ভূমিকা
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নতুন নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করে ও শিক্ষার্থীদের মাঝে ছড়িয়ে দেয়। কিন্তু জ্ঞান-সৃষ্টি ও বিতরণের নতুন নতুন আবিষ্কারের সাথে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তাল মেলাতে পারে না। একসময় এর পার্থক্য বেশ বড় আকারে দেখা দেয়। এই ফারাক কমিয়ে আনার জন্য সংস্কারের প্রয়োজন হয়। নতুন যেকোনো বিষয়ে অনিশ্চয়তা’ থাকে। সংস্কার এর ব্যতিক্রম না। সংস্কার কোন কোন সময় বেদনাদায়ক। সংস্কারে একটি প্রতিষ্ঠিত গোষ্ঠীকে সবসময় ক্ষতিগ্রস্ত করে। সংস্কারে বাধা আসা, বিরোধিতা করাই স্বাভাবিক। তবে দেখা গেছে শতকরা ২০ ভাগ মানুষ সংস্কারের পক্ষে থাকে, শতকরা ৩০ ভাগ সংস্কার তাদের জন্য উপকারী হলেও বিরোধিতা করে। শতকরা ৫০ ভাগ মাঝামাঝি অবস্থান করে। তারা উদাসীন থাকে তবে সংস্কার কোন উপকার বয়ে আনলে অংশ দাবি করেন। তাই যারা সংস্কার করতে চান তাদেরকে চরম বিরোধিতাকারী ৩০ ভাগকে নমনীয় করে ৫০ ভাগের দলে আনতে হবে। মাঝামাঝি অবস্থানকারী ৫০ ভাগ হতে সমর্থনকারী ২০ ভাগের দিকে ধাবিত করাতে হবে। তবেই সংস্কার সহজ হবে। সংস্কারের বিরোধিতা করা একটি স্বাভাবিক নিয়ম বলেই মেনে নিতে হবে। সংস্কার শুরু করলে প্রথমে এদিকে কেউ নজর নাও দিতে পারে। এরপর উপহাস কিংবা সমালোচনা করে থাকে। তারপর নানাভাবে বাধা দিতে শুরু করে। এই বাধা স্বাভাবিক ধরে নিয়ে অতিক্রম করাই সফল সংস্কারকের উদ্দেশ্য। অনেকটা রাজপথে স্লোগানের মত-“বাধা দিলে বাঁধবে লড়াই, সে লড়াইয়ে জিততে হবে”।
যাহোক মাধ্যমিক শিক্ষা সংস্কারের কয়েকটি বিষয় তুলে ধরা হলো:
প্রতিটি শিশুকে স্কুলে আনা:
২০১৮ সালে মাধ্যমিক স্কুলে ভর্তির হার শতকরা ৭০ জন। এবং ঝরে পড়ার হার শতকরা ৩৭। প্রকৃত হিসাবে ৩৩ জন টিকে থাকে। কলেজের দোরগোড়া পেরিয়ে মাত্র ১৬ উচ্চশিক্ষার স্তরে পৌঁছে। আশার বিষয় এই হার ক্রমেই বাড়ছে তবে কিছু সংস্কার মাধ্যমে এই হার নাটকীয় বাড়ানো সম্ভব।
ক) প্রথমত: প্রাথমিক শিক্ষা আইন সংশোধন করে মাধ্যমিক শিক্ষা পর্যন্ত বাধ্যতামূলক করা যায়। প্রাথমিক শিক্ষা আইন সংশোধন করাসহ অন্যান্য পদক্ষেপ নেয়ার জন্য ভিন্নভাবে সক্ষম ছাড়া প্রাথমিক স্কুলে ভর্তির হার শতকরা ১০০ ভাগ। এই আইন সংশোধন হলে সরকারের ওপর যেমনি দায়িত্ব বর্তাবে তেমনি অভিভাবকদের উপর বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি হবে। স্কুল কর্তৃপক্ষ নড়েচড়ে বসবে। আইন সংশোধনের একটা সুদূর প্রসারী ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে। বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের মর্যাদা আরো উন্নত হবে।
খ) দ্বিতীয়তঃ স্কুলের ভৌত অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে স্কুল শিক্ষার্থীদের জন্য আকর্ষণীয় করা যেতে পারে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা বাড়ির চাইতে স্কুলে অবস্থান করা পছন্দ করবে। শিক্ষার্থীরা মার্কেটে যাওয়ার এবং ঘোরাফেরা করা স্কুলে আসার চেয়ে বেশি পছন্দনীয়। এই বিষয়টি মাথায় রেখে ভৌত অবকাঠামো এবং সুযোগ-সুবিধার সৃষ্টি করা প্রয়োজন।
