মাটির ভিটি, খড়ের চাল, ছেচা বাশের বেড়ার ঘরে ১৯৫৬ সালের ফেব্রুয়ারী মাসের ১ তারিখ বাঙলা ১৩৬২ সালের ১৮ মাঘ বুধবার দিবাগত রাত আনুমানিক তিনটার সময় আমার জন্ম। বাড়ীতে আমাদের কোন ঘড়ি ছিলোনা। আমি আব্বা-আম্মার দ্বিতীয় সন্তান। একটু বেড়ে উঠতেই পদ্মার মা নামের পাড়াতো এক ফুপু তারনি বলে ডাকতো। বাড়ীর সামনে খাজরোর বাওড় থাকায় মাছ ধরা প্রকৃতি থেকে শিখেছি। তারনি নামের এক টাক পড়া জেলের কালো গায়ের রং আর শুটকো গড়নের আমাকে তারনি বলাতে কেউ আপত্তি করেনি। জন্মের পর আমাকে দেখে কেউ কেউ পেতি জেল মাছের সাথে তুলনা করেছিলো। বলা বাহুল্য কুচকুচে কালো রঙের ছোট শিঙ মাছকে যশোরে জেল (জিওল) মাছ বলে থাকে। এই মাছে কাটা মারলে বেশ ব্যথাও হয়। আমি যখন একটু বেড়ে উঠেছি হাই স্কুলে পড়েছি তখনো আমার সম্পর্কে নেতিবাচক অনেক বিশেষণ শুনেছি। বরাবর পাতলা গড়নের হওয়ায় তখন আমাকে প্যাঙা চাচা বলে ঠাট্টা মসকরা করতো। এসব আমি কখনো ভলোভাবে নেইনি। এক দিনের কথা আমার মনে এখনো অপরাধ বোধ হয়ে আছে। আমি ছোট খাটো মানুষ কিন্তু দ্রুত গতি চাই। আব্বার একটা সাইকেল ছিলো সেটা চালানোর মত আমার উচ্চতা হয়নি কিন্তু চালাতে তো হবেই। বাড়ী থেকে তিন মাইল দূরে রাজগজ্ঞ হাট। অগত্য মাঝখান থেকে চালানো শুরু করলাম যা আমাদের এলাকায় খোলে (মাঝখানে) চালানো বলে থাকে। সাইকেল চালিয়ে আসছি সবে রাস্তায় মাটি দেয়া হচ্ছে, রাস্তার পাশে চার কোনা বড় বড় মাটি কাটার গর্ত। রাস্তায় সবে মাটি দেয়া হচ্ছে শিথিল মাটি তাই সাইকেল থেকে নেমে মাঝে মাঝে ঠেলে নিতে হচ্ছে। এমন সময় আসমত নামের একজন আমার চেয়ে কিছুটা বেশি বয়সী প্যাঙা চাচা বলে ডাক দিতেই আমি একটা মাটির শক্ত ঢিল ছুড়ে মারা মাত্রই সে প্রচন্ড ব্যাথা পেলো। এরপর তার বাবা চাচারা এসে বড় আকারের গোলমাল শুরু করলো। অবস্থা বেগতিক দেখে আমি দ্রুত কেটে পড়লাম। আমার আব্বা কখনই ন্যায় হোক অন্যায় হোক কারও গায়ে হাত দেয়া মেনে নিতেন না। বরং আমাদেরকে মারধর করতেন। যাহোক সেদিন আমার সেজে চাচা আমাকে রক্ষা করলেন। উনি একটা প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। এই অন্যায় বোধ আমি কখনও মুছে ফেলতে পারিনি। তাই আমি আর জীবনে মারামারিতে লিপ্ত হইনি।



