কোভিড-১৯ এর জন্য শিক্ষার্থীরা স্কুল বিমুখ হতে বাধ্য হয়েছিল। সেই সময়ে শিক্ষার্থীরা একটা দীর্ঘ সময় কলস ঘরের মধ্যে বসে ছিল। আজকের পরবর্তীকালে তাদেরকে অটো প্রমোশন দেওয়া হয়েছিল। যত সামান্য কিছু পড়াশোনা অনলাইন বা উদ্যোগে হলেও ধর্তব্যের মধ্যে পড়ে না। এই সময়ে তারা নানা রাজনৈতিক প্রপাগান্ডা এবং প্রচারে আকৃষ্ট হয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের জুলাই আগস্ট মাসে স্কুলের শিক্ষার্থীরা রায় রাজনৈতিক নেতাদের চালে আকৃষ্ট হয়। নৈতিক-অনৈতিকভাবে দ্বিবিধ কাজে আকৃষ্ট হয়। এর মধ্যে হাতে আইন তুলে নেওয়া, চাঁদাবাজি, নৃশংসতা, মব ইত্যাদি কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করে নিজেদেরকে ব্যাপক প্রচারের সুযোগ পায়। যা তাদের কাছে কল্পনারও অতীত, তারা রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে তাদের অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করতে চায়। তারা যে ব্যবহৃত হচ্ছে তা বোঝার মত বয়স অভিজ্ঞতা এর কোনোটিই ছিল না। অশ্রদ্ধ স্লোগান, বয়জষ্ঠদের অসম্মান, রাষ্ট্রীয় ব্যক্তিগত সম্পত্তির ধ্বংস, অগ্নিসংযোগ, সরকারি কর্মচারীদের হত্যা ইত্যাদিতে সিদ্ধহস্ত হয়।
রাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীনদের কলঙ্কিত করা থেকে শুরু করে প্রতিষ্ঠিত অনুসরণীয় অনুকরণীয়দের মিডিয়ার সহায়তায় কলঙ্কিত করে আনন্দ পায়। এক পর্যায়ে পরীক্ষা ছাড়াই পাস, ইত্যাদি নানা দাবি বাস্তবায়নে সচিবালয় অভ্যন্তর এবং বাহিরে ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। এমনই প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সাল আসলে এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হয়। পরীক্ষার ফলাফলে বিপর্যয় দেখা দেয়। ইতিমধ্যে সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা তাদের পরবর্তী সরকারের সময় খাতায় নাম্বার দিয়ে পাস করিয়ে দেওয়ার মতো গুজব রটিয়ে ফেলে এবং সেই গুজবের একটু বেশিরভাইগ গিলেছেন। নির্বাচন হয়েছে সবাই আশা করেছিল যে নির্বাচনের পর স্থিতিশীলতা আসবে কিন্তু অর্থনীতির বিপর্যয়, ইরান আমেরিকা যুদ্ধ, রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনা ইত্যাদি কারণে পরিস্থিতি সুখকর হয়নি। কিন্তু জীবন থেমে থাকতে পারে না, জীবন বহমান কিন্তু ভিন্ন গতিতে ভিন্ন পরিসরে। আমরা সেই পরিসরের একটি সামান্য অংশ এইচএসসি পরীক্ষা এবং তার প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করব।
প্রাথমিক শিক্ষা: ২০২৪ সাল
প্রাথমিকে ২০২৪ সালে ভর্তি সংখ্যা ৩৫ লক্ষ ৪৬ হাজার -APSS 2024 published in ২০২৫.
