বান্দরবানের লামা উপজেলার ফাঁসিয়াখালীতে ২১ শে নভেম্বর ২০১৯ বৃহস্পতিবার নুরুল ইসলাম তার বাড়ি ‘বড় শনখোলা’ থেকে এক কিলোমিটার দূরে পানের বরজের জন্য খুঁটি কাটতে গেলে হাতির আক্রমনে নিহত হন। ২৪ নভেম্বর ২০১৯ বোয়ালখালিতে লোকালয়ে ঢুকে ৩ জনকে হত্যা করে। আমরা প্রতিবছরই এই ধরনের ঘটনা খবরের কাগজের মাধ্যমে জানতে পারি।
অপরদিকে গত ৫ ই নভেম্বর এবং ১৫ ই নভেম্বর দুটি হাতির বাচ্চা লাশ পাওয়া যায়। এ ধরনের ঘটনা আমরা প্রতিবছর পুনরাবৃত্তি হয়। একটি হাতিকে বিদ্যুৎপৃষ্ট করে হত্যা করা হয়েছে। অপরটি ডুবে মারা গেছে বলে খবরে প্রকাশ। অন্যান্য দেশে কোন জীবজন্তু কোন কারণে আটকা পড়লে তাদেরকে মুক্ত করে দেয়া হয়। আমাদের এই ঘনবসতির দেশে কেউ দেখলো না যে একটি হাতির বাচ্চা পানিতে ডুবে মারা গেল। আসলে কি মারা গেছে না মারা হয়েছে তা কিছু মানুষের ব্যাখ্যার উপরে নির্ভর করেই বিশ্বাস করতে হচ্ছে। পাহাড় থেকে পড়ে একটি হাতি মারা গেছে মর্মে গতবছর খবরের কাগজে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। সেটি নিয়েও সন্দেহ জাগা স্বাভাবিক।
প্রথম মৃত্যু হাতির আক্রমণে। হাতি সামাজিক জীব। তাদের বাচ্চার মৃত্যুর কারণে ক্ষিপ্ত হয়ে মানুষ হত্যা করেছে এতে কোন সন্দেহ নেই। যেকোনো জীবন মূল্যবান যে পরিবারে এই ধরনের জীবনহানি হয় তারাই শুধু বুঝতে পারে এর কষ্ট। মানুষের জন্য অন্যান্য মানুষ সহানুভূতি দেখায়। হাতির পরিবারের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য হাতি শুধু বুঝতে পারে তাদের কি ক্ষতি হলো। হাতিরা সকলে একত্রে মিলে বাচ্চা দেখভাল করে। কোন বাচ্চার ক্ষতি হলে সকলে একত্রে মিলে প্রতিশোধের চেষ্টা করে।
কিন্তু এলাকার মানুষের মধ্যে হাতির প্রতি কোন সহানুভূতি দেখা যায় না কারণ একে অপরের সাথে খাদ্যের বা জমির প্রতিযোগিতা করে থাকে। প্রতিবছর একটি নির্দিষ্ট এলাকা দিয়ে মাইগ্রেশন করে। শুকনো মৌসুমে খাবারের জন্য সুনিদৃষ্ট এই রাস্তায় তারা আসে এবং যায়। এই পথে বাড়িঘর অন্য কোন বাধা সৃষ্টি হলে তারা সেগুলো ধ্বংস করে দেয়ার চেষ্টা করে।
অপরদিকে এখানকার অধিবাসীদের অনেকেই নিম্নবিত্ত। তারা হাতির চলাচল পথের জমিতে ফসল ফলায়। তাই তাদের নিজেদের বাচামারা টাই তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাদের কাছে হাতি প্রাসঙ্গিক না। সামান্য সরকারি প্রচেষ্টায় এই হাতি গুলো এসব বিত্তহীন মানুষদের জন্য সম্পদ হতে পারে। এই মানুষগুলোই তখন হাতের নিরাপত্তাবিধান করবে। এখন শুধু শহরের মানুষ খবরের কাগজ পড়ে মনে মনে সহানুভূতি প্রকাশ করে থাকে।