গ্) তৃতীয়তঃ শিশুদের খাবারের ব্যবস্থা করে স্কুলে বেশিক্ষণ অবস্থান করানো যায়। শিশুদের শরীর দ্রুত বর্ধনশীল তাই প্রাপ্ত বয়স্কদের তুলনায় ঘনঘন খেতে হয়। শরীরের বৃদ্ধি সাধনের জন্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সঞ্চালন দরকার হয়। এখনো মাধ্যমিক পর্যায়ের স্কুলে সবার জন্যও দুপুরে খাবারের ব্যবস্থা করা যায়নি। তবে আগামী পাঁচ বছরে সকল স্কুলে দুপুরের খাবার ব্যবস্থা করার সরকারি সিদ্ধান্ত আছে।
অভিভাবকদের গাফিলতি, দারিদ্রতা, সময়ের অভাব, তদারকির অভাব ইত্যাদি কারণে শিশুরা না খেয়ে স্কুলে আসে। আমি স্কুলে গিয়ে শিশুদেরকে জিজ্ঞেস করেছি “তোমাদের মধ্যে কে কে সময়াভাবে সকালে না খেয়ে এসেছো”। ঢাকা মহানগরীর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ হাত উচু করে। সাধারণভাবে আমাদের অভিজ্ঞতা এটা অসম্ভব মনে হলেও এটি সত্য এবং নিজের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে লিখছি। খাবার অভাবে না খেয়ে এসেছ এমন প্রশ্ন করা হলে হাত উঁচু করে না। হয়তো অপমান বোধ থেকেই নিজেদেরকে লুকিয়ে রাখতে চায়।
দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করে এসব শিশুদেরকে স্কুলে রাখা এবং আকর্ষণীয় করা সম্ভব।
সাধারণ থেকে কারিগরি শিক্ষা:
২০১৮ সালে শতকরা ১৩ ভাগ শিশু কারিগরি শিক্ষার জন্য ভর্তি হয়। এই হার singapore, japan, switzerland, জার্মানিসহ যেসব দেশে বেকারত্বের হার কম সেসব দেশের শতকরা ৬০ ভাগের উপরে। ষাট ভাগে উন্নীত করতে হলে আমাদের প্রতিটি উপজেলায় পলিটেকনিক করতে হবে। শুধু সিভিল, ইলেকট্রিক্যাল, ইলেকট্রনিক, মেকানিক্যাল গ্রেডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। উপজেলা ভিত্তিক পলিটেকনিক স্থাপন করে সেই এলাকার জন্য উপযুক্ত ট্রেড নির্বাচন করতে হবে। আমি শিক্ষা সচিব থাকাকালীন প্রতিটি উপজেলার জন্য একটি করে পলিটেকনিক করার জন্য কাজ করলেও ঊর্ধ্বতনের সম্মতি না পাওয়ায় প্রতিটি উপজেলায় একটি করে টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ সৃষ্টির জন্য ১৭ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করে পরিকল্পনা কমিশনে জমা দিয়ে অবসরে গেছি।
এসব প্রতিষ্ঠানকে চালু করতে হলে শিক্ষক তৈরীর জন্য প্রকল্প হাতে নিতে হবে। বর্তমানে কারিগরি শিক্ষাকে গরিবের শিক্ষা হিসেবে বিবেচিত হয়। এই ধারণা পাল্টানোর জন্য মিডিয়া ক্যাম্পেইন করতে হবে।
বর্তমানে ৪৯টি পলিটেকনিক ক্যাম্পাসে যে জমি আছে সেখানে নতুন ভবন এবং ওয়ার্কশপ করে ধারণক্ষমতা বহুগুণে বাড়ানো সম্ভব। আমি শিক্ষা সচিব থাকাকালীন আরো এক লক্ষ শিক্ষার্থীকে কারিগরি বিষয়ে পড়ার জন্য বর্তমানের পলিটেকনিক গুলোর ধারণক্ষমতার জন্য একটি প্রকল্প তৈরি করেছিলাম আমি আসার পর পরিকল্পনা কমিশনে অনুমোদিত হয়েছে।
উদ্যোক্তা সৃষ্টির লক্ষ্যস্থির:
শত শত বছর শিক্ষার লক্ষ্য চাকরি এই ধারণা শিক্ষালয়ে দেয়া হয়ে থাকে। কিন্তু সকল শিক্ষার্থীকে ভবিষ্যতে চাকরি দেয়া সম্ভব না। অপরপক্ষে, সকল শিক্ষার্থী উদ্যোক্তা হতে পারে। উদ্যোক্তা হলে উদ্ভাবনী বুদ্ধিবৃত্তির চর্চার ক্ষেত্র সৃষ্টি হয়। তাই প্রতিটি শিক্ষালয়ে শিক্ষার্থীদেরকে উদ্যোক্তা হতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। সেজন্য শিক্ষকদেরকে সর্বাগ্রে বিষয়টি উপলব্ধি করাতে হবে। সরকার থেকে এর স্বপক্ষে সহায়ক policy এবং অ্যাকশন প্ল্যান করে তদনুযায়ী প্রকল্প তৈরি করতে হবে।
