খাওয়া পরা যখন মুখ্য ?
বিসিএস প্রশাসন একাডেমিতে কর্মরত থাকা অবস্থায় জেনারেল এরশাদের পতন প্রত্যক্ষ করলাম। সেনাবাহিনী রমনা পার্কেও মোতায়েন, চারিদিকে থমথমে ভাব। এরই মাঝে ক্ষমতার বদল হল। আমরা ১৯৯০ সালে জুন মাসে ব্রিটেন থেকে এসেছি। দেশ ভালোভাবে চলছে না। সবকিছুই দাম বেশি। শাহবাগে বিসিএস প্রশাসন একাডেমির অফিসার্স কোয়ার্টারে থাকি। এখন সেসব বিল্ডিং ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে। আমাদের ফ্ল্যাটের উল্টোপাশে আজিজ সাহেব থাকতেন যিনি পরবর্তীকালে কেবিনেট সচিব হয়েছিলেন। ৩০ আগস্ট তারিখে আমাদের সবচেয়ে ছোট মেয়ে জন্ম গ্রহণ করল। বেতনের তুলনায় জিনিসপত্রের চড়া দাম।মিষ্টি কুমড়া, বুনো কচুর লতি এদিকে আর ইংলিশ মাছ খেয়ে কাটাতে হতো। ঐ দু’টা সস্তা ছিলো। ১৫ টাকায় হাতিরপুল বাজারে ইলিশ মাছ পাওয়া যেত। কয়েক টাকায় মিষ্টি কুমড়ো পাওয়া যেত।
ম্যানচেস্টারে স্কলারশিপে টাকায় ভালো ভালো খেয়ে রুচির কিছুটা পরিবর্তন হয়ে গেছে। খাওয়ায় বেশ কষ্ট হচ্ছিল। তাই বন্ধু শফিক আলম মেহেদীর সাথে পরামর্শ করলাম। সে গত দু’বছর যাবৎ সাভারে ক্যান্টনমেন্ট এক্সিকিউটিভ অফিসার। সেখানে আর থাকতে চায় না। সে আমাকে তার জায়গায় পোস্টিং করে দিতে চাইল। আমি একটা সুযোগ পেলাম। সাভারে বাড়িটা সুন্দর, বাংলো বাড়ি। গরু-মুরগি পোষার সুযোগ আছে। রেশন পাওয়া যায়। বাসার সাথেই স্কুল। ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল একটু দূরে। ক্যানটনমেন্ট এক্সিকিউটিভ অফিসার ওই স্কুলের সদস্য সচিব। অফিস বাসার পাশেই। ফুলটাইম গাড়ি আছে।
জিওসি মেজর জেনারেল রফিক সাহেব, বাগেরহাটের মানুষ। এরশাদ সাহেবের প্রিয় পাত্র ছিলেন। যেকারণেই হোক আমাকে পছন্দ করলেন। কিন্তু এরশাদ সাহেবের পতনের জন্য বেশিদিন থাকতে পারলেন না। বহু বছর পর ২০১৮ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে পাকিস্তান ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চের ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু ওপর গোপনীয় রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে ডকুমেন্ট্রি তৈরীর অংশ হিসেবে পার্লামেন্টে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করার জন্য এক সময়কার আমার রুম এখন একান্ত সচিব ১ সাজ্জাদ সাহেবের রুমে বসে আছি। একদল দাড়ি-টুপিওয়ালা মানুষ সেখানে আসলেন। তাবলীগের টঙ্গী ইজতেমার আখেরি মোনাজাত নিয়ে বিতর্কে দিল্লি থেকে আগত মাওলানা সা’দ মোনাজাত করতে পারেননি। বোধ করি সেসব বিষয়ে আলোচনা করতে এসেছিলেন। কিছুক্ষণ পর একজন বললেন দলের মধ্যে সাবেক জেনারেল রফিক আছেন। তিনি এখন তবলীগ করেন, মাথায় টুপি, নূরানী দাড়ি। চোখে ভেসে আসলো তাঁর ইউনিফর্ম পরা টগবগে চেহারা। আমি এগিয়ে গিয়ে পুরনো পরিচয়টা ঝালাই করতে চাইলাম। তিনি ওই পরিচয়ে খুব একটা আগ্রহ দেখালেন না তবে একান্ত সচিব-১কে বললেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এস এম হলের ছাত্রলীগের জেনারেল সেক্রেটারি ছিলেন। মনের ভেতরে কিছুটা পাঁকমোড়া দিল, কারণ আমি তাকে জানতাম আওয়ামী বিদ্বেষী জেনারেল এরশাদের একান্ত অনুসারী। তাই জেনারেল এরশাদ তাকে একান্ত বিশ্বস্ত ভেবে ৯ (নাইন) ডিভিশনের জিওসি করেছিলেন। তাবলীগ করাটাও কিছুটা অস্বাভাবিক। যাহোক শেষ জীবনে অনেকেই ধার্মিক হয়ে যায়। কারণ মৃত্যু অবধারিত। এবং মৃত্যুর পর কি হবে তা অজানা, অনিশ্চিত। অনিশ্চিত কে ভয় পাওয়া স্বাভাবিক। যারা ক্ষমতায় থাকতে বাড়াবাড়ি করেন, কিন্তু চিন্তা করার মত বিবেক আছে তারা অবশ্যই কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনা করেন। পাপ মোচনের একমাত্র পথ ধর্ম। ইসলাম সেই ধর্ম যাতে সবকিছু ক্ষমা পাওয়া সম্ভব।
যে মুলোটা বাড়ে তার পাতা দেখে বোঝা যায় ?:
জেনারেল এরশাদের পতনের সাথে সাথে তিনি বদলি হয়ে গেলেন আসলো মেজর জেনারেল আব্দুল মতিন। যিনি পরবর্তীকালে ১/১১ এর সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হয়েছিলেন। তিনিও আমাকে পছন্দ করতেন। তার একটা বড় কারণ আমার উদ্ভিদবিদ্যা একাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড। গাছের ব্যাপারে তার খুব বেশি আগ্রহ ছিল। তিনি আমার সাথে সব সময় খুব ভালো ব্যবহার করতেন। কিন্তু বেশ রাগী মানুষ ছিলেন। একবার বিদেশ থেকে ডালিয়া ফুলের চারা এনে যত্ন করে রাখলেন। কেউ একজন মুরগির ছেড়ে দেওয়ায় ডালিয়া ফুলের সব চারা খেয়ে ফেলেছে। আর যায় কোথায়। ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের মিন্নত আলী তার বাসার মালির কাজ করে। জেনারেল মতিন সৈনিকদের বলল মিন্নত আলী কে ধরে উল্টো করে তার পাছায় গরম পানি ঢালতে। জিওসি যা বলবে সৈনিকরা তো তাই করবে ! জিন্নত আলি ঐ কথা শুনে সোজা দৌড়ে কয়েক কিলোমিটার দূরে আমার অফিস ক্যান্টনমেন্ট এক্সিকিউটিভ অফিসারের অফিসে এসে হাজির হলো। আমাকে বিষয়টি বলার চেষ্টা করল। সে আমাকে বলল ম্যাডাম মুরগিগুলো ছেড়ে দিয়েছিল। কিন্তু কারো বলার সাহস নেই তাই সব দোষ পড়ল মালির ঘাড়ে। আমাকে উল্টো করে গরম পানি ঢালতে বলেছে তাই আমি ধরার আগে দৌড়ে পালিয়ে এসেছি। আমাকে বাঁচান। আমি বিষয়টা বুঝতে পারছিলাম না এটা কি করে সম্ভব। তখন ওই বাসার অন্য মালিদের সাথে কথা বললাম। তারপর ডিভ হেডকোয়াটার মেজর এর সাথে কথা বলে ঘটনার সত্যতা পেলাম। আমি জিন্নাত আলী কে বললাম চিন্তা করবেন না কয়েক দিন দূরে থাকেন। আমি বিষয়টা দেখছি। আমার বিশ্বাস ছিল আমি তাকে বোঝাতে পারবো। এবং পেরেছি জিন্নাত আলীর যথারীতি কাজ করা শুরু করেছে। তবে জিওসির বাসায় না, আমার বাসায়। জিন্নাত আলীর বদলে আমি তার নিজ জেলা কিশোরগঞ্জের মালি মাহবুবকে দিয়েছি।
