
নতুন করে উঠার জন্য সূর্যকে ডুবতে হয়
২০১৯ সালের অক্টোবরের ২৪ তারিখের বিকাল সাড়ে তিনটায় লন্ডন থেকে নুরু ভাইয়ের গাড়িতে ১৬০ মাইল দূরে কার্ডিফের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম সাথে ভাবি রুমানা, মেয়ে নরিন এবং ছেলে শেখ নাদিম সঙ্গী। চলার পথে যা কিছু চোখে পড়ে তাই মাথা প্রসেস করে ভাবতে বাধ্য করলো। তারপর ছবি দিয়ে লেখালো।


সারাদিন গুড়গুড়ি বৃষ্টি তাই রাস্তায় এখনো বৃষ্টিতে ভেজা যদিও এখন আর বৃষ্টি পড়ছে না। ওকউড এলাকা থেকে পশ্চিম দিকে এসে M২৫ রোড ধরে যাত্রা শুরু হলো। লন্ডনের ভেতরের মত মটরওয়েতে গাড়ির বেশ চাপ।

ইতিমধ্যে বৃষ্টি থেমে গেছে। শীতকাল সমাগত আজ অক্টোবরের ২৪ তারিখ কিন্তু এরই মধ্যে থার্মোমিটারের পারদ যথেষ্ট নেমে গেছে। কিন্তু তার সত্ত্বেও মোটরওয়ের দু’পাশে ক্ষেত এখনো সবুজ কিন্তু দু’ধারের বনের গাছের পাতায় রং লাগতে শুরু করেছে। ইতিমধ্যে আবার বৃষ্টি শুরু হয়েছে।

কিছুদূর পরপর মাথার উপরে ডিজিটাল সাইনে গতি নির্দিষ্ট করে দিচ্ছে এবং সামনে ‘কিউ কসান’ বলে জ্যাম সম্পর্কে সতর্ক করছে। আমাদের দেশে সাধারণত সবসময় নিরর গতি
সাইনবোর্ডে লেখা থাকে কিন্তু এখানে ডিজিটাল সাইনের কারণে সেকেন্ডের গতি পরিবর্তন প্রদর্শন করা সম্ভব হচ্ছে। গতি স্থানবিশেষে ৬০ থেকে ৪০ মাইল লেখা আছে। এরা নিজস্ব দূরত্বের একক ‘মাইল’ অনুসরণ করে; ডেসিমাল সিস্টেম কিলোমিটার অনুসরণ করে না। এখনো ব্রিটিশ ঐতিহ্য আঁকড়ে ধরে রাখতে চায়। আমাদের দেশে একসময় ক্রোশ ব্যবহৃত হতো ডেসিমাল সিস্টেম আসার পর হারিয়ে গেছে।
কনজেসশন যাকে আমরা জ্যাম বলি তার কারণে গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য স্বাভাবিকের চেয়ে কত মিনিট বেশি লাগতে পারে তাও সাইনে লিখে দেয়া হচ্ছে।

রাস্তার পাশে গাছের ঝোপ তাই অজানা প্রজাতিগুলো সংরক্ষিত থাকছে; হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। আমাদের দেশে সব জমির ফসলের ক্ষেত হিসেবে ব্যবহারের জন্য বুনো গাছগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। এখন আর রাস্তার পাশে ভাঁটফুল, বৈঁচি, স্যাকুল, আকন্দ, নিশিন্দ, জিউল, সটি, নানা ধরনের কচা গাছ দেখা যায় না।

কোথাও কোথাও রাস্তার অপর পাশে অন্ততঃ ১০ মাইলেরও বেশি গাড়ির জ্যাম চোখে পড়লো। তবে কয়েক মিনিটেই ফাঁকা হয়ে গেল।

১৬০ মাইলের গন্তব্যে কোথাও ট্রাফিক লাইট নেই কিংবা মানুষ বা গাড়ি পারাপারের জন্য থামতে হয় না। এজন্য ফ্লাইওভার এবং এক্সিট আছে। চাইলে মোটরওয়ে থেকে বেরিয়ে অন্য কোন শহর বা সার্ভিস স্টেশনে যেতে পারেন।