উপরের ঘটনা থেকে দু’পক্ষেরই ক্ষতির একটা নির্মম চিত্র পাওয়া যায়। এই চিত্রকে পাল্টে আমরা দুজনেরই উপকারের পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারি। আমাদের একটি ইতিবাচক দিক হচ্ছে আমরা হাতের মাংস খাইনা। যা কি না আফ্রিকার মানুষেরা খেয়ে থাকে। Red Nile বইয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা যায় আজ থেকে কয়েক শ বছর আগে আফ্রিকানরা প্রতিবছর ৮000 হাতি হত্যা করত। আজ সেখানে বতসোয়ানা কেনিয়া অ্যাঙ্গোলার মতো দেশে সারা পৃথিবী থেকে হাতি দেখতে আসে। পর্যটকদের কাছ থেকে এ বাবদ বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে থাকে। বাংলাদেশ সর্বসাকুল্যে ২৭০টির মত হাতি আছে। IUCN এর মতে বাংলাদেশে হাতি অবস্থা সংকটাপন্ন, বিলুপ্তপ্রায়। আমাদের দেশে সেটি কিভাবে করা যায় তার একটু আলোচনা করা যাক।
আমাদের দেশের অনেকেই বিদেশে কাজ করে কিংবা গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে কাজ করে আয় করা বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে হাতি দেখতে বিদেশে যায়। আমি নিজেও নেপালের চিত্র ওয়ানে হাতির পিঠে চড়ে গন্ডার দেখতে গিয়েছিলাম। আমাদের দেশে হাতির পিঠে চড়ে কেন হাতির দেখা যাবে না? সেই টাকার একাংশ হাতিতে ক্ষতিগ্রস্ত ফসলের মালিকদের কিংবা যে এলাকা দিয়ে হাতি চলাচল করে সেই এলাকার মানুষকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়া যাবে না ? হাতির চলাচল বন্ধ সরবরাহে যদি বাধা সৃষ্টি না হয় তবে কেন মানুষকে আক্রমণ করবে ?
বনবিভাগের তরফে এরকম প্রকল্প কেন নেওয়া যাবে না ? কিংবা বিভিন্ন ট্রাভেল এজেন্সি ধরনের উদ্যোগ নিতে বন বিভাগ থেকে সহায়তা করা যাবে না ? বনবিভাগের সহকর্মীরা বিষয়টি ভেবে দেখবেন কি ? হাতি সম্পর্কে আমাদের পলিটেকনিক গুলোতে বিভাগ খোলা যায়। সেখান থেকে পড়াশোনা করে সার্কাসের কিংবা গভীর বনে কাঠের গুড়ি পরিবহনের জন্য, কিংবা পর্যটকদের আনন্দদ দেয়ার জন্য হাতের পরিচর্যা করতে পারে। শ্রীলংকা, থাইল্যান্ড, নেপালসহ বিভিন্ন প্রতিবেশীী দেশ পর্যটনশিল্পে হাতির ব্যবহার করে বহুুু মানুষের কর্মসংস্থান করেছে।
ভারত বার্মা সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া হাতি চলাচলের বিঘ্ন সৃষ্টি করেছে। সীমান্ত নিয়ে আলোচনার সময় এসব বিষয়গুলো আলোচনায় আসা উচিত।
এক যুগ পর হাতির বাচ্চা বাচ্চা দেয়। এক বাচ্চা থেকে আরেক বাচ্চার ব্যবধান অন্যান্য জীবের চেয়ে অনেক বেশি। কিছু একটা করা না হলে একদিন আমাদের দেশ থেকে হাতির শেষ হয়ে যাবে এবং সেদিন আর বেশি দূরে না।






