কুরআন শরীফে আবিসিনিয়ার রাণী বিলকিসের কথা পড়েছি। এখন সে দেশটির নাম ইথিওপিয়া। তার রাজধানী ‘আকসুম’ সাতান্ন হাজার মানুষের ছোট্ট গ্রাম্য শহর। অনেক দিনের সুপ্ত ইচ্ছা আকসুম দেখতে যাব। এর ভৌগলিক পরিবেশ, মানুষের সংস্কৃতি চলন-বলনই বা কেমন? আজ থেকে ৩০০০ বছর আগের কথা জেরুজালেমে সোলাইমান বাদশা রাজত্ব করতো। এই সময়ে বর্তমান ইয়েমেনের কিছু অংশ এবং লোহিত সাগরের অপর পাড়ের আবিসিনিয়ার অংশ নিয়ে ‘সাবিয়ান’ রাজ্য ছিলো। একজন মহিলা সে দেশের রাজত্ব করতেন। কুরআন শরিফে তাকে ‘বিলকিস বললেও ইথিওপিয়ানরা তাকে ‘মাকিদা’ বলে থাকে। সোলমান রাজার গুনগান-পান্ডিত্যে মুগ্ধ সাবিয়ান রানী সাড়েচার টন সোনা, প্রচুর মসলা সুগন্ধির উপঢৌকন নিয়ে স্বশরীরে তার সাথে স্বাক্ষাৎ করতে যান। তার সাথে আলাপচারিতা চান। কয়েক মাস যাত্রার পর জেরুজালেমে পৌঁছে রাজ প্রসাদে অতিথি হলেন। এরপর মন বিনিময়ের পালা, ফিরে এসে একটি পুত্র সন্তানও জন্ম দিলেন নাম তার ‘মেনেলিক’ (ইবণে আল মালিক)। একে একে বছর গড়িয়ে ২২ বছর বয়স হলো। পিতার সন্ধানে এলে মেনেলিকের আঙটি দেখে সোলেমান তার ছেলেকে জেরুজালেমে রাখলেন। প্রজারা বাধ সাধলো তাকে তার দেশ ইথিওপিয়ায় পঠিয়ে দিতে হবে। কারণ সোলেমান রাজ কাজের চেয়ে ছেলের দিকে বেশি মন দেয়। সোলেমান এক শর্তে রাজি হলো-তার সাথে নেতা-পুরইতদের ১০০০ ছেলেকে পাঠাতে হবে। যে কথা সেই কাজ মেনেলিক ১০০০ বন্ধুসহ সাবিয়ান রাজ্যের দিকে রওনা হলো। জেরুজালেমের সবচেয়ে বড় ‘রাবিব’ ‘জোডিয়াক’ আপনারা ছাদেক বলতে পারেন তার ছেলে আজগর আসার সময় মুসাকে আল্লা যে ১০ টি কমান্ডমেন্ট বা নির্দেশনা ‘আর্ক অব কোভেনেন্ট’ আল্লার নির্দেশ মোতাবেক চুরি করে নিয়ে আসে। তখন তাদের রাজধানী ‘আকসুম’। আজও সেখানকার সেন্ট মেরি গীর্জায় সেটি রাখা আছে বলে দাবি করা হয়। শুরু হয় তাদের বংশের রাজত্ব। হাইলে সেলাসি পর্যন্ত তাদের বংশধর রাজত্ব করেছে। তারা দেখতে আফ্রিকার অন্যদেশের কালো মানুয়ের মত না। অনেকটা ভারতীয়দের মত তবে চুলটা কালো মানুষের মত। এদের গায়ের রং অনেকটা আমাদের মত, তবে বেশিরভাগ আমাদের চেয়ে সমান্য কালো। লোহিত সাগরের আপর পাড়ে আরবদের সাথে চলনে-বলনে মিল অনেক।
আকসুমে ইহুদিদের সংখ্যা কম হলেও এখান থেকে ২০০ কিলোমিটার দূরে ‘গন্ডর’ ইহুদিদের রাজধানী ছিলো। এখান থেকে অনেকেই ইজরাইলে পাড়ি জমিয়েছে। এখনও ইজরাইলের একজন শ্রেষ্ঠ গায়িকা—ইজরাইলী বংশউদ্ভুত। এই জায়গা দেখার অনেক দিনের অদম্য আগ্রহ ছিলো। সুযোগ মিলে গেল নাইজেরিয়ার আবুজাতে কমন্ওয়েল্থ আসিটি কনফারেন্স। কনয়ারেন্স শেষ হওয়ার পর দুইদিন থাকতে হবে ওদের দেয়া টিকিট সেভাবে। কিন্ত আড্ডিস আবাবা আসার ফ্লাইট আছে। আগেই প্রস্তিত হিসেবে দিল্লি থেকে ভিসা নিয়েছি।
ইথিয়পিয়ান এয়ারলাইন্সের ইটি-৯১০ফ্লাইটে বিকেল ০১.৪০ মি. নাইজেরিয়ার আবুজা বিমান বন্দর থেকে রওনা হয়ে রাত ০৮.১ মিনিটে ‘নতুন ফুলে’ পৌঁছালাম। ‘গন্ডর’ খেকে রাজধানী স্থানান্তরের পর ইথিয়পিয়ানদের ভাষা ‘আমহারিক’-এ আড্ডিস আবাবা বলে ডাকে যার বাঙলা অর্থ নতুন ফুল। আমরা অবশ্য আদ্দিস আবাবা বলে থাকি। আমরা ইংরেজিতে শিখি তাই তাদের যা বিকৃত উচ্চারণ তা সবই সঠিক বলে গ্রহণ করা হয়। যেমন প্যারি কে প্যারিস, দান হাগ কে দি হেগ, লিস বোয়া কে লিসবন, ভারজ কে ওয়ারশ, ভিয়েন কে ভীয়েনা ইত্যাদি ইত্যাদি।