তত্ত্বাবধায়ক উপদেষ্টা হওয়ার পর সে আমাকে তার একান্ত সচিব করার জন্য চেষ্টা করছিল। আসলে সে জানতো না যে আমি বিরোধী দলের নেত্রীর একান্ত সচিব হিসাবে কাজ করেছি। একদিন এয়ারলাইন্সে যশোর যাচ্ছি। যশোর এর কাছে গিয়ে বিমান এমন একটা bumping করল যা আমি জীবনে কখনো experience করিনি। আমার পিছনের সিটে বসা একটু বেশি ওজনের বৃটিশ মহিলা বলের মত এসে পড়ল। কারণ তার সিট বেল্ট পরা ছিল না। আমার সিট বেল্ট পরা থাকায় কোন অসুবিধা হয়নি। সে একেবারে হুড়মুড় করে পড়ল। ভাগ্য ভালো আমার ঘাড়ের উপর পড়িনি, পড়লে হয়তো ঘাড়টা ভেঙে যেতো। যাহোক যশোরের ২০ ২৫ কিলোমিটারের মধ্যে এই ঘটনা ঘটলেও আর যশোরে অবতরণ করেনি; সোজা ঢাকায় এসে অবতরণ করল। আমি যশোর যাওয়ার জন্য ঢাকা বিমানবন্দরে আভ্যন্তরীন টার্মিনালে বসে আছি। কখন আবহাওয়া ভালো হবে। কিন্তু ঝড়ো বাতাস বৃষ্টি আরো জোরদার হলো। টার্মিনালে জেনারেল মতিন সাহেবের সাথে দেখা হল। উনি আমাকে বললেন তার সাথে দেখা করতে। খুব আন্তরিক ব্যবহার করলেন। আমি আমার পূর্বপরিচয় চেপে রাখলাম। তখন দুর্দিন তাই সঙ্গত কারণে আমি আর দেখা করনি। আওয়ামী ঘরানার উঁচু মহলে তাকে বিএনপি সমর্থক হিসেবে বিবেচনা করে। অন্ততপক্ষে আওয়ামী লীগের সমর্থক হিসেবে বিবেচনা করে না। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হলো সেই সময়ে দুই দুটো ঘটনা ঘটেছিল। প্রথমটি সেনাপ্রধান জেনারেল নুরুদ্দিনের অবসর জন্য সেনাপ্রধান পরিবর্তন দ্বিতীয়টি সাভারের জিওসি পরিবর্তন। দুটি ঘটনায় বাংলাদেশের সে সময়কার সকল জেনারেলকে একত্রিত করে ছিল। একমাত্র জেনারেল মতিনকে আমি প্রকাশ্যে বঙ্গবন্ধু বলতে শুনেছি। স্বল্প সময়ের মিথস্ক্রিয়া হলেও অন্য জেনারেলকে এমনকি নুরুদ্দিন সাহেব কেও বঙ্গবন্ধু বলতে শুনিনি।
ইহজগৎ পরজগতে কমান্ড ?:
কর্নেল তাজ স্টেশন কমান্ডার, পদাধিকারবলে ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের চেয়ারম্যান। আমি সেনানিবাস নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে পদাধিকারবলে সদস্য সচিব, তিনি সেনানিবাস নির্বাহী কর্মকর্তার নিয়ন্ত্রনকারী কর্মকর্তা। বোর্ডের মিটিয়ে সভাপতিত্ব করতেন। কোন কোন ক্ষেত্রে তার অনুমোদন নিতে হতো। খুব বদরাগী ছিলেন। অনেক অপ্রাসঙ্গিক কথা বলতেন। পর পর দুজন জিওসির কেউই তাকে পছন্দ করতেন না। তিনি ব্রিগেড কমান্ডারদের চেয়ে পদে নিচে হলেও চাকরিতে সিনিয়র ছিলেন। তাদের কেউই তাকে পছন্দ করতেন না। তিনি ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের চেয়ারম্যান হলেও জিওসি চেয়ারম্যানের ক্ষমতা প্রয়োগ করতেন। জিওসি’র কথায় ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড চলত। সে কারণে জিওসি আমাকে বেশি অগ্রাধিকার দিতেন। জুনিয়র সিভিলিয়ান কর্মকর্তা হিসেবে স্নেহ করতেন। কখনো অসম্মান, দূরব্যবহার করতেন না। বিষয়টি স্টেশন কমান্ডার ভালো চোখে দেখতেন না। বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন মন্তব্য করতেন। সেগুলি কেউ-না-কেউ জিওসির কানে লাগাতেন। কর্নেল সাহেব অনেক সিনিয়ার, পাকিস্তান আমলের তাই তাকে জিওসি এড়িয়ে