ভোট দেওয়ার পদ্ধতি আবিষ্কার একদিনে হয়নি। একজন শাসকের জোর করে গাদিতে থাকা, যখন যা ইচ্ছে তাই করা, আর্থিক স্বেচ্ছাচারিতা, যৌনতা ইত্যাদি কারণে পৃথিবীতে অনেক বিপ্লব হয়েছে। অনেক মানুষের প্রাণ গেছে। শেষমেশ শাসিত’র মতামতের ভিত্তিতে শাসন করা বা শাসিত হওয়ার পক্ষে মতামত দিয়েছে। আজকের গণতন্ত্র এই জায়গায় এসেছে। এজন্য অনেকের ত্যাগ-তিতিক্ষা আছে।
আমি তখন গোপালগঞ্জ জেলা পরিষদের ডাক বাংলোয় থাকি। তখন ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন হলো। একটা উপজেলায় নির্বাচন নিয়ে মামলা হলো। অভিযোগ সঠিকভাবে ব্যালট গোনা হয়নি। অভিযোগকারী পক্ষ বিচারকের সাথে বোঝাপড়া করেছে ব্যালট বস্তা ঠিকই সিলগালা করা থাকবে। কিন্তু পিছনের সেলাই খুলে শিল দেয়া ব্যালট বের করে ব্যালট ছাপিয়ে পুনরায় মামলাকারী পক্ষে সীল ঢুকিয়ে দেওয়া হবে। এরপর পুনরায় সেলাই করে রাখা হবে। মামলায় আদেশ হবে অভি পক্ষ মিলে ব্যালট গুলো গুনবে। অবশেষে বিচারক এবং পক্ষে হিসাব মতে বিচারক রায় দেবেন। আমি সবে কাটাতে ঢুকে এ বিষয়টা এর নায়কদের কাছে শিখেছি। মনে হতে পারে খারাপ জেনে শেখা উচিত নয়। আমি ভিন্ন মনে করি সাথে পৃথক করার জন্য জানা উচিত।
1986 সাল সংসদ সদস্য নির্বাচন আসলো, আমি তখন কর্ণিপাড়া উপজেলা ম্যাজিস্ট্রেট। ভোট চলছে বিকালের দিকে শুনলাম শেখ হাসিনা শেখ রেহানা শেখ সেলিম এদের সবার ভোট দেয়া হয়েছে। এর কেউই আগেও টুঙ্গিপাড়ায় ভোট দিতে আসেনি কিন্তু ভোট কাস্ট হয়েছে। এদের কেউ একজন ব্রিটিশ হাইকমিশন এবং আমেরিকান দূতাবাসে বিষয়টি জানিয়ে দিয়েছে। আমার কাছে কয়েকজন স্থানীয় জিজ্ঞাসা করল আসলে ঘটনা সত্যি কিনা। ভোট দেয়া হয়েছে কিনা কিংবা দূতাবাসে যোগাযোগ করা হয়েছে কিনা কোনটাই আমার জানা ছিল না। সন্ধ্যার দিকে এক পর্যায়ে জেলা প্রশাসক আমাকে খোঁজাখুঁজি করছেন। খবর পেয়ে গেছি ভোট কেটে বাক্সে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। কাটাকাটির কারণে অন্যান্য কেন্দ্রে অনেক বেশি সংখ্যক ভোট হয়েছে। কিছু ব্যালট ফেলে দিয়ে কমাতে হবে। কারণ টুংগীপাড়া স্পর্শ কাতর জায়গা। আরো জানলাম যে সব নামী দামী মানুষ টুঙ্গিপাড়ায় নেই অথচ ভোট দেয়া হয়ে গেছে। তাদের নতুন করে ছাপানো ব্যালট পাঠানো হয়েছে সেগুলো অবিকল রেখে ভোটগুলো গায়েব করে দিতে হবে। ছাত্রত্বের গন্ধ এখনো গা থেকে যায়নি। বিপ্লবী বিদ্রোহি মনোভাব তখনও আছে অগত্য সহকারী কমিশনার ফিরোজ সাহেবের বাসায় পালিয়ে থাকলাম। জেলা প্রশাসক ওসি সাহেবকে দিয়ে আমাকে খুঁজে হয়রান। আমাকে না পেয়ে অন্যকে দিয়ে কাজ হাসিল