দুবাই থেকে বোডিং পাস নেয়ার সময় আউট সোর্স কমর্চারীর হাতে নাস্তান নাবুদ হওয়ার দুঃস্বপ্ন থেকে অনুমান করেছিলাম এখানে নাজানি কি হয়। যদিও সতর্ক হয়ে আগে থেকেই দিল্লি থেকে ভিসা নিয়ে এসেছি। নামার আগে এয়ার হোস্টেসকে এরাইভাল কার্ড দিতে বলায় জানালো প্রয়োজন হবে না। আমাদের ধারণা পশ্চিমা বিশ্বে পত্র-পত্রিকা বা লেখা থেকে পাই। এখানেও তার ব্যতিক্রম না। মাত্র পাঁচ মিনিটে ইমিগ্রেশন শেষ; কোন কথা নেই’ কোন প্রশ্ন নেই। আমি আড্ডিস আবাবা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পসে যাওয়ার পর জেনেছি এখানে ভালো মানের আইটি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা আছে এবং প্রতিবছর এদের সংখ্যা অনেক বেশি তাই এদের এয়ারপোর্ট আইটি ব্যবহারে অগ্রগামী। ইথিওপিয়ান এয়ার লাইনস আফ্রিকার মধ্যে সেরা তাদের ৪৫০ টির মত বিমান আছে। ভালো মানের বিমান সংশ্লিষ্ট কর্মী আছে। একটা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা কি অবদান রাখতে পারে তা এখান থেকে বোঝা যায়। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশের কলকাতা নগরীতে ডিপ্লম্যাটিক পাসপোর্টে গিয়েও অনেক প্রশ্নের সম্মুখিন হয়েছি।
ব্যাগ পেতে ৩০ মিনিটি মত সময় লেগেছে বন্দর কর্মচারীদের জিজ্ঞাসা করায় সাবলিলভাবে বল্লো ক্যারোসল ৪, কিন্তু কোন খবর নেই’ ডিস্প্লেতে লেখা নেই। অবশেষে একজন যাত্রী যিনি মালামাল নিয়ে যাচ্ছে তাকে জিজ্ঞাসা করায় জানালো তাকেও আমার মত ভুল বলা হয়েছিলো কিন্তু সে ১ নম্বর ক্যারোসলে মালামাল পেয়েছে। আমিও সেভাবে আমার ব্যাগ পেলাম। এদের ৫৩ ভাগ কৃষি নির্ভর অর্থনীতি ২০১২ সালে জিডিপি শতকরা ৮ ভাগ হারে বেড়েছে। মাথাপিছু আয় ১২০০ ডলারের উপরে। আইটিতে এগিয়ে থাকলেও কালচারাল বা গর্ভানেসের বিষয়টি একই সাথে এগিয়ে নেয়া যে দরকার তা এখান থেকেও বোঝা যায়।
যে সব দেশে দুর্নীতি, প্রিডিকটিবিলিটি নেই সেখানে মানুষ ফিকস্ড এসেটে ইনভেষ্ট করে এখানেও তা্ই। আক্সুমের পথে উড়াল দেয়ার পর দেখা গেল আড্ডিস এর উত্তর ও পূর্ব এলাকা জুড়ে বহু এলাকা জুড়ে বহুতল(৫-৬ তলা) হাউজিং কমপ্লেক্ষ গড়ে উঠেছে। এদের ছাদ এককে কম্প্লেক্সের এক এক রঙের-পরিকল্পনা করে এরিয়াল ভিউচিন্তা করে করা হয়েছে। আড্ডিসকে পরিকল্পিতভাবে বিউটিফাই করা হচ্ছে।
৯ কোটি মানুষের দেশের ৫৭ লক্ষ মানুষের রাজধানী আড্ডিস আবাবায় গ্রাম্য ভাব আছে। সকালে হোটেল থেকে কেন, যে কোন জায়গা থেকে মোরগের ডাক শোনা যায়। কুকুরের ডাক সারা রাত ভোর। সুন্দর শহর সমুদ্র পৃষ্ঠ হতে ২৪০০ মিটার উপরে। তাপ সকল সময় অত্যন্ত আর্কনীয় ২৩ ডিগ্রির আশপাশে ঘুরপাক খায়। ভোরে আজানের ধ্বনি পাওয়া যায়। খৃস্টান মুসলমান সকলের কাছে জিজ্ঞাস করলে সকলেই জানায় ৫০/৫০ কিন্তু সরকারি হিসেব এমন কি সিআ্ইএ-র ওয়ের সাইটে মুসলমানের সংখ্যা ১/৩ দেখানো হয়ে থাকে। টুরিস্টদের জন্য ওয়েব সাইটে মাত্র একটা ‘আনোয়ার মসজিদ’ আছে। তবে আড্ডিস আবাবা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরে মসজিদ আছে। বাইন্ডারীর বাইরে আরো একটি বড় আকারের মসজিদ নির্মানাধীন। একজন ব্যবসায়ী এটি করে দিচ্ছেন কিন্তু তার নাম উল্লেখ করতে চান না। সকালে মনে হলো সারি সারি পুরুষ মহিলা নামাজের জন্য মসজিদে যাচ্ছে, সাদা ওড়নার মত চাদর মাথায় দিয়ে। এরা যে মসজিদে যাচ্ছে না সে ভুল আকসুমে গিয়ে ভাঙলো। সে বিষয় পরে বিস্তারিত আলোচনা করছি।