চলতেন। তার স্টাফ অফিসার মেজর ইয়াদ আলী ফকির মুকসুদপুরের মানুষ সেও বেশ ভদ্র ও সিনিয়র তাই তার সাথে কোন বাঁধাবাঁধি হয়নি। জনাব ফকির বদলি হওয়ার পর একজন মেজর আসলেন। তার সাথে ঠোকাঠুকি লেগে গেল। তিনি নামাজ পড়তেন, পুরোপুরি ইসলামিক তবে বেশ তেজস্বী। তার স্ত্রী মর্ডান সম্ভবত তিনি তাঁর কথামতো ইসলামী রীতিনীতি পালন করতেন না। একদিন অফিসার্স মেসে তার স্ত্রী আসলে বেল্ট দিয়ে পেটানো শুরু করলেন। বিষয়টি জিওসির কানে উঠলো তার বিরুদ্ধে বিচার শুরু হল। যতদূর সম্ভব প্রথম ঘটনা তাই সবাই নমনীয় ছিল। কিন্তু ইতিমধ্যে আরেকটি ঘটনা ঘটে গেল। শুক্রবার জুম্মার নামাজ মেজর সাহেব অনেক আগেই গিয়ে মসজিদে প্রথম সারিতে বসে আছে। জিওসি নামাজ পড়তে আসলেন। দেখলেন স্টেশন হেড কোয়াটারের স্টাফ অফিসার মসজিদের প্রথম সারিতে সিনিয়র অফিসাররা আসলে জায়গা ছেড়ে দিলেন না। পরদিন তাকে জিজ্ঞাসা করা হল। তিনি বললেন এটি আল্লাহর ঘর এখানে সবাই সমান থাকার কথা। এখানে আল্লাহ কমান্ড করেন, এখানে সবাই সমান। কোর্ট মার্শাল শুরু হল, তাকে কোয়ার্টার গার্ডে নেওয়া হল। বিচার চলতে থাকলো। তাকে খালি হাতে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হলো।
সাভার ক্যান্টনমেন্টে ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড এর অর্থায়নে একটি গোরস্থান তৈরি করা হয়। এই গোরস্থানে বেসামরিক ও সামরিকদের দাফনের জন্য পৃথক স্থান নির্দিষ্ট করা। সামরিক দের নির্দিষ্ট করা স্থানে অফিসার এবং আদার র্যংকের জন্য আলাদা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। শুধু ইহকাল নয় পরকালেও তাদের কমান্ড বজায় রাখার ব্যবস্থা আছে।
আমি ঢাকায় গেলে স্টেশন কমান্ডার বড় চিতল মাছ আনতে বলতেন। একবার এনে দিয়েছিলাম কিন্তু আমাকে কোন টাকা দেননি। এরপর প্রতিবারই বলতো চিতল মাছ আনতে, তার দাবি সবসময়ই বড় সাইজের মাছ। আমি পরবর্তীতে আর কখনোই মাছের খোঁজ করিনি। সোজা বলে দিতাম বড় মাছ পায়নি। ইতোমধ্যে এই তালিকায় আরেকটি সংযোগ, তারিখ ও সময় ওঠে এমন ক্যামেরা কিনে দিতে হবে।
আস্তে আস্তে বুঝতে পারছি এখানে থাকা নিরাপদ হবে না। প্রায়ই আপত্তিকর কথা বলতেন। কিন্তু ওনার মিসেস অত্যন্ত ভালো এবং আমি ও আমার স্ত্রী কে স্নেহ করতেন। জিওসি আমাকে খুব স্নেহ করতেন এবং পছন্দ করতেন। তার সত্বেও আমি ধরে নিয়েছিলাম এখানে থেকে আমাকে চলে যেতে হবে। চেষ্টা শুরু করলাম, স্বাভাবিকভাবে উপজেলা নির্বাহি অফিসার হওয়ার পালা চলে আসলো। আমাকে মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার নির্বাহী অফিসার করা হলো। জিওসি আমাকে কিছুতেই ছাড়তে চান না। ফোন করে বদলি বাতিল করে দিতে চান। আমি মহাবিপাকে, অনেক বুঝলাম আমার ক্যারিয়ারের জন্য বদলি দরকার উপজেলা নির্বাহি অফিসার না হলে জেলা প্রশাসক কিম্বা বিভাগীয় কমিশনার কিছু হতে পারবো না। ভাগ্যে এমন পরিহাস পরবর্তীকালে আমি এর কোনটাই হইনি। যখন জেলা প্রশাসক হওয়ার কথা তখন আমি মাননীয় বিরোধীদলীয় নেত্রীর একান্ত সচিব। বিএনপি ক্ষমতায় তাই জেলা প্রশাসক সুদূর পরাহত। যখন বিভাগীয় কমিশনার হওয়ার উপযুক্ত তখন আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব-১।