এরূপ আরো অনেক নতুন নতুন চিন্তার বাস্তবায়ন করে কারিগরি শিক্ষার হার ও মান উভয় বাড়ানো যায়।
টেকসই উন্নয়নের জন্য শিক্ষা :
আমরা যত বেশি শিক্ষিত হই তত বেশি বিচিত্র জীবজন্তু উদ্ভিদ ভক্ষণ করি। যত বেশি শিক্ষিত হয় তত বেশি আবর্জনা তৈরি করি। যত বেশি শিক্ষিত হই তত বেশি packaging material ব্যবহার করি। যত বেশি শিক্ষিত হই তত বেশি দূর-দূরান্ত থেকে জিনিসপত্র পরিবহনের মাধ্যমে এনে ব্যবহার করি। যত বেশি শিক্ষিত হই ততো বেশি CO2 বের করি। আমরা এক ঘন্টা প্লেনে চড়ে যে পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড বের করি কৃষক সারা বছর সেই পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড বের করে না। আমরা যত বেশি শিক্ষিত হই তত বেশি দৃষ্টিনন্দন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আকর্ষণে ছুটে যাই, এক সময় তা’ নষ্ট বা ধ্বংস হয়ে যায়।
তাই বলে কি আমরা শিক্ষিত হব না? আমাদের lifestyle কে উৎসর্গ করবো ?
শিক্ষার মাধ্যমে আমরা আমাদের সম্পদ এমনভাবে ব্যবহার করব যে আমরা ব্যবহার করার পরও পরবর্তী প্রজন্মপরম্পরা ব্যবহার করতে পারবে। এই শিক্ষাই টেকসই উন্নয়নের জন্য শিক্ষা। এজন্য গবেষণা এবং ফলাফলের বিস্তরণ ঘটাতে হবে।
মানসম্মত শিক্ষা :
সময়ের সাথে মানসম্মত শিক্ষার প্যারাডাইম শিফট হয়। বর্তমান প্রেক্ষাপটে:
1. Logical thinking
2. Critical thinking
3. Creativity
4. Co-creation
5. Crowdsourcing
6. Team Spirit
7. Analytical capability
8. Leadership quality
ইত্যাদি যোগ্যতা ও দক্ষতা শিক্ষার্থীদের মাঝে প্রোথিত করা প্রয়োজন। এসবই মানসম্মত শিক্ষার প্রয়োজনীয় উপাদান। বর্তমানের কারিগরি শিক্ষার একটা বিরাট অংশজুড়ে সাধারণ শিক্ষা। কারিগরি শিক্ষাকে সাধারণ শিক্ষার প্রবণতার বাইরে আনতে হবে।
বছর শেষে পরীক্ষা থেকে দৈনিক মূল্যায়ন :
বর্তমানে পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি যাচাই করা হয়। ওদের স্কুলগুলোর দৈনিক মূল্যায়ন করার সক্ষমতা, আগ্রহ না থাকার জন্য পরীক্ষা পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়। এই পদ্ধতিতে কোন স্কুল, কোন শিক্ষার্থীর কিম্বা কোন উপজেলা বা জেলার সামগ্রিক চিত্র পাওয়া যায়। সে অনুযায়ী শিক্ষকদের জবাবদিহিতার মুখোমুখি করা যায়। কিন্তু শিক্ষার্থীর দুর্বল দিকগুলো জেনে সেগুলো দূর করার কোন প্রচেষ্টা নেয়া হয় না। শিক্ষার্থীকে ফিডব্যাক না দেওয়া এই পদ্ধতির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। কয়েক মাস পর কিংবা বছর শেষে পরীক্ষা হওয়ার জন্য ফিডব্যাক দেয়ার উপযোগিতা থাকেনা। এই পদ্ধতির বিরুদ্ধে ব্যাপক জনমত সৃষ্টি হয়েছে। বুঝে না বুঝে অনেকের বিরুদ্ধে বলে থাকেন কিন্তু বিকল্প কি হতে পারে কিম্বা ধারাবাহিক মূল্যায়ন সম্ভব কিনা তা বিবেচনা না করেই উঠিয়ে দিতে বলেন। ধারাবাহিক মূল্যায়ন প্রতিষ্ঠা না করে বর্তমান পরীক্ষা পদ্ধতি উঠিয়ে দেওয়া আত্মঘাতী বলেই মনে করি। এর ফলে ক্লাসে পড়াশুনা না করালে তা নির্ণয় করা এবং জবাবদিহিতা কোন টুল নেই।