‘অনটোজেনী রিপিটস ফাইলোজেনী’ অর্থাৎ যার যেখানে উৎপত্তি জীবনের যেকোন স্তরে তা প্রকাশিত হবে তাই হলো। ইমিগ্রেশন শেষ করে ১০০ ডলার ভাঙিয়ে ১৮৮২ ইথিওপিয়ান ‘বির’ পা্ওয়া গেল। বিমান বন্দরের ভিতরেই ট্যাক্সি বুথ ৪৫০ বির বা ২৫ ডলার হাকলো। বিষয়টি আগে থেকে জানা ছিলো তাই বাইরে এসে দরকষাকষির সিদ্ধান্ত নিলাম। পার্কিং এ এসেও ৩৫০ বির এর কম পেলাম না। অপেক্ষমান এজন ইউরোপিয়ান পাইলট জানালো নীল ট্যাক্সি অপেক্ষাকৃত সস্তা। অনেক চেষ্টা করেও কমাতে পারলাম না। এয়ার পোর্ট থেকে বড়জোর ৫ কিলোমিটার হবে এর মধ্যে রাত ১০ টা বেজে গেছে। আর দেরী করা সমীচীন হবে না ভেবে অগত্য নীল ট্যাক্সিতে চেপে বসলাম। ব্রেক ঠিকমত আছে বলে মনে হলো না। রাস্তা অন্ধকার ছড়ানো ছেটানো বাড়ীঘর। ভুল করে অন্য রাস্তা ঘুরিয়ে আনছে এবং সে রাস্তা ভুতুড়ে অন্ধকার। গা ছমছম করছিলো এমন সময় কত ডলার ভাঙিয়েছি জিজ্ঞাসা করায় ভয় চেপে বসলো। বার বার জিজ্ঞাসা করছি কত দূর শেষ পর্যন্ত ভাঙা খাদের রাস্তা দিয়ে শেষ করে হোটেলের সাইন ‘প্যানোরমা হোটেল’ দেখতে পেয়ে হাফ ছেড়ে বাচলাম। ১০০ বির এর চারটি নোট দেয়ায় ৫০ বির ফেরৎ দিতে গড়িমসি করছিলো আরো ৫০ বখশিষ চায়। প্রকৃত ভাড়া বড়জোর ৫০ বির মাইক্রোবাসে গেলে ২ বির তার উপর ৩৫০ নিয়ে আরো বখশিষ চায়। তাই দৃঢ়তার সাথে অপারগতা প্রকাশ করলাম।
হোটেলের সামনে রাস্তা ভাঙাচোরা হলে কি হবে ফ্রন্ট ডেস্কের ব্যবহার প্রফেশনাল, অত্যন্ত ভালো ব্যবহার- কিছুটা আস্তা ফিরে পেলাম। পরিস্থিতি জানার জন্য বললাম ‘আমি খুর ভোরে হাটতে বেরুতে চাই, নিরাপত্তার অবস্থা কি? ছিনতাই কারী আছে কি না? সে এতে সম্ভবত তার আঁতে ঘা লেগেছে জানালো ‘আদ্দিস’ কেনিয়া বা উগান্ডার মত না। আমি জানি এখানকার ২৭% লোক বেকার, যারা সকার তাদের বেতন খুব কম যদিও জিডিপি গ্রোথ ৮%, পরবর্তী কয়েকদিন একই কমপ্লনে শুনেছি। পুরোপুরি বিশ্বাস হলো না অপেক্ষার পালা, পরবর্তী কদিনে জানব এবং পরে অভিজ্ঞতা আপনাদের জানাব।
হোটেলের সামনে বেরিয়ে আসতেই রাস্তায় মাটি খোড়া আর বৃষ্টি মিলে হালকা স্তরের আঠালো কাদার সৃষ্টি হয়েছে। মনে হলো আমাদের মতো এখানেও রাস্তা খোড়াখুড়ি দিনের পর দিন চলতে থাকে। পরে জেনেছি ব্যাপরটা সেরকম না এখান দিয়ে পাতাল রেল হচ্ছে। রাস্তা পার হয়েই ফুটপাথে তাকাতেই সারিসারি জুতো কালি করা লোক তবে জুতো কালি করা না বলে জুতো পরিস্কার করা বলা বেশি এপ্রোপ্রিয়েট হবে। অনেকেই আজকাল আমাদের দেশের মত ‘কেডস’ পরেন তাই কালি করার সুয়োগ নেই। পরবর্তী কয়েক দিনে দেখেছি সব জায়গায় জুতো পরিস্কার করা লোক। কেউ কেউ পুরোনো রঙের প্লাস্টিকের বালতির মত সারি সারি কৌটায় পানি রেখেছে। আমাদের দেশে যেমন ঢাকার রাস্তায় পেশাব গড়িয়ে পড়ে এখানে জুতো ধোয়ার পানি গড়িয়ে পড়ে। আর যার প্রাচুর্য তা হলো ভিক্ষুক। এরা আদর করে আড্ডিস বলে তবে তা জুতো কালি করার রাজধানী বল্লে কোন ভুল হবে না। আমি অনেক দেশে গেছি তবে প্রথমে অবাক হয়েছিলাম আইভোরি কোস্টের রাজধানীতে অসংখ্য জুতো কালি কারক দেখে। তারা সবাই নাবালক ছেলে। এখানে সব বয়সের আছে। এমননি একজন জুতো পরিস্কারকারক ইয়েসু EYASY ২০/২৫ বছর বয়সের এবং GIRMA MENDISTU খদ্দের-এর সাথে পরিচয় হলো। পৃথিবিতে আমার অভিজ্ঞতা মতে এখানেই সবচেয়ে বেশি ঘনত্ব। ভুল ভাংতে সময় লাগেনি এদের সব রাস্তা নোঙরা না। ঢাকার চেয়ে পরিস্কার। তবে জুতো পরিস্কার করার বাতিক আছে। এতে তারা স্বস্তি বোধ করে। জুতা পরিস্কার/কালি করতে ২/৩ বির লাগে প্রতি বির ১৮/১৯ টাকার সমান।
