১৯৭৬ সালের গোড়ার দিকে বিদ্যালয়ে ভর্তি হই। কয়েক মাস পরে হাবিবুর রহমান হলে সিট পাই। তখনকার দিনে প্রতি মাসে ১২২ টাকা খাবারের জন্য জমা দিতে হতো। সবাই যার যার মতো প্লেট এবং গ্লাস নিয়ে ডাইনিং হলে খাবার জন্য হাজির হতো। ডাইনিং হলে ঢোকার সময় পচা গন্ধ বের হতো। ভাত শক্ত প্লাস্টিকের মতো লাগতো। ভাত খেতে খুবই কষ্ট হতো। বাড়িতে সারা বছর বাক তুলসী ধানের চালের ভাত খেতাম। এখন হাবিবুর রহমান হলে প্লাস্টিকের চালের ভাত খাই। তাও পচা গন্ধ। সে সময়ে রেশনের চাল দেয়া হতো।তখন সেনা শাসনের যুগ। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেও সেনারা ঘাঁটি গেড়েছে। হাবিবুর রহমান হলে দক্ষিণ দিকে মাঠের দক্ষিণপ্রান্তে প্রতিদিন সকালে প্যারেড করে। হলের নেতারা কিভাবে খবর পেয়েছে তাদের জন্য ভাল চাল দেয়। পুলিশের জন্য ভাল চাল দেয়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের জন্য পচা চাল দেয়া হয়। সবাই পরামর্শ করে শহরের food কন্ট্রোলারের অফিসের দিকে রওনা হল। আমি শুনেছি সেখানে গিয়ে বেদম মারপিট করা হয়েছিল। এরপর দেখলাম ডাইনিংএ ভাতের অনেক উন্নতি হয়েছে।
আরেকটি অভিজ্ঞতার কথা বলি। তখন প্রায়ই লোডশেডিং হত। তবে আমরা লোডশেডিংয়ে আনন্দ করতাম। হাঁড়িকুড়ি থালা পিটিয়ে গান শুরু করে দিতাম। কিন্তু কতদিন আর এভাবে চলে। একবার transformer ফেটে গেল। তখন গরমের দিন জুন মাস, আর রাজশাহীর গরম একটু আলাদা। নেতারা বিদ্যুৎ অফিসের ধরনা দিল। সাপ জবাব দেওয়া হল 15 দিনের আগে কোন মতেই transformer দেওয়া সম্ভব না। কারণ চট্টগ্রাম port থেকে টাসফরমার আসবে। নেতারা কোথা থেকে খবর পেয়েছে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে ট্রান্সফরমার নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর সাথে সাথে replacement করা হয়েছে। সবাই বিদ্যুৎ অফিসে যাত্রা শুরু করলো এবং মারপিট শুরু হল। আশ্বাস পেয়ে ফিরে আসলো ট্রান্সফারমার লাগানো হবে। তিন দিনের ভেতর transferma লাগানো হয়েছিল।
সারাজীবন গোলআলুর পর একটা অরুচি হয়েছে। কিন্তু আমার স্ত্রী বরাবরই গোলআলু খুব পছন্দ করেন। সে সব কিছুতেই গোলআলু দেওয়ার চেষ্টা করত।তাই বাসায় অনেক সময় অসুবিধা হতো। হাবিবুর রহমান হলে তরকারি বলতে বেশীরভাগ সময়ে গোল আলু দেয়া হতো। তাই গোল আলুতে সারা জীবনের জন্য অরুচি হয়ে গিয়েছিল। শীতকালে মাঝে মধ্যে সিম, ফুল কপি বা পাতাকপি দেয়া হতো। এবং তা খেতে বেশ ভালোই লাগত। দুপুরে এবং রাতে মাছ অথবা মাংস থাকতো। সকালে ও দুপুরে প্রতিবারে ডাল থাকতো। তবে তা হলুদের রঙে ডাল, ভিতর ডাল খুজে পাওয়া যেত না। একদিনের কথা মনে আছে। তখন বর্ষাকাল, বাজার করতে দেরি হয়েছে। তবে আগে থেকে ডাল ছিল তাই ডাল রান্না করে রেখেছে। আমরা এসে ডাইনিং টেবিলের শুধু ডাল পেলাম। দুষ্টামি করে সবাই মিলে ডাল খাওয়া শুরু করলাম। ইচ্ছা ছিল সবদাল শেষ করে ফেলব। কিন্তু ভাত আর আসেনা। আমরা ডাল খেয়ে চললাম। তারপর শুধু ডাল খেয়ে চলে আসলাম। পরে দেখলাম আমাদের চোখ জ্বলছে
সকালেরুটি এবং আলু ভাজি।বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আমরা সকালে নিজেদের কক্ষেই চিওড়া অথবা অন্য কোন খাবার খেতাম। যেমনে আমের মৌসুমে গ্রামে গিয়ে গাছ থেকে পাকা আম কিনে আনতাম। প্রতিদিন সকালে আম চিড়া দিয়ে খেতাম।
যাহোক দু’বছর যেতে না যেতেই পেটের সমস্যা দেখা দিল। হলে আরো কিছু ঘটনা ঘটার জন্য খাবারে রুচি হতো না। আমরা সবে ভর্তি হয়েছি তাই তেমন একটা অভিজ্ঞ ছিলাম না। যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরনো ছাত্র তারা বেশ অভিজ্ঞ। এমনই একটা ঘটনার কথা বলি। একদিন বেশ বড় বড় গরুর মাংসের টুকরা দিয়েছে। বাড়িতে আমার মা গরুর মাংস খায় না। গরু খাওয়ায় আমরা অভ্যস্ত না। হলে এসে না খেয়ে কোনো উপায় নেই। সেদিন মাংসের টুকরো বেশ বড়। খেতে কেমন একটা ফ্যাচ ফ্যাচ করছিল। নেতাদের মনে সন্দেহ হলো। তারা বাবুর্চিকে ডাক দিল। এরপর হাতে একটা চলা করার কাঠ নিল। সেটা দিয়ে পিটানো শুরু করলো। বল্লো সত্য কথা বল কিভাবে মাংসের টুকরো বড় হলো। স্বীকার করল, বলল গ্রাম থেকে মরা গরুর মাংস সস্তায় কিনে এনেছি। তাই মাংসের টুকরো বড় হয়েছে। তারে ছেড়ে বাজার করা লোককে খোজা হচ্ছিল সে খবর পেয়ে ইতোমধ্যে পালিয়ে গিয়েছিল। বাবুর্চি সেই যে ছাড়া পেয়েছে আর কখনো সে ফিরে আসেনি।
তখন হলে একটা বাক্যের প্রচলন হয়েছিল “মাইরের উপর ওষুধ নেই”।
কেন শিক্ষার্থীরা এরকম মারমুখী আচরণ করে সে বিষয়ে আমরা পরে পর্যালোচনা করব।