করেছে। আজ না হয় তার কথা নাই বললাম। আমাকে আর কাজটা করতে হলো না। তবে গঞ্জনা সইতে হয়েছে কিছুদিন। তার পর সব ঠিক ঠাক হয়েছে। অতি উৎসাহী হয়ে আমি ভোট কেটে কৃতিত্ব নিতে পারতাম। তা নেইনি তাই বিবেক টা এখনো পরিস্কার। এরকম কাজ অনেকে করেছে আবার গাছের পক্ষের লোক হয়ে গেছে। সেকথাও আজ বলতে বসিনি। সবাই বলে করতে হলে বাধ্য হয়ে অন্যায় করতে হয়। এড়ানোর কোন উপায় নেই। আমি মনে করি ঠিক না। উপায় আছে। তবে নিঃসন্দেহে আপনার কে ঝুঁকি নিতে হবে। যোগ্যতা থাকলে চাকরির ভয় নেই। অনেকে অন্যায় করতে বলতে হয় না। পরিবেশ থেকে শেখে। নিজের মনে একটা ধারণা সৃষ্টি করে নেয়।
ঠিক ঐ সময় একজন নবীন বিসিএস কর্মকর্তার প্রিজাইডিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পড়ল। তাকে জিজ্ঞাসা করলাম আপনার ওখানে কেমন ভোট পড়েছে। সে বলল খুব ভালো লোক এসে লাইন দিয়েছিল। আমি খোঁজ নিয়ে জেনেছি ভোট কেটে ঢুকানো হয়েছে। তাকে কেউ ভোট কাটতে বলে নি কেন্দ্র নিজেকে অনুমান করে বলা ছাড়াই কাজটা সেরেছে। এসব কাজ করে অনেকের উন্নতি করেছে প্রমোশন পেয়ে মস্ত বড় অফিসার হয়েছে।কিন্তু মনে শান্তি নাই।
এক সময়ে ঢাকার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক রাজস্ব ছিলাম। এমন হয় ইউনিয়ন পরিষদের ভোট আসলো। ভোটের সময় দায়িত্ব পেলাম। ধামরাইয়ের একটি ইউনিয়ন পরিষদে একটি সংস্থার একজন ঠিকাদার ইউনিয়ন চেয়ারম্যান প্রার্থী হয়েছেন। আর্থিক দিক থেকে তিনি শক্তিশালী। তিনি আমাকে অনেকটা চ্যালেঞ্জ দিয়ে বললেন আপনি আমার ভোট কেনা ঠেকাতে পারবেন না। আমার ধারণা ছিল ভোট অনেকেই কেনে কিন্তু কেনা ভোটারদের সবাই ইপ্সিত মার্কায় ভোট দেয় না। তাকে ঘৃণা করে তার থেকে দূরে থাকতে পারতাম। কিন্তু তা করিনি, শিখতে চেয়েছি। তাই তার সাথে আলোচনা করলাম, জানতে চাইলাম কি করে কাজটি করবেন ? সে বলল, যাদেরকে টাকা দিয়ে ভোট কিনবে তাদেরকে বলবে তারা যেন ব্যালটে সিল দিয়ে লুকিয়ে ফেরত নিয়ে আসেন। প্রিজাইডিং অফিসারের সামনে একটা ভাঁজ করা কাগজ নিয়ে যাবে এবং ব্যালট বাক্সে তার সামনে ঢুকিয়ে দেবে। শিল দেওয়া ফেরত আনা কয়েকটি ব্যালট বিশ্বস্ত লোক ভোট দেওয়ার সময় ব্যালট বাক্সে ফেলে আসবে। কয়টি কাগজ ফেলল পুরু না পাতলা তা কেউ দেখেনা। আবার শিখলাম, কিন্তু এই শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে ভোট কেনা বন্ধ করা খুবই কঠিন মনে হল। নজর রাখতে বললাম কিন্তু ভোট গণনার সময় ঠিকই কিছু সাদা কাগজ সিলা দেয়া ব্যালটের সাথে পেলাম। বিষয়টা বুঝতে বাকি রইল না। কিভাবে বন্ধ করা যায় ?