মা্ইক্রো বাসে চেপে বসলাম উদ্দেশ্য ন্যাশনাল মিউজিয়াম পথে এক জনের কাছে জিজ্ঞাসা করালাম অত্যন্ত সহযোগিতার মনোভাব। তার সাথে কিছুদূর বাস স্টান্ডের উদ্দেশ্যে হাটলাম জায়গাটার নাম ‘শোলা’। আমি বললাম আমাদের দেশে শোলা বলতে ‘পানিতে জন্মানো’ এক ধরনের গাছ বোঝায়। সে বল্লো তাদেরও এমন একটা গাছ আছে তার নাম শোলা। যাহোক পথে ভিক্ষুক আর মাইক্রো বাসে যাত্রীর ঠাসাঠাসি দেখে ভাবলাম একাএকা ওঠা ঠিক হবে না। তাই একটু খাতির জমিয়ে বললাম তুমি আমার সাথে গেলে আমি ভাড়া দেব। সে আজ ছুটি নিয়েছে কিন্তু তার এনগেজমেন্ট আছে। তবে সে আমাকে বাস দেখিয়ে দিয়ে বল্লো ‘সিক্সি’ কিলো নেমে মিউমিয়াম পাওয়া যাবে। মাত্র দুই বির ভাড়া গত রাতে বুঝেছি ট্যাক্সতে আমার পেষাবে না। তাই মাইক্রো বাসে গাদাগাদি করে চড়লাম। আমি ড্রাইভারের পাশের সিটে বসলাম। আমাকে ভিন্ন চিড়িয়া দেখে কিছু কৌতুহল দেখালেও পাশেবসা যাত্রী ইংরেজিতে কথা বল্লো এবং ঠিক মত নেমে। হাটতে শুরু করে মিউজিয়াম খুঁজে বের করলাম।
এ পর্যন্ত পাওয়া এনথ্রাপলজিক্যাল তথ্য মতে ইথিওপিয়া এবং কেনিয়া আধুনিক মানুষ উৎপত্তির জায়গা। এখানকার আফার ভ্যালি থেকে বিশ্ব বিখ্যাত তথাকথিত ‘লুসি’-র ১৬ লক্ষ বছরের কঙ্কাল আবিস্কার হয়েছে। এন্থ্রপলজির ভাষায় Ardiopithicus ramidus বলে।
এর পর আসে Australopithecus তারপর Homo erectus সবশেষে আমরা Homo sapiens.
আকসুমের পথে
আড্ডিস থেকে আকসুম আকাশ পথে ৯৪৫ কি.মি., রাস্তায় পাহাড়ি পথে দূরত্ব আরো বেশি। কিছু দিন আগেও বাসে তিন দিনের পথ ছিলো এখন দু’দিনের কিন্তু আমার সে সময় নেই। এরপর নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হয়। মাত্র ক’দিন আগে কেনিয়ার নাইরোবিতে বোমা ফাটিয়ে অনেক মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। পার্শ্ববর্তী দেশ সোমালিয়ার কথা নাই বললাম। এরপর ইরিত্রিয়ার সীমান্তের কাছে আকসুম। তাই on line বিমানে milage দিয়ে করা টিকিট নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। সকাল ০৭.১০ মিনিটে সময়সূচী থাকলেও ১০’৩০ ছাড়া হবে বলে জানানো হলো- আবশেষে ছাড়া হলো ১২.০০ টায়। এখানে দুটি টার্মিনাল, ১ থেকে ছাড়া হয় আভ্যন্তরিন এবং পার্শ্ববর্তী আফ্রিকান দেশের ফ্লাইটগুলো। তার চেয়ে বড় কথা ডোমেস্টিক ফ্লাইটের জন্য কোন ইমিগ্রেশনের দরকার না হলেও সকলকে একই লাইনে ইমিগ্রেশন কাইন্টার হয়ে যেতে হয় সে কারণে ইথিওপিয়ান মহিলাদের ‘কুন্না’ (ছোট ছোট বেনি)র মত যাত্রীজট পাকিয়ে গেছে। আফ্রিকান মেয়েরা চুল দিয়ে ছোট ছোট অসংখ্যা বেনি করে এই বেনিকে ইথিয়পিয়ানরা ‘কুন্না’ বলে বিষয়টি আমার পাশে 13L সিটে বসা পেশায় নার্স Sweet এর কাছ থেকে জানলাম। তার পৈত্রিক নিবাস আকসুম থেকে বাসে এক ঘন্টার পথ Shire তার কাছে জানলাম চুল বাড়ার কারণে প্রতি সপ্তাহে ৫০ বির দিয়ে পার্লার থেকে কুন্না বাঁধে। এতে তার কষ্ট হয় এমনিতে তাকে বেতনের উপর ৩৫% কর দিতে হয়। ইথিওপিয়ার মুদ্রা ‘বির্’ আমাদের প্রায় ৪ টাকার সমান।