প্রতিদিন মূল্যায়ন করা হলে পরদিন শিক্ষার্থীর দুর্বল দিকগুলোর দিকে নজর দিয়ে উত্তরোত্তর উন্নয়ন সাধন করা যায়। পরীক্ষার জন্য আলাদা কোন সময় নষ্ট হয় না। বড় আকারের পরীক্ষার আয়োজন করতে হয় না। প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়ে গুরুত্ব থাকেনা। প্রতিদিন পড়া শেষে শিক্ষক প্রতিটি শিক্ষার্থীর মূল্যায়ন করবেন এবং gap পূরণের চেষ্টা করবেন। প্রতিদিন শ্রেণী শিক্ষক পড়া শেষে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য মৌখিক বা লিখিতভাবে পরীক্ষা নিবেন, প্রতিটি শিক্ষার্থীর অন্যান্য দিক মূল্যায়ন করবেন এবং প্রধান শিক্ষকের কাছে তা পাঠিয়ে দেবেন। প্রধান শিক্ষক মূল্যায়ন করে পুনরায় শ্রেণি শিক্ষকের কাছে নির্দেশনা পাঠাবেন। শ্রেণী শিক্ষক নির্দেশনা বাস্তবায়ন করবেন এবং অভিভাবককে অবহিত রাখবেন।
শিক্ষক সঠিকভাবে মূল্যায়ন করেন না, কিংবা পক্ষপাতিত্ব করেন এমন প্রশ্ন অবশ্যই দেখা দিতে পারে। তবে এই পদ্ধতি অন্য সকল পদ্ধতির চেয়ে সুবিধাজনক। প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে এই পদ্ধতি চালু করে দেখা গেছে শিক্ষকরা পর্যাপ্ত সময় দিতে চান না। প্রধান শিক্ষক এ ব্যাপারে আগ্রহী না। এই পদ্ধতি চালু করতে হলে প্রশ্ন প্রণয়ন ও দ্রুততার সাথে পরীক্ষা নিয়ে ফলাফল দেওয়ার প্রশিক্ষণ দিতে হবে। প্রধান শিক্ষকের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রয়োজন হবে। যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবহার করতে না পারলে প্রধান শিক্ষক ইপ্সিত ফলাফল দিতে পারবেন না। এই পদ্ধতি চালু করার আগে প্রতিটি স্কুলে high speed ইন্টারনেট connectivity দরকার হবে।
পাঠাভ্যাস :
শিক্ষার্থীদের পাঠাভ্যাস করানো প্রয়োজন। সেজন্য পাঠাগার থাকা দরকার। শিক্ষার্থীরা তাদের স্কুলের পাঠাগার ব্যবহার করতে পারেন না। দশটা-পাঁচটার স্কুলের সময় ক্লাসে ব্যস্ত থাকায় লাইব্রেরীতে বই পড়ার কোনো সুযোগ নেই। স্কুল সময়ের বাইরে পাঠাগার বন্ধ থাকে তাই পড়ার কোনো সুযোগ নেই। বরং শিক্ষকরাই বই ইস্যু করিয়ে নিয়ে পড়তে পারেন। স্কুল শেষে বাড়িতে গিয়ে পড়তে পারার সুযোগ সৃষ্টির জন্য পাড়ায় পাড়ায় পাঠাগার স্থাপন করা দরকার। এজন্য সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় যৌথ ব্যবস্থা নিতে পারে। জেলায় জেলায় পাঠাভ্যাস গড়ার জন্য বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের ব্যবস্থাপনায় ভ্রাম্যমান পাঠাগারের ব্যবস্থা আছে। এই ব্যবস্থায় উপজেলা এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে সম্প্রসারিত করা যায়। আমাদের দেশে গার্মেন্টস রপ্তানির কারণে অতিরিক্ত কাপড় চোপড় বাজারে আসার জন্য স্বল্প ব্যয় ফ্যাশনেবল কাপড় স্বল্পবিত্তের মানুষরাও পরতে পারেন। ঠিক তেমনিভাবে বইয়ের জন্য স্পেশাল ইকোনমিক জোন থাকলে সেখানকার তৈরি বই বাজারে এসে পরোক্ষভাবে পাঠাভ্যাস জোরদার করতো। অন্যান্য রপ্তানিকারক পণ্যের মত বই ছাপা ও রপ্তানির জন্য স্পেশাল ইকোনমিক জোন করা প্রয়োজন।
