যুদ্ধে না জড়িয়ে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন।
পৃথিবীর সবচেয়ে আলোচিত প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতা। এই মিশরের সভ্যতার একজন অন্যতম সফল ফেরাউন Tie (১৩৯৮-১৩৩৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দ).
তার সময় উত্তরে মধ্যপ্রাচ্যের সিরিয়া পর্যন্ত আর দক্ষিণে সুদান পর্যন্ত মিশরের সীমানা বর্ধিত হয়েছিল। তার পরবর্তী ফেরাউন পুত্র এমেনোটেপ-৩ মৃত্যু হলে তার নাবালক পুত্র এমেনোটেপ-৪ মসনদে আরোহন করলে তার মা Tie মূলত রাজ কাজ চালাতেন। তিনি অত্যন্ত প্রভাবশালী একজন ফেরাউন। তার সময়ের অনেক সমৃদ্ধি এসেছিল এবং অনেক নতুন নতুন স্থাপত্য নিদর্শন সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু লক্ষ্য করা যায় তার মৃত্যুর পর তার (Mortuary Temple) মৃত্যুস্মারক মন্দিরের তার অনেক মূর্তি ভাঙচুর এবং হাইরোগ্লিফ মুছে ফেলা হয়েছিল। এমনকি তার সমাধিতে তার অত্যন্ত যোগ্য প্রধানমন্ত্রীকে জড়িয়ে নানা যৌন চিত্র (Grifiti) সেই সুপ্রাচীনকালে ১৪৫২ খ্রিস্টপূর্বাব্দে এঁকেছিল। কিন্তু অন্যান্য কালজয়ী নিদর্শন থেকে তার সাফল্যোর ছবি অতি সহজে আঁকা যায়। এখানেও নারীকে পুরুষের হেয় করে দেখার সহজবোধ্য চিত্র ফুটে উঠেছে।
ঐ ঘটনার আড়াই হাজার বছর পর কোন পরিবর্তন হলো কি না দেখা যাক। ইসলামে মহিলাদের সম্পত্তির অধিকার দিয়েছে। কিন্তু পুরুষের মনকে সে অধিকার সন্তষ্ট করতে পারেনি। তাই আজও নারীর সম্পত্তির অধিকার পুরুষকে অস্বীকার করতে দেখা যায়। মধ্যযুগে যখন ইসলামের অগ্রগতি হচ্ছে সেসময়ের একজন নারী শাসকে স্মরণ করা যাক। সে ইউক্রেনের মারিয়াপুল শহরের একজন খ্রিস্টান ধর্মযাজকের কন্যা, তাকে অপহরণ করে তাকে দাস বাজারে বিক্রি করা হয়েছিল। দাস বাজার থেকে একজন মিশরীয় তাকে ক্রয় করে। তার কাছ থেকে মিশরের সুলতান কিনে নেয়।
মিশরের শাসনকর্তা সুলতান As-Saleh Ayyub তাকে বিয়ে করে স্ত্রীর মর্যাদা দেয়। তার নাম দেওয়া হয়েছিল সজারা আল দূর অর্থাৎ মুক্তার গাছ। নিঃসন্দেহে তার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে এই নাম দেওয়া হয়েছিল। ইউরোপ জেরুজালেকে ইসলাম মুক্ত করার জন্য ক্রুসেড (মিশর ১২৪৯ থেকে ১২৫০ খ্রিষ্টাব্দ) ঘোষণা করেছে। নেতৃত্বের জন্য সরাসরি যোগ দিয়েছেন ফ্রান্সের নবম লুই। মিশরের সুলতান এর মধ্যেই ২২ নভেম্বর ১২৪৯ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুকে পতিত হলেন। শত্রু শিবিরে যাতে এই খবর না ছড়িয়ে পড়ে সেজন্য সুলতানের তাবুতে নিয়মিত খাবার পাঠানো হতো। কিন্তু সে খবর নবম লুইয়ের জানতে বাকি রইল না। সরাসরি আক্রমণ করে বসলো সমুদ্র থেকে স্থলাভিমুখে কিছুটা সম্মুখেও অগ্রসর হলো। সাজারা নিশ্চুপ বসে থাকলেন না স্বামীর দায়িত্ব হাতে নিলেন। কৌশলের সাথে যুদ্ধ পরিচালনা করে ৬ এপ্রিল ১২৫০ ফারিসকুরের যুদ্ধে রাজা নবম লুই কে পরাজিত ও বন্দী করেন। কিন্তু নারীর কমল হৃদয় হত্যা না করে তাকে ৪০ লক্ষ দিনার বন্দীপন নিয়ে মুক্ত করে দিলেন। উল্টোটা ভেবে দেখুন তো। যদি সুলতানা বন্দি হতেন তাহলে তাকে কি মুক্ত করে দেয়া হতো। নাকি লুইয়ের হেরেমে স্থান পেত নতুবা হত্যা করা হতো ?