উড়ার সাথে সাথে ৫/৬ তলার বহু হাউজিং দেখা গেল। ইথিওপিয়া খরাপিড়ীত দেশ বলে জানি কিন্ত বিমান থেকে সোনালী সবুজ ক্ষেত দেখে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। একবার মনে করলাম হয়তো বর্ষাকাল কিন্তু অক্টোবর মাসের দ্বিতীয় সপ্তা বর্ষা কালের শেষ। মনে পড়লো প্রায় ১০ কোটি লোকের দেশ যদি সবুজ না হয় তবে কি করে খাওয়াবে? যা দেখছি তা কি সত্যি? সোনালী সবুজ ক্ষেত দেখে মনে করেছি যবের ক্ষেত কিন্তু King Ezan-র সমাধি দেখার সময় কাছ থেকে ক্ষেতের ছবি তুলতে গিয়ে মনে হয়েছে ঘাসের চাষ। এদেশে গবাদি পশুর পালন প্রচুর হয়তো তাদের খাদ্যের জন্য পশ্চিম ইউরোপের মত ঘাস চাষ করা হয়েছে। ‘ইনজেরার’ ইতিহাস শুনে সে ভুল ভেঙেছে। কিছুক্ষণ যেতেই একটা কোন রকমে বয়ে যাওয়া ছোপ ছোপ পানির পাহাড়ি খাদওয়ালা নদী চেখে পড়লো। তখনও বুঝতে পারিনি আমি কি দেখেছি। ফেরার দিন গুগল ম্যাপ স্টাডী করে বুঝতে পারলাম এটি সেই বিখ্যাত নীল নদী যার পানি ও পলি দিয়ে ‘কেমেট’ সভ্যতা গড়ে উঠেছে। পাঠক কেমেট মিসরের আসল নাম প্রাচীন কালে ফারাওদের আমলে মিসরকে কেমেট বলে ডাকা হতে। সে আমলে মিসর বল্লে হয়তো পাগল ঠাওরাতো। কেমেট অর্থ কালো মাটির দেশ। এখান থেকে ধুয়ে যাওয়ার রিডিউসড পলিমাটির কালো রঙের জন্য তারা এই নাম দিয়েছিলো। আমরা যাদের জ্ঞানে জ্ঞানী সেই পশ্চিমাদের দেয়া নাম Egypt আর আরবদের দেয়া ‘মিছর’ –কে মিসর বলতে শিখেছি।
ফেরার পথে ‘গন্ডর’ বিমান বন্দর থেকে দক্ষিণ দিকে কয়েক মিনিট উড়ার পর ‘তানা’ লেক থেকে ‘ব্লু নীল’ নদের সৃস্টি হয়ে বড়শির মত ঘুরে সুদানের দিকে চলে যেতে দেখলাম। তানা লেকের ঘোলা পানি বাঙলাদেশের কথা আর একবার স্মরণ করিয়ে দিল। তানা লেকের পাশ দিয়ে আর সোনালী সবুজ নেই, কড়া সবুজ- ধানের ক্ষেত। অবাক হয়ে বিমান থেকে চেয়েছি। ল্যান্ডস্কেপে পানি আর ধানক্ষেত। দুর্ভিরক্ষের দেশে বলে জেনেছি। নিজে না দেখলে বিশ্বাস করতে পারতাম না। সম্ভবত Experiencial Learning এর জন্য নবী বলেছিলেন শিক্ষার জন্য প্রয়োজনে সুদূর চীনে যাও। বলেই ছাড়েননি, নিজের মামা আবু আক্কাসকে ‘ক্যানটন’ (গুয়াংজু) পাঠিয়েছিলেন। যার অনেক হাদিস আমরা পড়ে থাকি। পাঠক এখনও আপনি গোয়াংজু বা পুরানো দিনের ক্যান্টন গিয়ে তার হাতে গড়া মসজিদ ও মাজার দেখতে পারেন।
কিছুক্ষণ পর সুইট নীচের দিকে দৃষ্টি আকর্ষন করে ‘Lalibela’ কে স্মরণ করিয়ে দিলো অপেক্ষাকৃত বেশি পাহাড়ি, লাল মাটি। পাহাড়গুলোর মাথা সমতল, তার উপর ফসলের চাষ। লালিবেলা একসময় রাজধানী ছিলো্। এখানকার পাহাড় কেটে একে একে ছেটেবড়ো ১১ টি গীর্জা করা হয়েছে। এই গীর্জার জন্য পৃথিবী বিখ্যাত। ফেরার সময় আকসুম থেকে আড্ডিসে সরারসরি ফ্লাইটের প্রস্তাব দিলেও ইচ্ছা করে এখানে স্টপ ওভার নিয়েছি। সময়ের অভাব তা্ই নিচেয় নেমে দেখার সুযোগ নেই। দুধের সাধ ঘোলে মেটানোও না। সবচেয়ে বিখ্যাতটি —। এখানকার তৎকালীন রাজার সাথে সিপাহসালা সালাউদ্দিনের সৎভাব ছিলো তিনি এদেশের খৃস্টানদের থাকার জন্য জেররুজালেমে অতিরিক্ত স্থান করে দিয়ে ছিলেন। হয়তো মুসলমানদের দখলে জেরুজালেম তাই শান্তি না পেয়ে লালিবেলাকে জেরুজালেমের বিকল্প হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। একটি খাল কেটে জর্ডন নদীর রেপ্লিকা করতে চেয়েছিলেন। সেদিন কেউ মনোযোগ না দিলেও আজ ১০০০ বছর পরে বহু ইউরোপিয় পর্যটক ধর্মীয় আবেগে তাড়িত হয়ে জীবনের সায়াহ্নে সেখানে যান।