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সম্পৃক্ত করা :
২০১৫ সালের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি নীতিমালা প্রতিটি স্কুলে উচ্চগতিসম্পন্ন ইন্টারনেট সংযোগ দেয়ার নির্দেশনা আছে। এমনকি কোন সালের মধ্যে কত স্কুল সংযুক্ত হবে তা উল্লেখ আছে। কিন্তু এ বিষয়ে বাস্তবায়নকারীদের নজর সম্ভবত এড়িয়ে গেছে। প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য প্রথম শ্রেণি এবং ষষ্ঠ শ্রেণীতে একটি করে tab দেওয়া প্রয়োজন। ইন্টারনেট সংযোগ থাকলে tab দেয়া হলে বৃহত্তর জ্ঞানের রাজ্যে শিক্ষার্থীদের বিচরণ অবাধ হবে। স্কুলের সকল শ্রেণীর বই মাল্টিমিডিয়া করার লক্ষ্যে আমি আইসিটি সচিব থাকাকালীন প্রাথমিক শিক্ষার ৬ টি বই মাল্টিমিডিয়া করেছি। শিক্ষাসচিব হওয়ার পর মাদ্রাসা ও স্কুলের কিছু বই মাল্টিমিডিয়া করেছি আশা ছিল বাকি বইগুলো উত্তরসূরিরা মাল্টিমিডিয়া করবে যে কারণে হোক তা করা হয়নি। আগামী দিনগুলোতে কাজটি হলে শিক্ষা অর্জন সহায়ক হবে।
স্কুলে তথ্যপ্রযুক্তি সংযোগ ঘটাতে হলে যন্ত্রপাতি কেনা প্রয়োজন হবে। শিশুরা যাতে তাদের জন্য ইপ্সিত বিষয়ের বাইরে বিচরণ করতে না পারে সে জন্য বিশেষ সফটওয়্যার তৈরি করতে হবে। এসবের রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। সে জন্য জনগণ প্রস্তুত এবং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
শিক্ষক প্রশিক্ষণ:
বিদ্যালয় এর মূল চালিকাশক্তি শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক তাদের দলনেতা। শিক্ষকমন্ডলীকে যে কোন সময় সময়োপযোগী রাখার জন্য প্রশিক্ষণ দেয়ার প্রয়োজন পড়ে। আমাদের দেশে অধিকাংশ প্রশিক্ষণ গতানুগতিক। যুগ যুগ ধরে একই বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণ ব্যক্তিভিত্তিক না হয়ে কোর্সভিত্তিক হয়ে থাকে। একি করছে সবাইকে একই ধরনের জ্ঞান দক্ষতা ইত্যাদির অধিকারী মনে করে course ডিজাইন করা হয়। প্রশিক্ষণার্থী মনোনয়নের সময় শিক্ষকদের বিভিন্ন বিষয়ে দক্ষতা যোগ্যতার মান অনুযায়ী পৃথক পৃথক দলে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় না। ফলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ অপচয় হয়। প্রশিক্ষণ কোর্সগুলি সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে প্রতিনিয়ত পরিবর্তন করা হয় না। আমার মনে হয় প্রত্যেকটা কোর্সে প্রশিক্ষণার্থী এদের প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন করা দরকার হয়।
আমাদের দেশে in house প্রশিক্ষণের প্রচলন নেই। In hou প্রশিক্ষণ বহু দিক থেকে ব্যয় সাশ্রয়ী। এখানে প্রশিক্ষণার্থীরা স্কুলের থাকেন তাই তাদেরকে ভ্রমণের জন্য সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হয় না। একাধারে প্রশিক্ষণ এবং সীমিত আকারে ক্লাস নিতে পারেন। আমাদের দেশে in house প্রশিক্ষণের culture না থাকায় আমি একটি সার্কুলার জারি করে এবং প্রতিনিয়ত মনিটর করে in house প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে ভালো ফল পেয়েছি। প্রতি বছর 40 হাজার শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের স্কুলে ফিরে গিয়ে অন্যদেরকে প্রশিক্ষণ দিতে বললে ৪ লক্ষ শিক্ষককের সকলকে প্রতিবছর প্রশিক্ষণ দেওয়া সম্ভব।