আমি শিবালয় চলে গেলাম কিন্তু বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন পায়নি। প্রমোশনের জন্য এটি দরকার। কয়েক মাস পরে স্টেশন কমান্ডারের সাথে দেখা করলাম। আমাকে ক্যামেরার কথা স্মরণ করিয়ে দিল। তারপর আর একদিন এসে স্টাফ অফিসার এর কাছে তাগিদ দিলাম। ক্যামেরা দিতে হয়নি এসিআর দিয়েছেন। কি লিখেছেন জানিনা। তবে প্রমোশনে সমস্যা হয়নি তাই ধরে নেয়া যায় ভালই লিখেছেন।
নিক্ষেপকারী দিকে কাঁদানে গ্যাস ছুড়ে দেওয়া:
একদিন বোর্ড মিটি্ংয়ে ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় কুকুর মারা সম্পর্কে একটি এজেন্ডা ছিল। ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় বোর্ডের তরফে কুকুর মারা হয়। কিন্তু পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে কুকুর এসে মৃতদের স্থান দখল করে নেয়। তাই কুকুর মারা ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডর চলমান দায়িত্ব। সাধারনত কুকুর ধরে হৃদপিণ্ড বন্ধ করার ইঞ্জেকশান দিয়ে মারা হয়। কুকুর ধরা সহজ সাধ্য কাজ নয়। যারা কুকুর মারে তাদেরকে দেখলেই কুকুর শতগজ দূরে থাকে। শুধু তাই না আমি লক্ষ্য করেছি ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের মানুষগুলোর থেকে তারা সরে থাকে। বোর্ডে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হল। কিভাবে কুকুরের বংশবৃদ্ধি বন্ধ করা যায় সে বিষয়ে স্টেশন কমান্ডার বললেন। তিনি আমাকে ব্যঙ্গ করার জন্য বললেন সিইও সাহেব কুকুর গুলোকে ধরে ভ্যাসেকটমি করে দেন না কেন? আপনি বিজ্ঞানের লোক আপনি এই কাজটা করেন। আমি উদ্ভিদবিজ্ঞানে পড়েছি, প্রাণিবিজ্ঞানে ন। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভ্যাটারিনারী ও এনিমেল হাজবেন্ড্রি তে পড়িনি। অপরদিকে আমাদের একজন সদস্য মিলিটারি ফার্ম সিও ব্রিগেডিয়ার মাহবুব কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভেটেরিনারি বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন। স্টেশন কমান্ডারের ছোড়া কাদানে গ্যাসের শেল আমি হাতে তুলে নিলাম। আমি বললাম স্যার এই বিষয়ে পড়াশোনা করিনি, মাহবুব স্যার পড়াশোনা করেছেন। হাতেকলমে গরু-ছাগলের ভ্যসেকটমি করেছেন উনি এই দায়িত্বটা সুচারুভাবে পালন করতে পারবেন। ব্রিগেডিয়ার মাহবুব স্টেশন কমান্ডারের চেয়ে সিনিয়র। আর যাই কোথায়, উনি বললেন আমাকে অপমান করা হচ্ছে। আমি আর বোর্ড মিটিংয়ে আসবো না। আমি বললাম স্যার আমি টেকনিক্যাল কথা বলেছি। তিনি বললেন সিইও সিভিলিয়ান, সে বুদ্ধিমান তাই স্টেশন কমান্ডারের ছোড়া কাঁদানে গ্যাস ধরে আমাদের দিকে ছুঁড়ে দিয়েছে।
কে কি হবে তা বলা যায় ?