এক ঘন্টা দশ মিনিটে আকসুম এসে পৌছে দেখলাম মানুষ তার কাজ সুশৃঙ্খল করার কত না অিভনব পন্থা বের করেছে। যাত্রী বিমান টামিনালের ভিতর দিয়ে বের হওয়ার সময় বিরক্ত বা অসুবিধা সৃষ্টি না করে সুশৃঙ্খলভাবে দৃষ্টি আকর্ষণার জন্য এয়ারপোর্টে কাঠের ছোট ছোট খোপের মধ্য থেকে হোটেলের নাম লেখা কাঠের ব্যানার নাড়াচ্ছে মাঝে মাঝে উঁকি দিয়ে দেখছে কেউ সাড়া দিচ্ছে কি না। গর্তের ভিতরে ইদুরের বার বার ঢুকে যাওয়া আর বের হওয়ার মত।
বিমান বন্দর থেকে বেরিয়ে Yeha হেটেলে যাওয়ার ফ্রি সাটল সার্ভিস খুঁজছি। পাছে অস্বাভাবিক ভাড়া চায় তাই ফ্রি কি না আবারও জিজ্ঞাসা করে নিলাম। আরো অন্যান্য হোটেলের বর্ডারদেরকে একই গাড়ীতে নেয়া হলো। পরে বুঝতে পারলাম এটি ফ্রি সার্ভিস দেয়ার মাধ্যমে খদ্দের খুঁজে নেয়ার কৌশল। পাহাড়ের মাথার উপর সুন্দর বেসকারী পরিচালনায় সরকারি হোটেল। এখান থেকে উত্তরের স্টীলা ফিল্ড এবং ‘আর্ক অব কোভেনেন্ট’ রাখা সেন্ট মেরী গীর্জা এই পাহাড়ের পাদদেশে পাঁচ মিনিট হেটে পৌঁছানো যায়। হোটেলটির ডাইনিং খোলামেলা এর পিছন হতে স্টিলা ফিল্ড দেখা ও ফটো তোলার ভালো ব্যবস্থা।
স্টীলা ফিল্ড মূলত এটি একটি কবরখানা এখানে একক পাথরের স্তম্ভ হাজার হাজার বছর আগের স্মৃতি বহন করে চলেছে। সবচেয়ে পুরোনোগুলে এবড়ো থেবেড়্। কে কবে স্থাপন করেছে কেউ বলতে পারে না। পৃথিবীর অমোঘ নিওম মানুষ মরণশীল এই নিওমে ব্যত্যায় না ঘটাতে পেরে স্থায়ী পাথর গ্রানাইটের স্তম্ভের মাধ্যমে মানুষের উপস্থিতিকে স্থায়ীত্ব দিতে চেয়েছে। এই কবর সৌধ পৃথিবীর সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ আকর্ষনে পরিণত হয়েছে, মিসরের পিরামিড, চিনের মিং রাজাদের কবর উদহরণ হিসেবে বলা যায়।
Yeha হোটেলে পৌঁছে বিকেলের সময়টা কাজে লাগানোর জন্য King Kaleb সৌধের দিকে হাটতে শুরু করলাম। বড়জোর তিন কিলোমিটার পাহাড়ের উৎরাই রাস্তা। রাস্তা দিয়ে বর্ষার ঢলে সাথে নেমে আসা গ্রানা্ইটের অমসৃণ নূড়িতে আচ্ছাদিত। ইউরোপিয়ানরা জিপে করে পাশ কাটিয়ে চলে গেল রাস্তার অবস্থা দেখে হেটে যাওয়াই ভালো মনে হলো। আমি হরতালের দিনে মিরপুর ফুটপাথ থেকে কেনা চেক পাজামা, বেজিং মার্কেট থেকে কেনা ডিজেলের কেডস্, আবুজা-র হ্যান্ডিক্রাফ্ট মার্কেট থেকে কেনা জংগল হরিনের (বুশ বাকের) টুপি মাথায় দিয়ে হাটতে শুরু করলাম। কিছুদুর যাওয়ার পর রাস্তার গায়ে একটু নীচুতে ১০ প্রস্থ ও ১৫ ফুটের মত দৌঘ্যের একটা পাথরের কুড়ে ঘর দেখে জিজ্ঞেস করে জানালাম King Ezana যুদ্ধ জয়ের পর সাবিয়ান-গ্রীক-টাইগ্রিনো এই তিন ভাষায় বিজয়কে অমর করে রেখেছিলেন। মনে পড়ে গেল ইরান দারিউসের ‘বিহিস্তুন’। আর মিসরের ‘রোজেটা’ পাথরে লেখার কথা যার জন্য হা্ইরোগ্লিফ পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। আমাকে জানানো হলে টিকিট না দেখালে দেখানে যাবে না। দরজা খোলা এমনিতে দেখা যাচ্ছে তবে আমি ছবি নিতে চাই। এছাড়া পরবর্তী স্থানগুলেতে লাগবে। তারা জানালো টুরিষ্ট ইনফরমেশন অফিস থেকে টিকিট আনতে হবে। মাত্র ৫ মিনিটের উৎরাই রাস্তা, তারা নিজেরাই বল্লো টিকিট এনে দিতে পারে তবে ৫০ বির টিকিট, আনার জন্য আরো ৫০ বির দিতে হবে। সময় ক্ষেপন চিন্তা করে ৩০ বির-এ ঠিক করলাম তবে সে নিজের বিরে টিকিট কেটে আমাকে রাজা ‘কালেব’এর কবরে খুজে বের করবে। আমি হাটতে থাকলাম সে ঠিক্ই হাজির হয়ে গেল। কেউ আমার কাছে টিকিট চায়নি যার আকর্যনে এসেছি সেই সাবিয়ান রানীর ভিটা ছাড়া। পরে দেখেছি অফিস খুঁজতে গেলেও সময় অনেক চলে যেত।