গবাদি পশু ছাড়াও বন্য পশুর চলাচলের জন্য ওভার ব্রিজ আছে। রাস্তার দু’পাশে উচু রাস্তা করা আছে তাই গবাদি পশু বা বন্য পশুকে ধাপ সিঁড়ি মাড়াতে হয় না; সমান রাস্তা দিয়ে চলাচল করতে পারে।

রাস্তার সন্নিকটে বাড়িঘর গুলোতে যাতে শব্দ দূষণ না হয় সেজন্য শব্দ নিরোধক বেড়া দেয়া আছে। এজন্য কোথাও কোথাও কাচের বেড়া দেয়া হয়েছে। আর সমস্ত রাস্তাজুড়ে গাছের এবং মাটির বাঁধের মত সৃষ্টি করে শব্দ চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে।

বন্য জন্তু যাতে রাস্তার উপর ঝাপিয়ে পড়ে গাড়ি চালক এবং তার নিজের বিপদ ডেকে আনতে না পারে সেজন্য তারের বেড়া দেয়া হয়েছে।

আমাদের দেশের রাস্তার পাশে গাছের সাথে দ্রুতগামী গাড়ি আছড়ে পড়ে প্রায়শঃ মৃত্যু ঘটায়। আমরা পুরো পরিবার চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের মাঝে লোহাগাড়ায় এমনি একটি দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিলাম। সেটি যাতে না হয়, গাড়িটি পিষ্ট না হয়ে যাতে ছিটকে পড়তে পারে সেজন্য গ্যালভানাইজড টিনের বেড়া দেয়া হয়েছে। আমাদের দেশে আজকাল এই ধরনের বেড়া দেওয়া শুরু হয়েছে।

বায়ু দূষণ কম থাকায় পশ্চিম দিগন্তে মেঘের আড়ালে হেলে পড়ার সূর্য অপরূপ রঙের চিত্র আঁকছে।
সর্ববামে কম গতির লেন ক্রমান্বয়ে ডাইনে বেশি গতির লেন। গাড়ি চালকরা আমাদের ট্রাক বা বাসের চালকের মতো গতি বিবেচনা না করে খেয়ালখুশিমতো যেকোনো লেন দিয়ে যাচ্ছে না। খালি থাকলেও যত্রতত্র লেন পরিবর্তন করছে না। পিছন থেকে কোন অধিক গতির গাড়ি আসতে দেখলে সাথে সাথে বাম লেনে গিয়ে অন্য চালকের গতি অবাধ করে দিচ্ছে।
আমরা এখনM 25 থেকে M4 এসে পড়েছি। এই রাস্তায় আমাদেরকে ১০০ মাইল যেতে হবে।
এদের প্রকৌশলীরা ভিন্ন গ্রহ থেকে আসেনি। এখানেও রাস্তা মেরামতের কাজ সারা বছর ধরে চলে। তবে রাতে যখন ভিড় থাকে না তখনই সাধারণত কাজ করতে দেখা যায়। রাতের মজুরদের মজুরি বেশি তা সত্বেও এদের ঠিকাদারদের উপর ইঞ্জিনিয়ারদের কড়া নিয়ন্ত্রণ আছে। তার কারণ জবাবদিহিতা এবং দুর্নীতির প্রতি অনাগ্রহ। যাত্রীদের সর্বোত্তম সুবিধা দেওয়াই তাদের উদ্দেশ্য।
নিরাপত্তা সর্বাগ্রে তাই যেখানেই কাজ হবে সেখানে ঘিরে রাখা হয়। আগে-পিছে নোটিশবোর্ড থাকে।

পথিমধ্যে ‘নিউবেরির’ মতো স্থানে যাত্রা বিরতি, খাদ্য, জ্বালানি, টুকিটাকি কেনাকাটা এমনকি রাত্রিযাপন করতে পারেন।

Newbery

৭.১৫ মিনিটে ইংল্যান্ডর Gloucestershire এর দিক থেকে Severn এবং Eye নদীর উপর সেতু Severn পার হয়ে ওয়েলসের Chepstow প্রবেশ করলাম।

রাত পৌনে আটটায় কার্ডিফ পৌঁছে শাহজাহান ভাইয়ের বাসায় আরবীর মিষ্টি খেয়ে কিছুক্ষণ শহর দেখে টিলা আর গাছের লুকোচুরির মধ্যে অবস্থিত Celtic Manor রেসর্টে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টির মধ্যে রাত্রিযাপন করলাম।