একই সময় উত্তীর্ণ সংখ্যা ২৯ লক্ষ ৭০ হাজার। ২০১০ সালে এই হার মাত্র ৩৪%, ২০২৪ সালে এই হার ৯০% দাঁড়ায়। আওয়ামী লীগ আমলে এটি একটি বিরাট অগ্রগতি।
UNESCO- Completion Report Global Education Monitoring Report.-
World Bank UIS- 94%, 2024 Completion Report
ষষ্ঠ শ্রেণি যে ভর্তি শিশুর সংখ্যা: পঞ্চম শ্রেণীর শিশুদের ৮৯-৯৫%
অষ্টম শ্রেণীর সম্পন্ন শিশু সংখ্যা: শ্রেণীতে ভর্তি শিশুদের ৬৪%
এইচএসসি সম্পন্ন শিশু সংখ্যা: ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি শিশুদের ৪৫%
এসএসসি ২০২৬: এসএসসি ফলাফল এইচএসসির মতোই একই কারণে বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছে।
ফলাফল ১০ আগস্ট ১৯ বছরে সর্বনিম্ন ৬২.২৫, ২০২৫ সালে ৬৮.৪৫ ছিল।
ঐসালে মোট ১৮২৯৪৮৫ জন অংশগ্রহণ করে।
পাস সংখ্যা: ১১৪৩৪৬২ (১,১৩৮৮৭৭ + ৪৫৮৫)
ফেল সংখ্যা: ৬৮৬০২৩ (৬৯০৬০৮ – ৪৫৮৫)
এইচ এস সি ২০২৬:
এইচএসসি ৩১ অক্টোবর ২০২৬ এইচএসসি ফল প্রকাশিত হয়। পাশের হার শতকরা ৫২.১২ যা ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এমনকি ২০২৫ সালের চেয়েও কম ৫৮.৮৩। কিন্তু লক্ষণীয় এই সময় বিদেশ কেন্দ্রে পাশ ৯০.৮৭%। এর অর্থ বিদেশে যারা পড়াশোনা করছিল সেখানে কোন ৫ আগস্টে বা তার পরের করে অরাজকথা ঘটেনি। তাই সেখানকার ফল স্বাভাবিক। এর থেকে স্পষ্টই প্রতিমান হয় এই হল বিপর্যয়ের জন্য ৫ ই আগস্টের ও পরবর্তীকালের নায়করাই দায়ী।
এইচএসসি পরীক্ষার তথ্যগুলোর উপর একবার নজর বুলিয়ে নেয়া যায়: –
এইচএসসি পরীক্ষায় মোট অংশগ্রহণ: ১২ লক্ষ ৭০ হাজার ৫৮৩ মোট, তন্মধ্যে ৬ লক্ষ ২১ হাজার ৯৬৯ ছেলে ও ৬ লক্ষ ৪৮ হাজার ৬১৪ মেয়ে। মেয়ের সংখ্যা ছেলেদের চেয়ে ২৬৬৪৫ জন বেশি।
সাধারণ শিক্ষা থেকে ১০ লক্ষ ৬৯ হাজার ৭১৪ ও কারিগরি শিক্ষা থেকে ২ লক্ষ ০০০হাজার ৮৬৯ জন অংশগ্রহণ করে।
এইসএসসি পাস সংখ্যা: মোট ৬ লক্ষ ৭৬ হাজার ৪৭০ জন তন্মধ্যে ৫৪৫৪৭ জন মাদ্রাসা থেকে আলিম পাস করেছে এবং ৫০৮৮৯ জন ঔকারিগরি শিক্ষা বোর্ড থেকে পাস করেছে।
এইসএসসি ফেল সংখ্যা: ৫ লক্ষ ৯৪ হাজার ১১৩ জন।
পাশের নিম্নগামীতার বহুবিধকরণ এর মধ্যে কয়েকটি উল্লেখ করা হলো:
• বিশৃঙ্খলা -দেশে এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সার্বক্ষণিক বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা বিরাজমান ছিল। তাই বিদেশ কেন্দ্রে পাশের হার ৯০% বেশি থাকলেও দেশের অভ্যন্তরে পাশের হার অনেক কম।
• দারিদ্রতা বাড়া- নিন্ম-আয়ের পরিবারগুলোকে শিক্ষা সরঞ্জামের বদলে খাদ্য কিনতে বাধ্য হয়েছে।
• অনুপস্থিতি- আতঙ্ক ও শিক্ষার্থীদের উশৃংখলতার কারণে ক্লাসে যোগ দিতে দেয়নি। ভিকারুন্নেছা কলেজের প্রিন্সিপালের বক্তব্য এর উদাহরণ।
• উত্তেজনাকর পরিবেশ- শিক্ষার্থীরা বয়সন্ধিক্ষণে বেআইনি কর্মকাণ্ডে থ্রিল বোধ করে। পড়াশোনায় অমনোযোগী। আন্দোলনের দিকে ঝুঁকে পড়েছিল।
• শিক্ষক অপদস্থ- শিক্ষার্থী কর্তৃক শিক্ষক অপদস্থ তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা উৎসাহিত করেছিল।
• সাবজেক্ট শিক্ষক না থাকা-২০০০ স্কুলে ইংরেজি শিক্ষক নেই। তাই ইংরেজি ও আইসিটিতে ফেলের হার বেশি।
• বন্যঅভিযোগ- জনপ্রতিনিধিদের বেপরোয়া মন্তব্য বিভিন্ন শ্রেণীর চাকরিজীবীদের মধ্যে ঘৃণা সঞ্চার করেছে। শিক্ষক প্রশিক্ষণের বরাদ্দ আমলাদের পকেটে -একটি উদাহরণ।
ফলাফল বিপর্যয় থেকে উত্তরণের উপায়:
শেখা-শেখানেয় যে ঘাটতি হয়েছে তা অপূরণীয়। সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের পরবর্তী পর্যায়ে অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে লেখাপড়া করার মাধ্যমে কিছুটা ক্ষতিপূরণ করা সম্ভব। তবে সম্পূর্ণ ক্ষতিপূরণ সম্ভব নয় মর্মে প্রতীয়মান হয়। তবে পরবর্তী শিক্ষাবর্ষেসমূহের শিক্ষার্থীদের জন্য নিচের সুপারিশগুলো যেখানে যেটি প্রযোজ্য তা প্রয়োগ করে ভালো ফল পাওয়া যেতে পারে। নিচে বিভিন্ন পর্যায়ের দপ্তর ও কর্মীদের করনীয় সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হল।
প্রধান শিক্ষকের করণীয়:
• শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে নিয়মিত এনটিআরসিএ-তে শিক্ষক চাহিদা দেওয়া।
• শিক্ষার্থীদের ইউনিফর্ম ও লেখাপড়া সরঞ্জাম সুষ্ঠুভাবে বিতরণ করা।
বিষয় শিক্ষকের করণীয়:
• নবম, দশম, একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণীতে একাডেমিক এসাইনমেন্ট দেয়া। এর উদ্দেশ্য শিক্ষার্থীদের রিসার্স পেপার লেখার সাধারণ ধারণা দেওয়া। বর্তমানে শিক্ষার্থীরা সোশ্যাল মিডিয়াতে কোন একটি চাঞ্চল্যকর খবর পাওয়ার সাথে সাথে কোন চিন্তাভাবনা ছাড়াই মন্তব্য জুড়ে দেন। ক্রিটিক্যালি চিন্তা করার প্রয়োজন বোধ করেন না, সত্য মিথ্যা যাচাই করেন না, কার লাভ কার ক্ষতি হলো সেটিও বিবেচনা করেন না। অন্যদের মতামত উল্লেখ করার পর নিজের মতামত দেয়া শেখানো হলে সকল দিকের মত প্রতিফলিত করে নিজের মতামত প্রকাশিত করলে মতামতের মান অনেক ভালো হবে। আগামী দিনগুলিতে একজন যৌক্তিক মানুষ ও ক্রিটিকাল চিন্তার মানুষ হিসেবে গড়ে উঠবে।
• অভিভাবকদের সাথে শিক্ষার্থীদের আচরণ ও শিক্ষা-অগ্রগতি নিয়ে বিষয় শিক্ষকের মত বিনিময় করা। এরফলে অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের গতিবিধি, শিক্ষা অগ্রগতি সম্পর্কে সম্যক ধারণা পাবেন। সন্তানদের বিপথে যাওয়া যথাসময়ে রোধ করা সম্ভব হবে। অভিভাবকদের পক্ষে শিক্ষার অগ্রগতিও মনিটর করা সহজ হবে।
উপজেলা শিক্ষা অফিসার ও জেলা শিক্ষক অফিসার:
• সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম সচল রাখা
• শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ সংযোগ নেয়া ও সার্বক্ষণিক থাকা
• শিক্ষার্থীদের ভালো রেজাল্ট করা সাবজেক্ট শিক্ষকদের আর্থিক ইন্সেন্টিভ দেয়া
সরকারের করণীয়:
• সকল মাধ্যমিক পর্যায়ের প্রতিষ্ঠান সরকারিকরণ (মাধ্যমিক বলতে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত বুঝাবে)
• মাধ্যমিক স্কুলে লেখাপড়ার সরঞ্জাম ও ইউনিফর্ম বিনামূল্যে দেওয়ার জন্য স্কুলে স্কুলে বাজেট বরাদ্দ।
• জেলায় ও উপজেলায় বিভিন্ন ধরনের জাদুঘর স্থাপন
• মাধ্যমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট স্থাপন
• প্রধান শিক্ষকদের জন্য প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান স্থাপন।
মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর:
• শিক্ষক বাতায়নের কন্টেন্ট কোয়ালিটি কন্ট্রোল সার্টিফাই করা বডি করা
• শিক্ষার জন্য বেসরকারিভাবে তৈরি কন্টেন্ট সার্টিফাই করা।
• ফিল্টার করা কনটেন্ট দেখার জন্য সকল শিক্ষার্থীর বাসায় বিনামূল্যে ইন্টারনেট দেওয়া।
• প্রথম ধাপে মসজিদ, মন্দির, গির্জা, প্যাগোডায় দ্বিতীয় ধাপে মহল্লায় মহল্লায় পাঠাগার স্থাপন।
নায়েম:
• শিক্ষক প্রশিক্ষণের সুযোগ সৃষ্টি।
এনটিআরসিএ:
• সাবজেক্ট শিক্ষক নিশ্চিত করা।
• শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে অনলাইনে এনটিআরসিতে শিক্ষক চাহিদা দেওয়ার সফটওয়্যার চালু করা। এনটিআরসিএ পরীক্ষার মাধ্যমে একটি শিক্ষক পুল তৈরি করবেন। চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষক পুল থেকে সংশ্লিষ্ট স্কুলে শিক্ষক পোস্টিং দেওয়া। পোস্টিং দেওয়ার আগে শিক্ষকের মতামত নেওয়া। এজন্য পুনরায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কোন ইন্টারভিউ নিতে পারবে না।