কালেবের কবর পাহাড়ের চুড়ায় টিনের শেড দিয়ে বর্ষা ঠেকানো হয়েছে। কবরের আর্কিটেক্চার আনেকটা চিনের মিং সম্রাটদের কবরের মত, মিসরিয় ফারাওদের পিরামিডের ভিতরের মত তবে পাথরের কাজ তাদের চেয়ে অনেক নিন্ম মানের। তাদের অর্থ বৈভবের কারণে এ্ই গুনগত পার্থক্য পারে। তবে হাজার হাজার মাইল দূরের সময়ের পার্থক্যের মানুষের চিন্তা চেতনা পার্থক্যে কিভাবে ঐক্য হতে পারে তহা না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। কিং কালেবের নাম না জানলেও বাংলাদেশী কেন পৃথিবীর সব মুসলমানরা ‘সুরা ফিল’ এর বদৌলতে তার সেনাধ্যক্ষ আবরাহা-কে কে না জানে। তৎকালে মা’রিব(ইয়েমেনের)এর ইহুদি রাজা Dhu Nuwas কে শায়েস্তা করার জন্য কালেব লোহিত সাগর পাড়ি দিয়ে আবরাহা বাহিনীকে পাঠিয়েছিলো। Dhu Nuwas ঘোড়াসহ লোহিত সাগরে স্বেচ্ছা সলিল সমাধি বরণ করেন। এরপর শৃরু ইহুদি নিধন। খৃস্টান রাজা আবরাহার রাজত্ব শেষ হয় সুরা ফিলে-র মধ্য দিয়ে। Dhu Nuwas ইহুদি হত্যার প্রতিশোধ হিসেবে তৎকালীন Najran বর্তমান সৌদি আরবের Al-Ukhdud শহরের বিশ হাজার খৃস্টান হত্যা করে। বিশপ ‘সাইমনের লেখা চিঠি এবং সুরা আল বুরুজ আয়াত ৪ তার সাক্ষর বহন করে চলেছে। হত্যার জন্য পারস্যের সম্রাট কোবাদ-১ কে প্ররোচিত করে কালেবকে উত্তোজিত করেছিলেন।
কিং কালেবের সমাধি দেখার পর দক্ষিনের স্টিলা ফিল্ডের দিকে ছুটলাম। শহরের দক্ষিণ প্রান্তে স্টিলা ফিল্ড তবে জনবসতি দ্রুত সে দিকে অগ্রসর হচ্ছে। দক্ষিণমুখী হলে বা-হাতে স্টীলা ফিল্ড ডান হাতে সাবিয়ান রাণীর বাড়ীর অবশিষ্ট অংশ চোখে পড়ে। মাঝদিয়ে পাকা রাস্তা উত্তর-দক্ষিণে চলে গেছে। ১৯৪১ থেকে ৪৫ সাল পর্যন্ত ইটালিয়ানদের দখলের সময় রাস্তা এই করা হয়ে ছিলো। রাস্তা করার সময় আরো কত স্টীলা বা পুরাকৃত্তি ধ্বংস করা হয়েছে তা আমাদের জানা নেই। বাড়ীঘর করার জন্য স্টিলা ফিল্ডের পাথর পূনব্যবহার করা হয়েছে তারও কোন হিসাব নেই। বিশাল এই কবরখানায় শত শত বছর ধরে মানুষকে সমাধিস্থ করা হয়েছে। হাজার বছরে ক্ষয়ে যাওয়া এবড়ো থেবড়ো গায়ের অনেকগুলো ছোট ছোট স্টীলা কালের সাক্ষী হিসেবে খাড়া হয়ে আছে। আমরা জানিনা এখানে কে শুয়ে আছেন। এখন সেখানে (স্টীলা ফিল্ডে) ‘টাফে’ চাষ হচ্ছে, সারি সারি কেটে রাখা ফসলের আটিঁ। সেখানে বড় একটা স্টীলা ভেঙে পড়ে আছে। কত স্টীলা না জানি অতীতে বাড়ী ঘর করার জন্য এখান থেকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। আমার গাইড বল্লো এলাকার লোকের বিশ্বাস ভেঙে পড়া বড় এই স্টিলার গোড়ায় সাবিয়ান রাণীর কবর।
পশ্চিম দিকে রাস্তার আপর পারে রানীর বাড়ীর বিভিন্ন অংশ ঘুরে ঘুরে দেখলোম। একমাত্র এখানে টিকিট চাওয়া হলো। যারা টিকিট চাইলো তাদেরকে সরকারি মনে হলো। অনেকে বলেন এখন যে বাড়ীর ধ্বংশবশেষ দেখা যায় তা সাবিয়ান রাণীর বাড়ী না, অনেক পরের শাসকদের।
যাহোক কয়েক বছরে আক্সুমের সভ্যতা গড়ে ওঠেনি। আক্সুমের আগের সভ্যতা কেমন ছিলো সেটা দেখার জন্য ইচ্ছাটা মাথাচাড়া দিলো। তাই জীপে রওনা হলাম। আক্সুম এর আগের সময়কার সভ্যতার রাজধানী Yeh আক্সুম থেকে ৫৬ কি.