মিশরের তৎকালীন পুরুষ আমাত্যরা তাকে ভালো চোখে দেখলেন না। ক্ষমতা হাতিয়ে নেওয়ার জন্য তাকে প্রাসাদ ষড়যন্ত্র করে তার দাসীদের দিয়ে (২৮ এপ্রিল ১২৫৭ ২)শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করা হলো। এমনকি হত্যার পর তার মৃতদেহ প্রাসাদের উপর থেকে ফেলে দেওয়া হলো। কয়েকদিন যাবত তার মৃতদেহ কুকুরে খেয়ে নিল। এই অসাধারণ মহিলা বর্তমানে ইউক্রেনে জন্ম। তাকে শৈশবে তাতাররা দাসী হিসেবে বিক্রি করে দিয়েছিল। অসামান্য সৌন্দর্য ও যোগ্যতায় আকর্ষিত হয়ে সুলতান তাকে সুলতানার মর্যাদা দিয়েছিলেন। এই তার সফলতার প্রাপ্তি।
শাসক থেকে ফিরে তাকাই সাধারণের দিকে, নারী শাসকের সময়। ১৯৯৪-৯৫ খ্রিস্টাব্দে রাজশাহীতে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) থাকাকালীন একটি ঘটনার কথা স্মরণ করি। একজন মহিলা এম এল এস এস বানেশ্বরী তার পোস্টিং। শহরে স্বামীর বাড়ি প্রতিদিন আসা-যাওয়া করতে তার যথেষ্ট কষ্ট হয়। তাই আমাকে অনুরোধ করা হয়েছিল কালেক্টরেটের খালি পদে পোস্টিং করার জন্য। সে অনুযায়ী তাকে পোস্টিং করা হয়েছিল। অফিসের কয়েকজন বেশ বয়স্ক কর্মী এসে আমাকে বললেন তাকে আমাদের অফিসে পোস্টিং দিলে অনেকের চরিত্র নষ্ট হয়ে যাবে। আমি তাদেরকে বললাম বোরকা পরা ওই মহিলা একা একা তো নষ্ট হতে পারবেনা, আপনাদের কাউকে নিশ্চয়ই সহযোগিতা করতে হবে। আপনারা সহযোগিতা না করলেই হল। এরপর আমি তাকে আমার অফিসে পোস্টিং করে দিয়েছিলাম। অল্প কিছুদিন পরেই আমি ওখান থেকে ঢাকায় বদলি হয়ে আসি। তারপর শুনেছি তাকে অন্যত্র বদলি করে দেয়া হয়েছিল।
প্রকৃতি থেকে মানুষ যা পেয়েছে তা মানুষকে অনেক রিফাইন করতে হয়। রিফাইনমেন্ট হচ্ছে একমাত্র মানুষের গুণ। মানুষ মূলত অন্য লক্ষ লক্ষ জীবের মতোই আরেকটি জীব। পার্থক্য শুধু তথাকথিত মানব সৃষ্ট মনুষ্যত্ব, যা সকল মানুষের মধ্যে বিদ্যমান। সেই মনুষ্যত্বকে আমরা সবাই সমানভাবে সব ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে পারি ?






