তখনও ধানমন্ডী ৩২ এর ঐতিহাসিক বাড়িটি কাজ শেষ হয়নি। উনিশ’শ চৌষট্টির ১৮ অক্টাবরের গভীর রাত। চারপাশে কোন সাড়াশব্দ নেই। নিঃশব্দতার মাঝে নবজাতকের কান্না ভেসে এল।
নাম দিতে হবে। শেখ মুজিবের প্রিয় লেখক দার্শনিক বার্টান্ড রাসেলের বই বেগম মুজিব জেলখানার জন্য কাপড়-চোপড়ের সাথে গুছিয়ে দিতেন। তাই মুজিবের প্রস্তাবে না করার কিছু নেই। তবে সবার ছোট আদরের দুলাল শেখ রাসেলকে সবাই ‘রাসু মনি’ বলে ডাকে। শুরু হলো ‘শেখ রাসেল’ এর সংক্ষিপ্ত জীবন চক্র।
পাঁচ ভাই-বোনের সবচেয়ে ছোট আদরের দুলাল রাসেল সবার কোলে পিঠে চড়ে কাটাতেন। জেলখানায় বাবাকে দেখতে যেতেন একইভাবে। এভাবে চার বছর বয়সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় লেবরেটরি স্কুলে ভর্তি করলে প্রথমে মন না বসলেও পরে স্কুল ভালো লেগে যায়। একই স্কুলেরই ছাত্র ফুফাতো ভাই আরিফ সেরনিয়াবাদ তার খেলার সাথী ও বন্ধু।
আর দশটি বাচ্চার মত কোক-চকলেট তার প্রিয় খাবার তবে সেই সাথে সিঙাড়া। দুধ প্রিয় হলেও সোবহানবাগ ফুপুবাড়ীতে খাওয়ায় মজা পেতেন।
সাইকেল তার প্রিয় বাহন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের মধ্যরাতের বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে পশ্চিম পাকিস্তান নিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে তার পরিবারের অন্যান্যদের সাথে তাকেও ধানমন্ডির ১৮ নম্বর রাস্তার ২৬ নম্বর বাড়ীতে বন্দি করে রাখা হয়। সেখানে সাইকেলে জন্য কান্নাকাট করতো। বাবাকে না পেয়ে নীরবে কাঁদত; জিজ্ঞাসা করলে ‘চোখে ধূলো লেগেছে’ বলে গোপণ করতো।
তবে শেখ কামালের রেখে যাওয়া রেডিওর স্বাধীন বাংলা বেতারের গান শুনে গুনাগুন করে গাইতেন। পাকিস্তানিরা যে ভয়ঙ্কর তা শিশু রাসেল ইতোমধ্যেই বুঝে গিয়েছেন। তাই কোন গান গাইছেন? জিজ্ঞাসা করলে বলতেন ” জয় জয় জয় গাছে পাতা হয়”।
দিনটি ১৪ আগস্ট ১৯৭৫ পরদিন ১৫ আগস্ট চ্যান্সেলর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসবেন। ফুল দিয়ে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য অন্যান্যদের সাথে তাকে নির্বাচিত করা হয়। যথারীতি সালাম জানিয়ে শিক্ষিকা রাজিয়া মতিন চৌধুরির কাছ থেকে বিদায় নেন। তার আর ফিরে আসা হয়নি। যাকে অভ্যর্থনা জানানোর কথা তারও যাওয়া হয়নি। কোন দিনই আর আসতে যেতে পারবেন না।
১৫ আগস্টের ভোর রাতে তাকে ৩২ নম্বর বাড়ীর নিচতলায় অন্যান্যদের সাথে লাইনে দাড় করানো হয়। মায়ের কাছে যাওয়ার জন্য কান্নাকাটি করলে তাকে দো’তলায় মায়ের কক্ষে নেয়া হয়। তবে মা ততক্ষণে নিথর, নিস্তব্ধ প্রাণহীন। এখন যেতে চায় বোন শেখ হাসিনার কাছে। সেখানেও যাওয়া হয়নি পষন্ডের বুলেট তার শরীর এফোড় ওফোড় করেছে। কিন্তু তাকে মুছে ফেলতে পারেনি। প্রতিটি শিশুর মাঝে, অনাগত শিশুদের মাঝে রাসেল বেঁচে আছে থাকবে। ৩২ নম্বরের বাড়িটি তার সংক্ষিপ্ত জীবনের চিত্র ধরে রেখেছে। শিশুদের জন্য প্রবেশ ফি মুক্ত। আপনি আমন্ত্রিত।