মি. উত্তর-পূর্বে। যাওয়ার পথে –পাহাড়টি পড়লো। ইথিপিয়ানদের কাছে এর গুরুত্ব খুব বেশি। এখানে হাজার হাজার ইটালিয়ান সেনা যুদ্ধে নিহত হয়েছিলো। ইথিওপিয়া কখনও কলোনী হয়নি তবে ৪ বছর ইটালিয়ানরা দখল করে রেখেছিলো। ইথিওপিয়া আর্মেনিয়ার পর পৃথিবীর দ্বিতীয় রাস্ট্র যারা প্রথম রাষ্ট্র ধর্ম হিসেবে খৃস্টান ধর্ম গ্রহণ করেছে। সে কারণে হয়তো পশ্চিমা বিশ্ব দখল করেনি। ইংরেজরা ইটালিয়ানদের তাড়ানোর ব্যাপারে সাহায্য করেছে, তারা ঘাটিও গেড়েছে তবে দখল করেনি। মুসলমান –পরাজিত করার জন্য পর্তুগীজরা সাহায্য করেছে তবে দখল করেনি। একই কারণে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মিত্রশক্তি রোমে কোন বোমা ফেলেনি। সেই সভ্যতার নিদর্শন হিসেবে থাকার মধ্যে একটা মন্দিরের ধ্বংশবশেষ ৬০০ খৃস্টাব্দের একটা গির্জার কম্পাউন্ডে। সেই মন্দিরের শৈলী দেখতে চাই। দেব পুজারী আক্সুমাইটদের পরাজিত করার পর খৃস্টান রাস্ট্র এদের মন্দির দখল করে একই কম্পাউন্ডে গীর্জা নির্মান করে। মন্দীরের ধ্বংসাবশেষরে মধ্যে দেয়ালগুলে কোন মতে টিকে আছে। খারাপ কাজ সময়ের বিবর্তনে ভালো ফলদেয়। মন্দিরের কারুকাজ করা পাথর গীর্জার দেয়ালে শোভা পাওয়ায় আমরা দেখতে পাচ্ছি।
সকাল ৫ টায় আবিকল আজানের মত আহবান শোনা গেল; এরপর হাজার হাজার মানুষের ঢল। মহিলাদের সংখ্যা বেশী, এদের মাথা-বুক সাদা পাতলা চাদরে ঢাকা। আমাদের দেশে নামাজের পর যেমন দোয়া-দুরুদ পড়ে এমনইভাবে (এখন অপ্রচলিত প্রচীন গে-এজ ভাষায়) মাইকে পড়া হয়। আড্ডিসে আমি ভুল করে মনে করেছিলাম মসজিদ থেকে এ্ই শব্দ ভেষে আসছে, মেয়েরা মুসলমান আসলে তা না। আকসুম শহরে ৫৭০০০ মানুষের বাস এদের ৮৫ ভাগ খুস্টান। শহরের অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্করা এবং ইথিয়পিয়ার অন্যন্য জায়গা থেকে আসা পর্যটক সকালে এখানে আসে পবিত্র এই গির্জার প্রার্থনায় অংশ গ্রহনণর জন্য। বেশি আকর্ষণ আর্ক অব কোভেনেন্ট। এখন ইহুদি-খৃস্টান গলাগলি, ঐতিহ্য বড়। আদ্দিসেও আমি একই বিষয় লক্ষ্য করে ভূলে মুসলমান ভেবেছিলাম। আমি মুসলমান তাই ভয়ে ভয়ে গীর্জার কম্পউন্ডে গিয়ে সবগুলো দেখলাম। কেউ আমাকে কিছু জিজ্ঞাসা করেনি। আড্ডিস হেটেলে যা বলেছিলো এখানে কোন ছিনতাইকারী আছে বলে মনে হয় না তবে বিস্তর ভিক্ষুক। এত বেশি রোগা-পটকা মানুষ বিশেষত মেয়েদের আর কোথাও দেখিনি। চোখের সাদা অংশ ঠিক সাদা না নানা দাগে ভরপুর, দেখলে মনে হবে অসুস্থ্য। একই চিত্র আমি ভারতের গুজরাট (গুজরাট ধনী প্রদেশের একটি) এলাকায় দেখেছি। ভিক্ষুদের ফটো তুলার সময় লক্ষ্য করলাম তার পাত্রে মাত্র কয়েকটি ভোট্টার দানা, কারও পাত্রে কয়েকটি জোয়ার জাতীয় শস্য বীজের দানা। আমাদের দেশে এক মুঠোর কম ভিক্ষা দিলে ভিক্ষুকরা সম্ভবত গালি দিবে কিন্তু এখানে কেউ কেউ এক-দুটি দানা দিচ্ছে। কোন অসন্তুষ্টির লক্ষণ নেই।
খাদ্য:
এদের খুব প্রিয় খাদ্য ‘ইনজেরা’। এক ধরেনর স্পন্জের মত টক রুটি। দেখতে ছাগলের ভুড়ির ভিতরের অংশের মত ফাক ফাক। এর সাথে মাংস, ডাল বা সব্জি দিয়ে খায়। খেতে বেশ সুস্বাদু, আমি কোন দেশে গেলে সেই দেশের খাবার খাওয়া অভিজ্ঞতা নিতে পছন্দ করি।কোথাও ভালো লাগে কোথা্ও লাগে না। ইনজেরার ক্ষেত্র ভিন্ন ইনজেরাকে ভালো বেসে ফেলেছি। এক ধরণের বলতে পারেন শরিষার বিজের চেয়ে ছোট কফি রঙের ‘টেফ’ ঘাসের বীজ থেকে তৈরি করা হয়। দেশে খাদ্যশস্যের এক চতুর্থংশ আসে টেফ চাষ থেকে। বিমান থেকে খুব আকর্ষনীয় হলুদাভ সবুজ ক্ষেত দেখতে অত্যন্ত মনোরম। প্রায় ২০০০ ফুট ইচচতায় ভালো জন্মে। পাহাড়ী দেশ তাই মানুষ এই চাষ আবিস্কার করেছে বৈজ্ঞানিক নাম Eragrostis tef মনে করা হয় মিশরের বুনো ঘাস E. pilosa এর পূর্বপুরুষ।