প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো:
আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত শিক্ষার জন্য প্রাসংগিক অবকাঠামো গড়ে তুলে শিক্ষার মানকে অন্তত শতকরা ২০ ভাগ উন্নীত করা যায়। সাধারণ, কারিগরি, মাদ্রাসা যে ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হোক না কেন design একই রকম। এক এক ধরনের শিক্ষার জন্য এক এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামোর দরকার। এমনকি ভিন্ন জায়গায় একই ধরণের প্রতিষ্ঠানের জন্য ভিন্ন ডিজাইন দরকার হতে পারে।
আমাদের দেশে সামগ্রিকভাবে চিন্তা করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান উন্নয়ন করা হয় না। প্রতিবছর শত শত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নতুন ভবন তৈরি করা হয় কিন্তু কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেরই একবারে সামগ্রিকভাবে একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে তৈরি করা হয় না। যার ফলে অর্থব্যয়ীত হচ্ছে ঠিকই কিন্তু কোন স্কুলই সম্পূর্ণতা অর্জন করছে না। পলিসি পরিবর্তন করে কাজটি সহজেই করা সম্ভব। একেকটি school পরিপূর্ণভাবে সাজিয়ে দিলে ৩০-৪০ বছরের ভেতর সামান্য মেরামত ছাড়া কিছুই করতে হবে না। এতে শিক্ষার মান উন্নত হবে একসাথে অর্থের সাশ্রয় হবে।
আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য ডাইনিং হল, মিলনায়তন, সভাকক্ষ, শিক্ষকদের বসার কক্ষ, পরীক্ষাগার ইত্যাদি মানসম্মত হওয়া দরকার। কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরীক্ষাগার আধুনিক কালের ডিজাইন ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে সেসব পরিবর্তনগুলো আমলে নিয়ে ডিজাইন পরিবর্তন করতে হবে।
এছাড়া সীমানা প্রাচীর, খেলার মাঠ, পুকুর ও সাঁতারের ব্যবস্থা থাকতে হবে। বৈদ্যুতিক এবং ইলেকট্রনিক সরঞ্জামের রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের সক্ষমতা থাকতে হবে।
বাজেট বৃদ্ধি ও অটোনমি :
উপরে যেসব সংস্কারের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে তার জন্য অর্থের প্রয়োজন। কিন্তু আমরা সাধারণত বাজেট বৃদ্ধি বলতে বেতন-ভাতা বৃদ্ধির সাথে গুলিয়ে ফেলি। শুধু বেতন-ভাতা বাড়ালেই স্কুলের শেখা শেখানোর মান বাড়ে না। প্রাথমিক বিদ্যালয় অবৈতনিক হলেও শিক্ষার্থীদেরকে অনেক কিছুই নিজেদের খরচে করতে হয়। বিদ্যালয়ের সকল কিছুই হাতের কাছে থাকা উচিত এবং তা বিনা খরচে। খাতা কলম কালি অন্য যেকোনো আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম যা শেখা শেখানোর জন্য সরবরাহ করার জন্য বাজেট প্রয়োজন। অর্থাৎ এক কথায় বলা যায় স্কুলের functional বাজেট বৃদ্ধি করা দরকার।
বাজেট বৃদ্ধির সাথে সাথে স্কুলের স্বাধীকার বা autonomy প্রয়োজন। autonomy থাকলে প্রধান শিক্ষক তার প্রয়োজনমত সম্পদের ব্যবহার করতে পারবেন।