ব্রিগেড কমান্ডার মির্জা তোসাদ্দেক হোসেন বেগ শিক্ষিত এবং মার্জিত কর্মকর্তা ছিলেন। সাভারে আটিলারি ব্রিগেড কমান্ড থেকে তিনি ঢাকায় প্রতিরক্ষা মহাপরিদপ্তরের মহাপরিচালক হয়েছিলেন। ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুলের সভাপতি থাকার কারণে তার সাথে বেশি ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল। তার আপন ভাই সিভিল সার্ভিসে যুগ্ম সচিব ছিলেন তা সত্ত্বেও প্রথম দিকে সিভিলিয়ানদের সম্পর্কে তার ধারণা ভালো ছিল না। পরবর্তীতে দেখলেন আমি আইনের বাইরে যাই না। তাই তিনি আমাকে বেশ পছন্দ করতেন। তিনি বেশ জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। বিভিন্ন ধরনের বই পড়াশুনাও করতেন। আমাদের ধারণা ছিল তিনি একসময় হয়তো সেনা প্রধান হবেন। কিন্তু তিনি ব্রিগেডিয়ার উপরে যেতে পারেননি। আমার ধারণা আরও অনেক সিনিয়ার হলে পরিবর্তিত হয়েছে। জ্ঞানী হলে, ন্যয়ানুগ কাজ করলে পদোন্নতি হবে এমন কোন নিশ্চয়তা নাই। ক্ষমতার কারো সাথে আত্মীয় হোক, লেনদেন হোক, কৃতজ্ঞতার বন্ধন হোক, কোনো-না-কোনো কানেকশন না থাকলে, পাওয়ার গ্রুপের সাথে কানেক্টেড না থাকলে প্রমোশন হবার সম্ভাবনা কম। ক্ষমতাবান কেউ, কোন গ্রুপ আপনার বিরুদ্ধে লেগে থাকলে আপনি সৎ হলেও অসৎ লেবেল লেগে যেতে পারে। তবে পরীক্ষিত সৎ হলে তার জন্য সাময়িক হলেও দিনশেষে অসুবিধা হয় না।
সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ ? :
মার্কিন সাহায্যের আওতায় গম সাহায্য দেয়া হতো। বাংলাদেশের মানুষ রুটি খাওয়ার পেছনে এই সাহায্য প্রকল্পের ব্যাপক ভূমিকা। বাংলাদেশের রাস্তার পিছনেও এর সবচেয়ে বড় একটা ভূমিকা। এমনও হতে পারে উত্তরা গুলশান বনানীর বাড়িঘরে একটা বড় অঙ্কের টাকা পিছন থেকে পিএল-৪৮০ যুগিয়েছে। আর গেছে পার্বত্য চট্টগ্রামের সেগুণ বাগান। এই গম আনার জন্য আমাকে ঢাকায় পড়ে থাকতে বলা হত। আমি সাভারের ক্যান্টনমেন্টের বাড়িতে সপরিবারে বসবাস করতাম তাই ঢাকা আমার জন্য আকর্ষণীয় ছিল না। যারা ঢাকার বাড়িতে থাকতেন তাদের জন্য হয়তো ঢাকা আকর্ষণীয়। জিওসি আমাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন যেমন করে হোক ত্রান ও দুর্যোগ মোকাবেলা মন্ত্রণালয় থেকে গম বরাদ্দ করাতে হবে। গম বরাদ্দ হওয়ার পর তার পুরোটাই টেন্ডারে বিক্রি করে দেওয়া হতো। প্রথমবার আমাকে টেন্ডার কমিটির সভাপতি করা হয়েছিল। আমাকে টেন্ডার কমিটির সভাপতি করা হলে আমার চাকরি নিয়ে টান পড়তে পারে। সেনা সদস্যরা হলে কেউ ঘাটাতে যাবে না। civilian হলে anti corruption থেকে শুরু করে সবাই ভাগ বসাতে চাইবে এবং সমস্যা সৃষ্টি করবে। আমি আমাকে বাদ দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছিলাম। স্টেশন কমান্ডার আমার কথা শুনেছিলেন। অন্য একজনকে কমিটির সভাপতি করে টেন্ডারে গম বিক্রি করে দেয়া হতো। দু’বছরে আমি দু’কোটি টাকার কম এনে দিয়েছিলেন। নিয়মানুযায়ী ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের project হওয়ার কথা। কিন্তু এই গম বিক্রি করা সমুদয় টাকা divisional headquarters নিয়ে যাওয়া হতো। একটু পরে আমি বাধ সাধলাম পুকুর কেটে দিতে হবে। তাই ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড পিছন দিকে বিক্রি করা গমের টাকা কিয়াদংশ দিয়ে একটি ছোট পুকুর কাটা হলো। এই গম বিক্রি করা টাকা কোথায় কিভাবে ব্যয় হতো তা আমার কোন ধারণা ছিল না। তখনো সেনাবাহিনীতে চাকরি অনেক বেশি আকর্ষণীয়। সেখানে গমের আকর্ষণ ও ছিল। তবে উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা না হলে দাঁত বসানোর কোন সুযোগ নেই। সেটা ক্যান্টনমেন্টের জিই এর অফিসের কাজই হোক, পুকুর lease হোক, ধানক্ষেতের জন্য lease হোক কিংবা গাছ বা মাছ বিক্রি করা টাকায় হোক।






